ক্রীড়াঙ্গনে টাকার অঙ্কটা ক্রমেই বড় হচ্ছে। একসময় যে অর্থে একটি ফেডারেশনের বছর পার হয়ে যেত, আজ সেখানে কথা হচ্ছে হাজার কোটি টাকার। সামনে আসছে ১,২৪৪ কোটি টাকার সিডমানি।

ক্রিকেট ছাড়া বিভিন্ন ফেডারেশন, জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাসহ ক্রীড়ার বিস্তৃত পরিসরে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ভিত গড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর ফাইল পাঠানো হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখায়। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মূলধন থাকবে, তার লভ্যাংশে চলবে ক্রীড়া কার্যক্রম। আজকের টাকা থেকেই তৈরি হবে আগামী দিনের অর্থনৈতিক শক্তি।

শুনতে স্বপ্নের মতো। কিন্তু সেই স্বপ্নের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন। ক্রীড়াঙ্গনে সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বাফুফেকে দেওয়া সরকারের ২০ কোটি টাকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ আছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সেই অর্থের হিসাব চেয়েছিল।

২০১৯-২০ অর্থবছরে ফুটবল উন্নয়নের জন্য বাফুফেকে দেওয়া ২০ কোটি টাকা স্থায়ী আমানত করার পর এক বছরের মধ্যেই তা ভেঙে অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছিল। বাফুফের সেই ২০ কোটির হিসাবের প্রশ্নের রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে এসেছিল বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার আরও ২০ কোটি টাকার এফডিআর।

সেই অর্থও ছিল নারী ক্রীড়ার ভবিষ্যতের জন্য। দুই দফায় মোট ২০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল মহিলা ক্রীড়া সংস্থার অনুকূলে। সোনালী ব্যাংকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় করপোরেট শাখায় সেই অর্থ রাখা হয়েছিল এফডিআর হিসেবে। পরিকল্পনাটিও ছিল সুন্দর। এফডিআরের লভ্যাংশের ৮০ শতাংশ ব্যয় হবে নারী ক্রীড়ার উন্নয়নে, আর ২০ শতাংশ যুক্ত হবে সিডমানির সঙ্গে।

মূল টাকা থাকবে, তার আয় দিয়ে এগোবে নারী ক্রীড়া। একটি মেয়ের হাতে হয়তো উঠবে ব্যাট। কারও হাতে তীর-ধনুক। কেউ ছুটবে ট্র্যাকে। কেউ দাঁড়াবে মুষ্টিবদ্ধ হাতে বক্সিং রিংয়ে। সেই ভবিষ্যতের জন্যই তো একটি তহবিল। কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০ কোটি টাকার এফডিআর ফেরত নেয়।

আর সেই জায়গাতেই এসে দাঁড়ায় ১,২৪৪ কোটি টাকার সিডমানি। হাজার কোটি টাকার এই তহবিল ক্রীড়াঙ্গনের চেহারা বদলে দিতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মূল অর্থ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তত্ত্বাবধানে থাকবে। লভ্যাংশের ২৫ শতাংশ আবার মূল তহবিলে যুক্ত হবে, ৭৫ শতাংশ ব্যয় করা যাবে। অর্থাৎ মূলধন ধীরে ধীরে বাড়বে, আর তার আয়েই চলবে ক্রীড়ার চাকা।

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকও ক্রীড়ার অর্থকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কাজে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

ভাবুন তো একজন শুটার হয়তো আজ যে গুলিটি ছুড়ছেন, সেটির পেছনেও থাকতে পারে এই অর্থ। একজন সাঁতারুর বিদেশি প্রশিক্ষণ, একজন অ্যাথলেটের জুতো, কোনও প্রত্যন্ত গ্রামের প্রতিভাবান শিশুর ক্যাম্প সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে এই তহবিল।

তাই ১,২৪৪ কোটি টাকা বাংলাদেশের ক্রীড়ার ভবিষ্যৎ। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে হলে টাকারও নিরাপত্তা চাই। কে পাহারা দেবে? কে হিসাব রাখবে? কোন খাতে কত টাকা গেল? তা কি প্রকাশ্যে জানা যাবে? মূলধনে হাত দেওয়া যাবে কি না, তার নিয়ম কতটা কঠোর হবে? কোনও প্রতিষ্ঠান প্রশ্ন তুললে কি তাকে লিখিত জবাব দেওয়া হবে?

বাফুফে ও মহিলা ক্রীড়া সংস্থার এফডিআরের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর প্রশ্ন উঠতেই পারে ক্রীড়ার উন্নয়নে টাকা যতটা জরুরি, টাকার পাহারাও ততটাই জরুরি।

একটি ভুল সিদ্ধান্তে হারিয়ে যেতে পারে শুধু কয়েক কোটি টাকা নয়, হারিয়ে যেতে পারে অনেকগুলো প্রজন্মের স্বপ্ন। ১,২৪৪ কোটি টাকার সিডমানি তাই বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য নতুন দরজা খুলতে পারে। তবে সেই দরজার চাবি থাকবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি আর কঠোর নজরদারির হাতে।

মাঠে খেলোয়াড়ের লড়াই হয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। মাঠের বাইরে ক্রীড়াঙ্গনের লড়াইটা হওয়া উচিত অপচয়, অনিয়ম আর অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে। টাকা থাকবে। লভ্যাংশে খেলা চলবে। মূলধন বাড়বে। এটাই স্বপ্ন। এবার শুধু নিশ্চিত করতে হবে সেই টাকা যেন শেষ পর্যন্ত ক্রীড়ার কাছেই থাকে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews