অর্থবছরকে ক্যালেন্ডার ইয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে করার প্রস্তাব দেবেন বলে জানিয়েছেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আমাদের ফিসকাল ইয়ার (অর্থবছর) হচ্ছে জুলাই টু জুন। জুন মাস বর্ষা, খরা, দুর্যোগ, সাইক্লোন-এগুলোতে দেশ আক্রান্ত হয়। এডিপির বিশাল অংশ শেষের দুই মাসে তাড়াহুড়া করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। এটি বাস্তবায়ন নয়- গণলুটপাট। তিনি বলেন, সংসদে প্রস্তাব দেব, আমাদের ফিসকাল ইয়ারটি যেন ক্যালেন্ডার ইয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে করা হয়।
এদিকে, জামায়াতে ইসলামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি বিকল্প বা প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট পেশ করেছে। দলটির পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত এ বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দেশের জনপ্রশাসন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে। গতকাল রাজধানীর মগবাজারে আল ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতের পক্ষ থেকে ‘ছায়া বাজেট প্রস্তাবনা’ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ বাজেট উপস্থাপন করা হয়। জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের এমপি সাইফুল আলম খান মিলন বাজেট উপস্থাপন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলের চিফ হুইপ ও বিরোধীদলীয় অন্য নেতারা। জামায়াতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত এ বাজেটের বরাদ্দ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মোট বাজেটের ২৪.০৯ শতাংশ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে জনপ্রশাসন খাতে। টাকার অঙ্কে যা ২ লাখ ২ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা (১৪.৯৬%) বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখতে বাধ্য হয়েছে দলটি। সুদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট প্রস্তাবিত বাজেটের ১৫.১৯ শতাংশ। দেশের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৬৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা (৭.৭৮%) বরাদ্দের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। জামায়াতের এ বাজেটে দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতে ৫১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা (৬.১৫%) এবং গরিব ও দুস্থ মানুষের সহায়তায় সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে ৪৮ হাজার ১৫০ কোটি টাকা (৫.৭৪%) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জনস্বাস্থ্য রক্ষায় স্বাস্থ্য খাতে ৪৫ হাজার ২৪০ কোটি টাকা (৫.৩৯%) এবং তৃণমূলের উন্নয়নে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪৫ হাজার ২২০ কোটি টাকা (৫.৩৯%) বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
অন্যান্য খাতের মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিরক্ষা খাতে ৪৩ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা (৫.১৮%), অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে ৩৪ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা (৪.১০%) এবং দেশের শিল্প ও উৎপাদন সচল রাখতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ২৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা (২.৯৭%) বরাদ্দ ধরা হয়েছে।
সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে কেবল জিডিপির সংখ্যাগত উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু জনগণের প্রকৃত জীবনমানের কোনো উন্নয়ন হয়নি। ’২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি। তিনি আরও বলেন, আমাদের বাজেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক নয় বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতানির্ভর। আমরা অর্থনীতিতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অদক্ষতা দূর করে স্বচ্ছতা ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির কাঠামো দাঁড় করাতে চাই। অনুষ্ঠানে জামায়াতের এই নেতা জানান, জাতীয় সংসদে বাজেট পাসের আগে জনগণের কাছে নিজেদের কল্যাণমূলক অর্থনৈতিক ভাবনা তুলে ধরতেই তাঁদের এ বিকল্প বাজেট প্রস্তাব।
তাহলে বর্ষার পানিতে আমাদের টাকাগুলো ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে না। গতকাল ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ডা. শফিকুর রহমান এ কথাগুলো বলেন। রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সংলগ্ন আল ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াত এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা লাগবে। এগুলো না থাকলে, যে বাজেটই সরকার দিক, কার্যকর হবে না। জামায়াত আমির বলেন, সম্পূরক বাজেট বছর শেষ হওয়ার ন্যূনতম তিন মাস আগে সংসদে পেশ করতে হবে। এটি পাওয়া যায় শেষ মাসে। এর মাঝে বৈধ-অবৈধ, ন্যায্য-অন্যায্য সব খরচ হয়ে যায়। কালো-সাদা একাকার হয়ে যায়। তার পরে সম্পূরক বাজেট সংসদের সামনে এলে জনগণের লাভ হয় না। জামায়াতের আমির আরও বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের অপমানজনকভাবে বিদায়ের পর জনঅভিপ্রায়ের ভিত্তিতে একটি সরকার গঠিত হয়েছিল। তারাও জাতির সঙ্গে ইনসাফ করতে পারেনি। তারা ইনসাফ করলে আজকের বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার গণভোট অস্বীকার করে দুটি শপথের জায়গায় একটি শপথ নিয়েছে। এর ব্যাখ্যায় তারা বলেছে, নির্বাচন হওয়ার স্বার্থে জনগণকে অনেক কিছু বলেছেন। এটা তাদের মনের কথা নয়। রাজনীতিবিদরা জনগণকে ধোঁকা দিলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা তৈরি হবে কীভাবে? অনুষ্ঠানে জামায়াতের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন দলীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন)।
আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমাদ আলী কাসেমী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাগপার সভাপতি তাসমিয়া প্রধান প্রমুখ।