প্যাপেইন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক এনজাইম, যা কাঁচা বা অপরিপক্ব পেঁপের ল্যাটেক্স বা দুধের মতো সাদা রস থেকে সংগ্রহ করা হয়। পেঁপে উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম ঈধৎরপধ ঢ়ধঢ়ধুধ। এই এনজাইমটি প্রোটিওলাইটিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এটি জটিল প্রোটিনকে ভেঙে ছোট ছোট অ্যামিনো অ্যাসিডে পরিণত করতে সক্ষম। আধুনিক শিল্পে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় প্যাপেইনের চাহিদা বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে এটি উচ্চমূল্যের রপ্তানিমুখী পণ্য হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

প্যাপেইনের বহুমুখী ব্যবহারই এর বাজারকে শক্তিশালী করেছে। খাদ্য শিল্পে এটি মাংস নরম করার জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। কারণ, এটি শক্ত মাংসের প্রোটিন ভেঙে রান্নার উপযোগী করে তোলে। এছাড়া জুস ও অন্যান্য পানীয় উৎপাদনে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্যাপেইন ব্যবহৃত হয়। ওষুধ শিল্পে এটি হজমের ওষুধ, প্রদাহনাশক ও ক্ষত নিরাময়কারী উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রসাধনী শিল্পে প্যাপেইন ত্বকের মৃত কোষ অপসারণ করে। ফলে ত্বক উজ্জ্বল ও সতেজ থাকে। চামড়া ও টেক্সটাইল শিল্পেও এটি উপাদান নরম করতে ও প্রক্রিয়াজাত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বহুমুখী ব্যবহার প্যাপেইনকে একটি স্থায়ী চাহিদাসম্পন্ন শিল্পপণ্যে পরিণত করেছে।

প্যাপেইন উৎপাদনের মূল কাঁচামাল হলো সবুজ পেঁপে। পাকা পেঁপে নয়, বরং সম্পূর্ণ বেড়ে ওঠা কিন্তু অপরিপক্ব পেঁপে এই কাজে সবচেয়ে উপযোগী। কারণ, এই পর্যায়ে পেঁপেতে সর্বোচ্চ পরিমাণ ল্যাটেক্স থাকে। প্যাপেইন সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয় পেঁপে গাছ থেকে উপযুক্ত ফল নির্বাচন দিয়ে। এরপর ফলের গায়ে খুব সতর্কভাবে হালকা কাট দেওয়া হয়, যাতে ভেতরের দুধের মতো সাদা রস বের হয়ে আসে। এই রস পরিষ্কার পাত্রে সংগ্রহ করা হয়। সাধারণত ভোরবেলা এই কাজটি করা হয়। কারণ, তখন ল্যাটেক্সের প্রবাহ বেশি এবং এনজাইমের কার্যকারিতা সর্বোচ্চ থাকে।

একটি পেঁপে থেকে একবারে সব ল্যাটেক্স সংগ্রহ করা হয় না। সাধারণত একটি ফল থেকে ৩ থেকে ৪ বার পর্যন্ত ল্যাটেক্স সংগ্রহ করা যায়। প্রতিবার কাট দেওয়ার পর কয়েকদিন বিরতি দিয়ে আবার একই প্রক্রিয়া করা হয়। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে ট্যাপিং বলা হয়। এতে একটি ফল থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ ল্যাটেক্স সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। সংগৃহীত ল্যাটেক্স পরে রোদে শুকানো হয় বা আধুনিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় ড্রায়ারে শুকানো হয়। শুকানোর ফলে এটি কঠিন হয়ে গুঁড়ো বা ফ্লেক আকার ধারণ করে, যা ক্রুড প্যাপেইন নামে পরিচিত। এই ক্রুড প্যাপেইনকে আরও পরিশোধন করে উন্নত মানের ইন্ডাস্ট্রিয়াল বা ফার্মাসিউটিক্যাল গ্রেড প্যাপেইন তৈরি করা যায়।

প্যাপেইন উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর উৎপাদন হার। এই উৎপাদন হার তুলনামূলকভাবে খুব কম। সাধারণত ১ কেজি পেঁপে থেকে ২০ থেকে ৬০ গ্রাম ল্যাটেক্স পাওয়া যায় এবং এই ল্যাটেক্স থেকে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ প্যাপেইন তৈরি হয়। অর্থাৎ ১ কেজি পেঁপে থেকে গড়ে মাত্র ২০ থেকে ৩০ গ্রাম প্যাপেইন পাওয়া যায়। উন্নত জাত ও দক্ষ ব্যবস্থাপনায় এটি ৩০ থেকে ৩৫ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। ফলে ১ কেজি প্যাপেইন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ৪০ থেকে ৬০ কেজি পেঁপে। এই কম উৎপাদন হারই প্যাপেইনকে একটি উচ্চমূল্যের পণ্যে পরিণত করেছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, ল্যাটেক্স সংগ্রহের পর পেঁপে ফলটি আর বাজারে বিক্রিযোগ্য থাকে না। কাট দেওয়ার কারণে ফলের গায়ে দাগ পড়ে, স্বাদ তিক্ত হয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে পচন ধরে। ফলে এটি সাধারণ ভোক্তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য থাকে না। তাই প্যাপেইন উৎপাদনে ব্যবহৃত পেঁপেকে সম্পূর্ণভাবে কাঁচামাল হিসেবেই বিবেচনা করতে হয়।

বাংলাদেশে প্যাপেইন উৎপাদনের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এর খরচ মূলত কাঁচামাল ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর নির্ভর করে। যদি প্রতি কেজি পেঁপের দাম ২০ টাকা ধরা হয়, তাহলে ১ টন প্যাপেইন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ৪০,০০০ থেকে ৬০,০০০ কেজি পেঁপে। এতে কাঁচামালের খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ থেকে ১২ লাখ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয় শ্রমিকের মজুরি, শুকানোর খরচ, পরিবহন, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্যাকেজিং খরচ, যা প্রায় ৩ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা। ফলে মোট উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ থেকে ১৯ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে প্যাপেইনের মূল্য এর মানের ওপর নির্ভর করে অনেক বেশি। সাধারণ ক্রুড প্যাপেইনের দাম প্রতি কেজি প্রায় ২,২০০ থেকে ৪,৪০০ টাকা। উন্নত মানের ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাপেইনের দাম ৪,৪০০ থেকে ৮,৮০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ফার্মাসিউটিক্যাল গ্রেড প্যাপেইনের দাম ৮,৮০০ থেকে ১৩,০০০ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। এই হিসেবে ১ টন প্যাপেইনের মোট বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২২ লাখ টাকা থেকে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকারও বেশি।

এই বিশাল মূল্য ব্যবধানই প্যাপেইন উৎপাদনকে লাভজনক করে তুলেছে। নি¤œমানের প্যাপেইন উৎপাদনে প্রতি টনে প্রায় ১০ লাখ টাকা লাভ হতে পারে। মাঝারি মানের ক্ষেত্রে লাভ হতে পারে প্রায় ৪০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা। আর উচ্চমানের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করতে পারলে লাভ ৬০ লাখ টাকারও বেশি হতে পারে। ১ টন প্যাপেইন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পেঁপে উৎপাদনে প্রায় ৩ থেকে ৬ একর জমি দরকার হয়। সাধারণত প্রতি একরে ৮ থেকে ২০ টন পেঁপে উৎপাদন হয়। তাই পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ করলে এই শিল্পকে টেকসই করা সম্ভব।

বিশ্বব্যাপী প্যাপেইনের বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ১৫,০০০ মেট্রিক টন। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এর মোট বাজারমূল্য প্রায় ৩,৩০০ কোটি টাকা থেকে ১৯,৫০০ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে।
এই বিশাল বৈশ্বিক বাজারে যদি বাংলাদেশ সামান্য অংশও দখল করতে পারে, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। যদি বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারের মাত্র ৫ শতাংশ অংশ অর্জন করতে পারে, তাহলে সম্ভাব্য বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা থেকে ৯৭৫ কোটি টাকা। আবার যদি বাংলাদেশ ১০ শতাংশ অংশ অর্জন করতে পারে, তাহলে সম্ভাব্য আয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩৩০ কোটি টাকা থেকে ১,৯৫০ কোটি টাকা। এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিলে দেশে ১০ থেকে ৫০টি মাঝারি ও বড় প্যাপেইন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা সম্ভব। এর ফলে কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে, গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।

বাংলাদেশে প্যাপেইন শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। দেশের জলবায়ু পেঁপে চাষের জন্য উপযোগী এবং শ্রম খরচ তুলনামূলকভাবে কম। তবে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সবশেষে বলা যায়, সবুজ পেঁপে থেকে প্যাপেইন উৎপাদন বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় শিল্পখাত। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে এটি একটি লাভজনক রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত হতে পারে এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী, যুক্তরাজ্য প্রবাসী
[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews