২০২৬ সালের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখো ফুটবলপ্রেমী খেলা দেখতে তিন আয়োজক দেশে ভিড় জমিয়েছিলেন। তবে বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর কানাডার অভিবাসন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত এক তথ্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে কানাডায় প্রবেশ করা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি নাগরিক পরবর্তীতে দেশটিতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছেন।
কানাডার ইমিগ্রেশন, রিফিউজিজ অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা (আইআরসিসি) নিশ্চিত করেছে, অস্থায়ীভাবে কানাডায় প্রবেশের আবেদন করার সময় যেসব ব্যক্তি তাদের সফরের কারণ হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর কথা উল্লেখ করেছিলেন, তাদের মধ্যে ১৭৫ জন পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থী হওয়ার আবেদন জমা দিয়েছেন। আইআরসিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট ২৬ হাজার ১১১ জন বিদেশি নাগরিক তাদের কানাডা সফরের উদ্দেশ্য হিসেবে বিশ্বকাপ দেখার কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেই তুলনায় আশ্রয় প্রার্থীর সংখ্যা খুবই সীমিত হলেও বিষয়টি অভিবাসন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
- Advertisement -
আইআরসিসির মুখপাত্র আনাহিতা বেলাদি এক ই-মেইল বার্তায় বলেন, ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে কানাডা বিশ্বের হাজারো দর্শক, ক্রীড়াবিদ, কোচ, কর্মকর্তা, চিকিৎসাকর্মী, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, কর্পোরেট স্পন্সর এবং ফুটবল অনুরাগীদের স্বাগত জানাতে পেরে গর্বিত। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক কোনো বড় ক্রীড়া আসরের সময় কিছু ভ্রমণকারী কানাডায় প্রবেশের পর শরণার্থীর আবেদন করতে পারেন। তবে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপ উপলক্ষে আসা বেশিরভাগ দর্শকই তাদের ভিসার শর্ত মেনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশ ত্যাগ করেছেন। ফলে সামগ্রিকভাবে নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা খুবই সীমিত।
আইআরসিসির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপ দেখতে এসে যেসব দেশের নাগরিকরা শরণার্থী হওয়ার আবেদন করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছে : বাংলাদেশ, বুরুন্ডি, কলম্বিয়া, একুয়েডর, মিশর, ঘানা, কেনিয়া, নেপাল, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, চীন এবং সেনেগাল। দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ২৫ জন ঘানার নাগরিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। এরপর কলম্বিয়া, মিশর ও কেনিয়ার ১৫ জন করে নাগরিক শরণার্থী হওয়ার আবেদন জমা দিয়েছেন। যদিও আইআরসিসি বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের আবেদনকারীর পৃথক সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
কানাডার প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক যদি নিজ দেশে ফিরে গেলে নির্যাতন, সহিংসতা, রাজনৈতিক নিপীড়ন বা প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে বলে দাবি করেন, তাহলে তিনি শরণার্থী সুরক্ষার আবেদন করতে পারেন। এই আবেদন দুইভাবে করা যায় : কানাডায় প্রবেশের সময় কানাডিয়ান বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি-এর কর্মকর্তাদের কাছে। অথবা বৈধভাবে কানাডায় প্রবেশের পর দেশটির অভ্যন্তরে অবস্থানকালে ইমিগ্রেশন, রিফিউজিজ অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা-এর মাধ্যমে। তবে আবেদন করলেই যে শরণার্থী মর্যাদা পাওয়া যাবে, এমন নয়। প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা হয় এবং আবেদনকারীর দাবি, প্রমাণ ও নিজ দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ক্রীড়া আয়োজনের দিক থেকে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ কানাডার জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে উঠেছে। কানাডার ভ্যানকুভার ও টরন্টো শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছে মোট ১৩টি ম্যাচ। দেশটির ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় বিশ্বকাপ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭৭ শতাংশ কানাডিয়ান কোনো না কোনোভাবে বিশ্বকাপের খেলা দেখেছেন এবং গড়ে একজন দর্শক প্রায় ১৫ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেছেন ম্যাচ উপভোগ করতে।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশে শরণার্থীর আবেদন করার ঘটনা নতুন নয়। অলিম্পিক, বিশ্বকাপ কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মতো বড় আয়োজনকে অনেকেই বৈধভাবে কোনো দেশে প্রবেশের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেন। এরপর নিজ দেশের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানবাধিকার পরিস্থিতি বা ব্যক্তিগত ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে আশ্রয়ের আবেদন করেন।
তবে এবারের পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে কানাডায় প্রবেশ করা মোট দর্শনার্থীর তুলনায় আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। ফলে কানাডা সরকার এটিকে ব্যাপক অপব্যবহার হিসেবে দেখছে না। বরং তাদের মতে, অধিকাংশ দর্শক ভিসার শর্ত মেনে সফর সম্পন্ন করেছেন এবং আন্তর্জাতিক এই আয়োজন সফলভাবেই শেষ হয়েছে।
- Advertisement -