বিশ্বকাপ ফুটবলের মেগা আসর মানেই বিশ্বসেরা তারকাদের পায়ের জাদু, গ্যালারি কাঁপানো উন্মাদনা আর কোটি কোটি দর্শকের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। তবে এবার ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের মাঠের পেছনের গল্পটা একটু ভিন্ন এবং চমকপ্রদ। সাধারণত ফুটবলপ্রেমীরা মাঠের খেলোয়াড়দের দিকে চোখ রাখলেও, এবার মূল আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে খেলোয়াড়দের পায়ের নিচের সবুজ ঘাস। এবারের আসরকে নিখুঁত ও নিরাপদ করতে একদল বিজ্ঞানী বিগত আট বছর ধরে দিনরাত এক করে শুধু মাঠের উপযুক্ত ঘাস উৎপাদনে গবেষণা করে গেছেন।

ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই আসরটি এবার যৌথভাবে আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। তিনটি ভিন্ন দেশের জলবায়ু, তাপমাত্রা এবং পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ায় ফিফার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রতিটি ভেন্যুর মাঠের মান সমান রাখা। ভ্যানকুভারের তীব্র ঠান্ডা থেকে শুরু করে মেক্সিকোর প্রচণ্ড গরম কিংবা ডালাসের আর্দ্র আবহাওয়া; সব জায়গাতেই যেন খেলোয়াড়রা একই রকম পিচ পান, তা নিশ্চিত করতেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল আজ থেকে আট বছর আগে, ২০১৮ সালে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিশিগান স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল টার্ফগ্রাস বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী এই অসম্ভবকে সম্ভব করার দায়িত্ব নেন। ফিফার বিশেষ অনুদানে শুরু হওয়া এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক জন সোরোচান এবং জন রজার্স। বিজ্ঞানীদের এই দলটিকে এমন এক ধরনের ঘাস তৈরি করতে হয়েছিল যা একই সাথে প্রচণ্ড ঠান্ডা ও তীব্র গরম সহ্য করতে পারবে, আবার শত শত ফুটবলারের বুটের আঘাত ও দৌড়াদৌড়ির পরও সহজে নষ্ট হবে না।

গবেষকদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল টুর্নামেন্টের ১৬টি স্টেডিয়ামের বৈচিত্র্যময় অবকাঠামো। এই ১৬টি ভেন্যুর মধ্যে আটটি স্টেডিয়ামে আগে থেকেই কৃত্রিম ঘাস বা আর্টিফিশিয়াল টার্ফ বিছানো ছিল, যা ফিফার আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিপন্থী। নিয়ম অনুযায়ী বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ হতে হবে শতভাগ প্রাকৃতিক ঘাসের মাঠে। এর চেয়েও বড় জটিলতা ছিল পাঁচটি ইনডোর বা ছাদ ঢাকা স্টেডিয়াম নিয়ে, যেখানে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পৌঁছায় না এবং প্রাকৃতিক ঘাস বাঁচিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব।

এই জটিল সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞানীরা এক যুগান্তকারী প্রযুক্তির আশ্রয় নেন। তারা প্লাস্টিকের চাদরের ওপর বালুর স্তর তৈরি করে তার ওপর ঘাস চাষ করার এক অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। প্লাস্টিকের ওপর বড় হওয়া এই ঘাসের শিকড়গুলো মাটির গভীরে না গিয়ে পাশাপাশি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যেন তা আস্ত কার্পেটের মতো শক্ত রূপ নেয়। এর ফলে ঘাসগুলোকে খামারে চাষ করে খুব সহজেই কেটে রোল করে স্টেডিয়ামে নিয়ে আসা যায় এবং কয়েক দিনের মধ্যে তা মাঠের সাথে খাপ খাইয়ে পূর্ণাঙ্গ খেলার উপযোগী হয়ে ওঠে।

মাঠের স্থায়িত্ব এবং খেলোয়াড়দের সুরক্ষার জন্য বিজ্ঞানীরা এই প্রাকৃতিক ঘাসের সাথে কৃত্রিম তন্তু বা প্লাস্টিক ফাইবার মিশ্রিত করে এক ধরনের ‘হাইব্রিড টার্ফ’ তৈরি করেন। গবেষণায় দেখা যায়, কেন্টাকি ব্লুগ্রাস এবং পেরেনিয়াল রাইগ্রাসের একটি বিশেষ অনুপাতের মিশ্রণ এই ধরনের মাঠের জন্য সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। ঘাসের শিকড়গুলো যখন কৃত্রিম প্লাস্টিক ফাইবারের চারপাশ দিয়ে জড়িয়ে শক্ত ভিত্তি তৈরি করে, তখন খেলোয়াড়রা তীব্র গতিতে ছুটে গিয়ে হঠাৎ ব্রেক করলে বা মোড় নিলেও মাঠের মাটি বা ঘাস উপড়ে আসে না।

মাঠের এই নিখুঁত সমতা পরীক্ষা করার জন্য বিজ্ঞানীরা ‘ফ্লেক্স’ নামের একটি বিশেষ হাই-টেক রোবোটিক মেশিনও তৈরি করেছেন। এই মেশিনটি মূলত একজন স্বাভাবিক ওজনের ফুটবল খেলোয়াড়ের বুটের আঘাতের গতিবিধি অনুকরণ করে মাঠের শক্ত ভাব পরিমাপ করে। টুর্নামেন্ট চলাকালীন প্রতিটি ম্যাচের আগে বিজ্ঞানীদের তৈরি এই প্রযুক্তি মাঠের বিভিন্ন প্রান্তের তাপমাত্রা ও মাটির ঘনত্ব মেপে দেখবে, যাতে কোনো নির্দিষ্ট অংশের ঘাস শক্ত বা পিচ্ছিল হয়ে খেলোয়াড়দের বড় কোনো ইনজুরির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।

দীর্ঘ আট বছরের ক্লান্তিহীন গবেষণা এবং প্রায় দুই শতাধিক সফল পরীক্ষার পর বিজ্ঞানীদের এই বিশেষ ঘাস এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এই প্রজেক্টের সাথে যুক্ত গবেষকরা মনে করছেন, তাদের এই আবিষ্কার কেবল ২০২৬ বিশ্বকাপেরই মান বাড়াবে না, বরং ভবিষ্যতের ক্রীড়া জগতেও মাঠ ব্যবস্থাপনার ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে। মাঠের এই সবুজ গালিচা এখন বিশ্বসেরা ফুটবলারদের বরণ করে নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত, যা কোটি ফুটবলপ্রেমীকে উপহার দেবে এক অনন্য ও নিখুঁত ফুটবলীয় অভিজ্ঞতা।

বিডি প্রতিদিন/এনএইচ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews