দেশজুড়ে চলমান গ্যাস সঙ্কটের কারণে শিল্প খাতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, নরসিংদী ও চট্টগ্রামের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের স্বল্পচাপ ও অনিয়মিত সরবরাহের কারণে কারখানাগুলো সক্ষমতার অর্ধেক পর্যন্ত উৎপাদন করতে পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে তৈরী পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল, কেমিক্যাল ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। একই সাথে সময়মতো রফতানি আদেশ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে দেশের রফতানি আয় ও বিনিয়োগ পরিবেশ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)-এর তথ্যে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুটের বেশি হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুটে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিদিনই বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে অনেক কারখানায় বয়লার চালানো যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও দিনে কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে দেশের তৈরী পোশাক খাতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, শিল্পকারখানাগুলোয় কাক্সিক্ষত মাত্রায় গ্যাস না থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং রফতাানি আদেশ বাস্তবায়নে চাপ বাড়ছে। তারা বলছেন, অনেক কারখানা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। অর্থাৎ গ্যাসের অভাবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের সক্ষমতা পুরো দমে ব্যবহার করতে পারছে না।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ)-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কটের কারণে অনেক কারখানায় প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কিছু এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রাও বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং বিদেশী ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্ধারিত সময়ে রফতানি পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু পোশাকশিল্প নয়, টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলগুলোও গভীর সঙ্কটে পড়েছে। শিল্পমালিকদের দাবি, গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে মেশিন পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। অনেক কারখানায় উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, দিনে প্রায় গ্যাস থাকে না বললেই চলে। রাতে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও সেটি উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত নয়। বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। অনিশ্চিত জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে নতুন বিনিয়োগকারীরাও পিছিয়ে যাচ্ছেন বলে তিনি মনে করেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, শিল্প খাতে গ্যাস সঙ্কট এখন বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। কারণ শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে রফতানি আয়, কর্মসংস্থান এবং ব্যাংক ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ওপর। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে লাখ লাখ শ্রমিক শিল্প খাতের সাথে সম্পৃক্ত। উৎপাদন কমতে থাকলে শ্রমঘণ্টা কমানো, ওভারটাইম বন্ধ এবং ছাঁটাইয়ের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
এ দিকে দেশের অর্থনীতিবিদদের মতে, তৈরী পোশাক খাত দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। এই খাতে উৎপাদন ব্যাহত হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ বাড়বে। ইতোমধ্যে কিছু বিদেশী ক্রেতা সময়মতো সরবরাহ না পাওয়ায় বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছেন। তারা বলছেন, বাংলাদেশে উৎপাদন অনিশ্চিত হয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ভিয়েতনাম, ভারত কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো বাজারে অর্ডার সরিয়ে নিতে পারেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়াই বর্তমান সঙ্কটের অন্যতম কারণ। একই সাথে এলএনজি আমদানির ওপর অতিনির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে আমদানিতে চাপ তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে অভ্যন্তরীণ সরবরাহে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, অফশোর ব্লকে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া এ সঙ্কট কাটানো কঠিন হবে।
এ দিকে পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে উৎপাদিত গ্যাসের বড় অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প ও সার কারখানায় ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শিল্পমালিকদের অভিযোগ, আবাসিক ও অন্যান্য খাতের তুলনায় শিল্প খাতেই গ্যাস সঙ্কটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। অথচ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্প খাত সচল রাখা জরুরি।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শিল্প খাতে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু উৎপাদন নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তারা শিল্পাঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, নতুন গ্যাস সংযোগে স্বচ্ছতা আনা এবং জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।