পবিত্র রমজান মাস কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সময় নয় বরং এটি কর্মক্ষেত্রে কাজের ধরণ এবং কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলারও একটি সুযোগ। সে কারণেই আমিরাত সরকার রমজানে কর্মীদের জন্য বিশেষ কর্মঘণ্টা নির্ধারণের পথে হাঁটছে।
সম্প্রতি লন্ডন বিজনেস স্কুলের অর্গানাইজেশনাল বিহেভিয়ারের সহকারী অধ্যাপক ওসামা খান এক গবেষণায় জানিয়েছেন, রমজান মাসে কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা কেবল ধর্মীয় কোনো রীতি নয় বরং এটি কর্মীদের ক্লান্তি দূর করে তাদের কাজের মান উন্নত করতে বড় ভূমিকা পালন করে। রোজা রাখার কারণে শরীরে যে ক্লান্তি আসে এবং রাতে ঘুমের যে ব্যাঘাত ঘটে, তা কাটিয়ে উঠতে সংক্ষিপ্ত কর্মঘণ্টা একধরণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে কাজ করে।
অধ্যাপক খানের মতে, অতিরিক্ত দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করলে শেষ পর্যন্ত পারফরম্যান্স কমে যায়। তাই রমজানে ছোট কর্মদিবস কর্মীদের মনোযোগ ধরে রাখতে এবং তাদের সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়।
এই বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব অনুধাবন করে বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠান এখন আর শেষ মুহূর্তে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে বরং বার্ষিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই রমজানের বিশেষ সময়সূচি অন্তর্ভুক্ত করছে। বিষয়টি এখন আর কেবল সাময়িক পরিবর্তন নয় বরং পেশাদার কর্মসংস্কৃতির একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কর্পোরেট অফিসে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
নির্মাণ খাতে কর্মরত আহমেদ এহাবের মতো মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাছে এই সংক্ষিপ্ত কর্মঘণ্টা কেবল একটি আইনি অধিকার নয় বরং ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয়তা। তিনি মনে করেন, কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ার ফলে হুড়োহুড়ি এবং মানসিক অপরাধবোধ কমে আসে। এতে যেমন সময়মতো ইবাদত করা সম্ভব হয়, তেমনি ঘরে ফেরার সময় শরীরে পর্যাপ্ত শক্তি অবশিষ্ট থাকে। ফলে কেবল দিন পার করার পরিবর্তে রমজানের প্রকৃত আধ্যাত্মিক আমেজ উপভোগ করা সম্ভব হয়। এহাব আরও লক্ষ্য করেছেন যে, আগে কাজ শেষ করলে রাস্তায় যানজট ও ব্যক্তিগত মানসিক চাপ কম থাকে, যা পরোক্ষভাবে সড়ক নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, রমজানের এই বিশেষ সময়সূচি কেবল মুসলিম কর্মীদের জন্যই নয় বরং অমুসলিম কর্মীদের কাছেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাসিন্দা অজন্তা মনে করেন, এই সময়টাতে কর্মক্ষেত্রে এক ধরণের শান্ত ও সহমর্মিতার পরিবেশ বিরাজ করে। যদিও তিনি নিজে রোজা রাখেন না, তবুও দুপুরের বিরতি এড়িয়ে দ্রুত কাজ শেষ করে আগেভাগে বাড়ি ফিরতে পেরে তিনি বেশ আনন্দিত। এতে পরিবারের সঙ্গে কাটানোর মতো বাড়তি সময় পাওয়া যায়। তিনি আরও জানান যে, এই সময়ে কর্মক্ষেত্রে একে অপরের প্রতি যত্নশীল হওয়ার প্রবণতা বাড়ে, যা দলের ভেতরে একতা এবং সহমর্মিতা বৃদ্ধিতে দারুণ কাজ করে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে বেসরকারি খাতে রমজানে কর্মঘণ্টা কমানো কেবল কোনো দয়া নয় বরং এটি একটি সংবিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা। তবে আইনের বাইরেও যখন কোনো প্রতিষ্ঠান সচেতনভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন তা কর্মীদের মধ্যে আনুগত্য বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে।
সূত্র: খালিজ টাইমস
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল