ভাইরাসবাহিত রোগ হাম আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ৬৮৫ জন ভর্তি হয়েছে। এ সময় হাম আক্রান্ত (সন্দেহভাজন) আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় অনেক অভিভাবক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল শিশুদের খাওয়াচ্ছেন। অনেকে আবার হামের টিকা দেওয়ারও চেষ্টা করছেন। বিশেষজ্ঞরা জানান, যেসব শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং শরীরে ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতি রয়েছে তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তবে নির্ধারিত বয়সে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ালে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে এবং সহজে হাম আক্রান্ত হয় না; বড় ক্ষতিও হয় না।
এদিকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবকে ‘বজ্রপাতের মতো আকস্মিক’ বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি ছিল না বলেও তিনি জানান। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হামজনিত নিউমোনিয়ায় (শ্বাসকষ্ট) আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় ‘বাবল সিপ্যাপ’-বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
এ সময় হামে শিশুর অকাল মৃত্যুর জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতিকে তিনি দায়ী করেন। শিশু মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, রাজশাহীতে ভেন্টিলেটরের অভাবে ৩৩টি শিশু মারা গেছে। তবে বিষয়টি জানার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমরা ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করেছি। হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় চিকিৎসকদের জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কেবল সরকারি উদ্যোগে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। হাম যেভাবে ছড়াচ্ছে, তা মোকাবিলায় চিকিৎসকদের সামনে থেকে কাজ করতে হবে।
এদিকে, সরেজমিনে রাজধানীর গুলশান, মহাখালী, শাহবাগ, কলাবাগান ও মোহাম্মদপুরের একাধিক ফার্মেসি ঘুরে ও ওষুধ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিক্রি বেড়ে গেছে বলে জানা গেছে। অনেকে হামের টিকাও কিনতে আসছেন। ফার্মেসি মালিকরা জানান, দেশীয় কোম্পানি ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস ও একটি বিদেশি কোম্পানি হামের টিকা সরবরাহ করে থাকে। বর্তমানে এ টিকা বাজারে নেই।
বুধবার রাতে গুলশান-১ এ গ্লোব ফার্মেসির বিপণন কর্মী নাসির উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, সপ্তাহখানেক হলো ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের চাহিদা বেড়েছে। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন ক্যাপসুল কিনতে আসছেন। তবে কেউ প্রেসক্রিপশন (ব্যবস্থাপত্র) আনছেন না। এক পাতার ৫০ হাজার আইইউ ‘রেটিনল ফোর্ট’ ক্যাপসুল বেশি বিক্রি হচ্ছে। ভ্যাকসিন বিক্রি হয় এমন কয়েকটি ফার্মেসি-সংশ্লিষ্টরা জানান অনেকে হাম ও মাম্পসের জন্য ‘প্রয়োরিক্স ০.৫ এমএল’ ফ্লু ও অ্যালার্জির ‘ভ্যাক্সিগ্রিপ’ চিকেন পক্সের ‘ভ্যারিভ্যাক্স’ ও কলেরার ‘ডুকোরাল’ টিকা কিনতে আসছেন। মহাখালীর তানিম ফার্মার কর্ণধার ফারুক হোসেন বলেন, ফেসবুকে একাধিক পেজে প্রচার হচ্ছে-ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিতে থাকা শিশুদের হাম হতে পারে। সপ্তাহখানেক হলো ‘এ’ ক্যাপসুল বিক্রি বেড়েছে। বুধবার অন্তত ৮ জন ‘এ’ ক্যাপসুল কিনতে আসেন। তাদের মধ্যে মাত্র একজন চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র সঙ্গে এনেছিলেন।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা যুগান্তরকে জানান, হাম আক্রান্ত রোগীর শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। আক্রান্ত শিশুর শ্বাসকষ্টজনিত নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, সর্দিকাশি, নাক দিয়ে পানি ঝরা, চোখে লালভাব, ত্বকে ফুসকুড়িসহ বিভিন্ন সমস্যা হয়। অনেকের শরীরে ব্যাপকভাবে ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে অনেক অভিভাবক উদ্বিগ্ন হয়ে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াচ্ছেন। কিন্তু ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো বা যে কোনো ধরনের টিকা শরীরে প্রয়োগের ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী সঠিক মাত্রা বা ডোজ ও সময় অনুসরণ করা না হলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হসপাতালের সহাকারী অধ্যাপক (শিশু বিভাগ) ডা. এএসএম মাহমুদুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, হামের জন্য কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। হামের চিকিৎসা মূলত সাপোর্টিভ। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় প্রাথমিকভাবে সহায়ক এবং লক্ষণ উপশম ও জটিলতা প্রতিরোধে জোর দিতে হয়। শিশুর জ্বর হলে প্যারাসিটামল, চুলকানি থাকলে এন্টিহিস্টামিন, পরপর দুইদিন দুটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে খাওয়াতে হবে।
হাম আক্রান্ত শিশুর দৃষ্টি সমস্যা বা দেখতে অসুবিধা হলে বা চোখের মণি ঘোলা লাগলে ১৪ দিনের মাথায় আরেকটি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল (মোট তিনটি) দেওয়া যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, হামে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় সংক্রমণ হতে পারে। হামের জটিলতা হিসাবে পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়া বা মারাত্মক ডায়রিয়া হতে পারে। শিশুর কানপাকা, মুখে ঘা, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ অনেক রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক দেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. তানভীর আহমেদ বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’ মারাত্মকভাবে কমে গেলে চোখের পানি কমে যায় বা চোখ শুষ্ক হয়ে যায়। এতে রাতকানা থেকে শুরু করে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। ভিটামিন ‘এ’ হাম প্রতিরোধ করতে পারে না। তবে সঠিক ডোজে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল নিলে হাম হওয়ার পর জটিলতা কম হয়।
তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মাত্রাতিরিক্ত ভিটামিন ‘এ’ খেলে শরীরে বিভিন্ন ক্ষতি হতে পারে। যেমন-মাথাব্যথা, বমি, মাথা ঘোরা, দৃষ্টিসমস্যা (ঝাপসা দেখা), ত্বক শুষ্ক হওয়া, চুল পড়া, লিভারের ক্ষতি (গুরুতর ক্ষেত্রে লিভার ড্যামেজ), হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা, গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের জন্মগত ত্রুটি হওয়ার ঝুঁকি। অতিরিক্ত ভিটামিন ‘এ’ শরীরে বিষক্রিয়ার মতো কাজ করে এবং লিভার ও অন্য অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।
এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টিকা দেওয়া হলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিশেষ ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। খুব কম বয়সে (যেমন-ছয় মাসের আগে) টিকা দিলে শরীরে ঠিকভাবে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না। আবার নির্ধারিত সময়ে না দিলে সুরক্ষা অসম্পূর্ণ থাকে। ফলে ভবিষ্যতে হাম হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। একই টিকা বারবার নেওয়া হলে বড় ক্ষতি না হলেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।