পঞ্চান্ন দিনের সরকার এখনই নানান সংকটে পড়েছে। কিছু সংকট বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সৃষ্ট, কিছু সংকট ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের সৃষ্ট। আরও বড় সংকট সাম্প্রতিক বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে গোটা পৃথিবীর মতো আমরাও ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে পড়েছি। দেশের প্রত্যেককে এ সংকট স্পর্শ করছে। এক সমস্যা বহু সমস্যার জন্ম দিয়েছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দেশের রাজনীতি। গণভোট ও সংস্কার প্রস্তাব না মানলে সরকারকে মসনদছাড়া করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আবার এর নেপথ্যে অন্য কিছুও কাজ করছে। ডিপ স্টেটের কুচক্রী অন্তর্বর্তী সরকারের বিতর্কিত উপদেষ্টাদের সামনে আনার পরিকল্পনা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে অত্যন্ত সহনশীল, সংবেদনশীল এবং একই সঙ্গে দৃঢ়তার সঙ্গে এগোতে হবে। ছোট সমস্যা যেন বড় হওয়ার সুযোগ না পায়, পচা শামুকে পা না কাটে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। দলের নেতা-কর্মীদের সতর্ক রাখতে হবে। মন্ত্রীদের অতিকথন বন্ধ করতে হবে। অর্ধশত দিনের কর্মকাণ্ডেই প্রমাণিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দৌড়ে কুলাতে পারছেন না মন্ত্রীরা। যেমন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে হেঁটে পারতেন না মন্ত্রী-আমলারা।

ইরান যুদ্ধের কারণে জটিল হয়ে উঠছে বিশ্বপরিস্থিতি। এ যুদ্ধে বিশ্ব চালিকাশক্তির অন্যতম জ্বালানি সম্প্রতি প্রায় দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ে বড় মাপের ঝুঁকিতে আছে। আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেক্টরে লুটপাট করার জন্য ইনডেমনিটি দিয়েছিল। সেই সুযোগে রেন্টাল, কুইক রেন্টালের ব্যবসা হয়েছে। এ ব্যবসায় অনেকেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকার দেশের জ্বালানি মজুত ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, সরবরাহ নিরাপদ রাখার জন্য তেমন কিছুই করেনি। সে কারণে নতুন সরকারকে হঠাৎ করে হোঁচট খেতে হচ্ছে। তবে বিগত সময়ে কে কী করেছেন, কার কারণে দেশের কী সর্বনাশ হয়েছে, কার কারণে জনগণ আজ কষ্টে আছে সেগুলো পর্যালোচনা করার অনেক সময় ও সুযোগ পাওয়া যাবে। এসব নিয়ে গবেষণা-পর্যালোচনা এখন কোনো কাজে আসবে না। এখন দরকার জ্বালানির জন্য দ্রুত বিকল্প উৎস খোঁজা, স্বল্প সময়ের মধ্যে জ্বালানিসংকট সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা। সেই সঙ্গে দেশের ভিতরে জ্বালানি নিয়ে যেসব কাজ-অকাজ হচ্ছে সেগুলোর দিকে কড়া দৃষ্টি রাখতে হবে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে মজুতদারি, চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব নয়। সরকারি দলের কোনো পর্যায়ের নেতা-কর্মী যেন জনগণের ভোগান্তি পুঁজি করে ব্যবসা বা কোনো ধরনের মজুতদারি করতে না পারেন, সে বিষয়েও কঠোর হতে হবে।

দেশ যখন ভালো চলে, তখন সবাই সরকারকে বাহবা দেয়। সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা তখন বুক পকেটে সুগন্ধি রুমাল নিয়ে ঘোরেন। কিন্তু যখন কোনো সংকট দেখা দেয়, তখন সবাই প্রধানমন্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কেউ কোনো দায়দায়িত্বের ভার বহন করতে চান না। মন্ত্রিপরিষদের অনেক সদস্যও তখন আড়ালে-আবডালে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা সচিবের ব্যর্থতার ছিদ্রানুসন্ধান করতে থাকেন। বিরোধী দলে যারা থাকেন তারা মুখে সর্বাত্মক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেও পানিকাদায় হাবুডুবু খাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে সরকার পড়ুক, ভিতরে ভিতরে বিরোধী দল সেটা কামনা করবে, এটাই স্বাভাবিক। বর্তমান সংসদে যারা বিরোধী দল তারা আওয়ামী লীগের মতো মাঠ গরম করার রাজনীতি হয়তো করবে না বা এ মুহূর্তে তা করতেও পারবে না। তবে তারা কৌশলে কিছু করতেই ছাড়বে না। তারা যে কতটা কৌশলী তা বিগত নির্বাচনে দেশবাসী বুঝতে পেরেছে। তাদের ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, ন্যায়নীতি, ঘুষ-দুর্নীতি, চান্দা-ধান্দাবিরোধী কথাবার্তা দেশবাসীকে ভাবায়। তারা এমনভাবে সব সেক্টরে প্রকাশ্যে কিংবা গুপ্তভাবে তাদের লোক ঢুকিয়ে রেখেছে, যা কল্পনারও অতীত। ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকটের ভিতরে সংবিধান সংস্কারের এজেন্ডা তারা ঢুকিয়ে ফেলেছে। সেই সঙ্গে ঘোষণাও দিয়েছে, তাদের দাবি না মানলে সরকারকে মসনদ ছাড়তে হবে।

১১-দলীয় জোটের বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ৭ এপ্রিল বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে বিএনপি দেশে সংকট তৈরি করেছে। এ সংকট নিরসনের চাবিকাঠি বিএনপির হাতেই। সংকট বিএনপি তৈরি করেছে, সমাধানও তাদেরই করতে হবে।’ জ্বালানিসংকট ও জনদুর্ভোগের বিষয়ে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি সংকটে পেট্রোলপাম্পে মাইলের পর মাইল লাইন লেগে আছে। অথচ সংসদে মন্ত্রীরা বলছেন কোনো সংকট নেই। দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষ দিশাহারা। কৃষিতে সেচসংকট তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব পড়বে খাদ্যপণ্যের দামে। সরকার জনগণের ভাগ্য বদলের চেয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলাতে বেশি ব্যস্ত।’ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম আরও এক ধাপ এগিয়ে সদ্যগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে মাঠে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এ আহ্বান যে শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা, তা না-ও হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানসহ সব উপদেষ্টা যদি ১১-দলীয় জোটের দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করে ধীরে ধীরে সভা, সেমিনার বা রাজপথে নামেন তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে যেসব অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একটি রাজনৈতিক পক্ষকে তাঁরা হয়তো ঢাল হিসেবে ব্যবহারের পথ বেছে নিতে পারেন।

চব্বিশের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার এবং ছাব্বিশের নির্বাচনের পর একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ এখন প্রাণবন্ত। বিগত সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি আপাতত আইনে রূপ নিচ্ছে না। ফলে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে আগামীকাল ১০ এপ্রিল ২০২৬ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগুলো বাতিল হয়ে যাবে। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য অধিকার এবং রাজস্ব ও ব্যবস্থাপনার অধ্যাদেশ রয়েছে। এসব অধ্যাদেশের মূলকথা হলো গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নিশ্চিত করা। মানুষের অধিকার ও আইনের শাসনের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রতিষ্ঠান দেশে স্বাধীনভাবে কাজ করবে। সেখানে সরকারের হস্তক্ষেপ থাকবে না। সংসদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা বলছেন, সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে চায় না। অন্যদিকে সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা বলছেন, এ অধ্যাদেশগুলোতে দুর্বলতা রয়েছে। ফলে বাতিল নয়, আরও শক্তিশালী করে বিল আকারে পরবর্তী সময়ে পাস করা হবে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি সংসদে হুবহু পাস করা হয়েছে। কিছু অধ্যাদেশ সংশোধনসহ পাস করা হবে। আরও কিছু অধ্যাদেশ রহিতকরণ কিংবা হেফাজতকরণসহ পাস করা হচ্ছে। এই হেফাজতকরণ কিংবা রহিতকরণের বিষয়গুলো ডিফেকটিভ আইন। এগুলো বর্তমানে যে ফর্মে আছে, ওই ফর্মে পাস করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে না।’ তবে পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য যা-ই হোক না কেন, এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হলে তা দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে। পৃথিবীতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতি সাময়িক শূন্যতা তৈরি করলেও কারও জন্যই কিছু থেমে থাকে না। তবে সেই শূন্যতা অতীতের চেয়ে বেশি যোগ্যতম ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পূরণ হলে মঙ্গল হয়। তা না হলে অমঙ্গলই বয়ে আনে। দেশবাসী আর কোনো অমঙ্গল চায় না। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মারমুখী অবস্থান পরিহার করে আলোচনার ভিত্তিতে ঐক্য প্রয়োজন। এজন্য সরকারকে অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। মন্ত্রীরা একেকজন একেক ভাষায়, একেক মুদ্রায় কথা না বলে, প্রকৃত বিষয়গুলো বিরোধী দল ও দেশবাসীকে অবহিত করলে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তৈরি হবে না।

তবে জুলাই সনদ নিয়ে দুটি কথা এখনই বলা প্রয়োজন। একটি মৌলিক প্রশ্ন দেশবাসীর সামনে এখনই উপস্থাপন করা জরুরি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ৩৯ পৃষ্ঠার একটি মুদ্রিত দলিল দেশবাসীকে উপহার দিয়েছে। দলিলটিতে জামদানির নকশায় অভ্যুত্থানের ছবিকে প্রচ্ছদ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫, ভবিষ্যতের পথরেখা’ শিরোনাম করা হয়েছে। দলিলের ভূমিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে। সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য গঠনের লক্ষ্যে পাঁচটি কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ১৬৬টি সুপারিশ রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে কমিশন কয়েক দফায় ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৭২টি বৈঠকে মিলিত হয়। বৈঠকসমূহের আলোচনায় অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও জোটের সর্বসম্মত ও বৃহত্তর ঐকমত্য এবং কয়েকটি ভিন্নমতসহ মোট ৮৪টি সুপারিশসংবলিত “জুলাই সনদ ২০২৫” প্রণয়ন করা হয়েছে।’

জুলাই সনদের পটভূমির দ্বিতীয় প্যারায় বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে হানাদার বাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ জনগণের ওপর বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করলে পরদিন ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরিণতিতে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় ঘটে।’

প্রশ্ন হচ্ছে, জুলাই সনদ তৈরি করতে ৩৩টি রাজনৈতিক দল ৭২টি বৈঠক করার পরও পটভূমিতে ২৫ মার্চ কালরাতে হানাদার বাহিনী কারা এবং স্বাধীনতার ঘোষণা কে করেছেন তা রাজনৈতিক দলগুলো বলতে পারল না কেন? কার স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলো কার কাছে আত্মসমর্থন করল? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বলতে এত ভয় কেন, স্বাধীনতার ঘোষকের নাম উচ্চারণ করতেই বা সংকোচ কেন?

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews