বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ মজুদ বৃদ্ধি এবং সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে লাগাতার বাড়ছে সোনার দাম। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশীয় বাজারেও। দফায় দফায় মূল্য সমন্বয়ের কারণে অব্যাহতভাবে সোনার দাম বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হয়েছে অস্থিরতা। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সোনার বাজারে বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বাড়লেও সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে সৃষ্টি হয়েছে চাপ ও অনিশ্চয়তার নতুন বাস্তবতা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বাজারে আবার বড় উত্থান ঘটেছে স্বর্ণের দামে। গতকাল বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ভরিতে ৩ হাজার ৩২৪ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪২৮ টাকা। একই দিন সকাল থেকে নতুন এ দাম কার্যকর হয়েছে। এর আগের দিনও স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়েছিল। ফলে টানা দুই দিনে ভরিপ্রতি মোট বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭৪৮ টাকা।
বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন দর নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ২১ ক্যারেটের স্বর্ণের ভরি ২ লাখ ৬৪ হাজার ৭৭৩ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৮১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ১ লাখ ৮৫ হাজার ৭৪৯ টাকায় বিক্রি হবে। অথচ ২ মার্চ নির্ধারিত দামে ২২ ক্যারেটের ভরি ছিল ২ লাখ ৭৪ হাজার ১০৪ টাকা। একদিনের ব্যবধানে এমন বড় লাফ বাজারে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে ৩৬ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ দফা দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ১২ দফা কমানো হয়েছে। গত বছরও ৯৩ বার দাম সমন্বয়ের নজির রয়েছে, যার ৬৪ বারই ছিল বৃদ্ধি। ঘনঘন এ সমন্বয় প্রমাণ করছে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার সরাসরি প্রতিফলন পড়ছে দেশীয় বাজারে।
তথ্যে দেখা যায়, স্বর্ণের দাম বাড়লেও রুপার দামে আপাতত পরিবর্তন আসেনি। ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপা ৭ হাজার ১৭৩ টাকা, ২১ ক্যারেট ৬ হাজার ৮৮২ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৫ হাজার ৮৯০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ৪ হাজার ৪৩২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে চলতি বছর রুপার দামও ২১ বার সমন্বয় হয়েছে, যার ১৪ বারই বৃদ্ধি পেয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় বাজারের এ উত্থানের পেছনে মূল চালিকা শক্তি আন্তর্জাতিক বাজার। বিশ্ববাজারে গত জানুয়ারিতে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার অতিক্রম করে। একপর্যায়ে স্পট মার্কেটে তা ৫ হাজার ৯২ ডলার ছাড়িয়ে যায়। লন্ডনভিত্তিক লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের (এলএমবিএ) বার্ষিক পূর্বাভাস জরিপে বিশ্লেষকেরা বলেছেন, ২০২৬ সালে স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ৭ হাজার ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। গড় দাম ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৭৪২ ডলার।
মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস তাদের পূর্বাভাস সংশোধন করে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৪০০ ডলারে পৌঁছতে পারে। অন্য দিকে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্বর্ণভিত্তিক এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে বিনিয়োগ হয়েছে ৮৯ বিলিয়ন ডলার, যা পরিমাণের হিসেবে ৮০১ টন ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ মজুদ বৃদ্ধি এবং সুদের হার হ্রাসের প্রত্যাশা এই তিনটি কারণ একসাথে কাজ করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে স্বর্ণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নীতি সুদ কমানোর সম্ভাবনা বাড়লে ডলারের মান দুর্বল হয়, এতে স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যায়।
তথ্যে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনা বাড়ার বড় কারণ। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো ডলারনির্ভরতা কমাতে স্বর্ণ মজুদ বাড়াচ্ছে। ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ১ হাজার টনের বেশি স্বর্ণ কিনেছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলতি বছরও এ প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। দেশীয় বাজারে এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি। ২০০০ সালে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ছিল মাত্র ৬ হাজার ৯০০ টাকা। ২০১০ সালে তা দাঁড়ায় ৪২ হাজার টাকায়। ২০২০ সালে প্রায় ৭০ হাজার টাকা এবং ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো এক লাখ টাকা অতিক্রম করে। গত বছর দেড় লাখ ও পরে দুই লাখ টাকার মাইলফলক স্পর্শ করে। এখন তা আড়াই লাখ পেরিয়ে ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক দশকে স্বর্ণের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম যত বাড়ছে, বিক্রি তত কমছে। নতুন গয়নার বিক্রি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে দাবি তাদের। আগে যেখানে দোকানে ৭০ শতাংশ ছিল নতুন গয়না বিক্রি, এখন পুরনো গয়না বিক্রি বা বদল বেশি হচ্ছে। অনেক ক্রেতা হালকা ওজনের গয়নায় ঝুঁকছেন। বিয়ের মৌসুম সামনে থাকায় সামর্থ্যবান পরিবারগুলো আগেভাগেই কেনাকাটা সেরে নিচ্ছে।
তাঁতি বাজারের সোনা ব্যবসায়ী বিদ্যাধর সরকার নয়া দিগন্তকে বলেন, সোনার দাম বাড়তে থাকলে অনেকেই মনে করেন আরো বাড়বে, তাই তাড়াহুড়া করে কিনে ফেলেন। আবার দাম বেশি হয়ে গেলে সাধারণ ক্রেতা সরে যান। এখন বাজারে এই দুই ধরনের প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, সোনার দাম শুধু চাহিদা-জোগানের ওপর নির্ভর করে না; ভোক্তার মনস্তত্ত্বও বড় ভূমিকা রাখে। মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা থাকলে মানুষ নগদের পরিবর্তে স্বর্ণে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। কারণ স্বর্ণকে দীর্ঘমেয়াদে মূল্য সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। গত ২০ বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ৭০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে এ তথ্যও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ভূমিকা রাখছে।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, দামের এ ঊর্ধ্বগতি চিরস্থায়ী নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে, সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা হ্রাস পেলে কিংবা ডলারের মান শক্তিশালী হলে স্বর্ণের দামে সাময়িক সংশোধন আসতে পারে। কিন্তু বেশির ভাগ বিশ্লেষকের ধারণা, বড় ধরনের পতনের সম্ভাবনা কম বরং সাময়িক পতনকে বিনিয়োগকারীরা কেনার সুযোগ হিসেবেই নেবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরো একটি বাস্তবতা হলো ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম অপরিবর্তিত থাকলেও ডলার শক্তিশালী হলে দেশীয় বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ে। উপরন্তু ভ্যাট, মজুরি ও অন্যান্য চার্জ যুক্ত হয়ে খুচরা পর্যায়ে ক্রেতাকে আরো বেশি মূল্য গুনতে হয়। ফলে ২২ ক্যারেটের এক ভরি গয়না কিনতে প্রকৃত খরচ প্রায় তিন লাখ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।
তবে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে স্বর্ণের দাম কোথায় গিয়ে থামবে। আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস যদি সত্যি হয় এবং আউন্সপ্রতি দাম ৬ থেকে ৭ হাজার ডলারের ঘরে যায়, তবে দেশীয় বাজারে ভরিপ্রতি দাম তিন লাখ টাকা ছাড়ানো সময়ের ব্যাপার হতে পারে। আবার বৈশ্বিক অস্থিরতা কমলে কিছুটা স্বস্তিও ফিরতে পারে।
তবে বর্তমান বাস্তবতায় স্বর্ণবাজারে যে অস্থিরতা চলছে তা সহজে থামছে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একদিনের ব্যবধানে ভরিতে তিন হাজার টাকার বেশি বৃদ্ধি তারই প্রমাণ। সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাওয়া এ ধাতু এখন অনেকটাই বিনিয়োগকারীদের নিয়ন্ত্রণে আর সেই বিনিয়োগের গতি-প্রকৃতিই নির্ধারণ করবে সামনে স্বর্ণের নতুন মাইলফলক।