হরমুজ প্রণালীকে বলা হয় ‘জ্বালানির বৈশ্বিক দরজা’। অবরোধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল রপ্তানিকারক দেশ যখন বিকল্প পথ খুঁজতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে এবং তেলের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, তখন ইরানের ফ্ল্যাগশিপ জ্বালানি তেল ‘ইরানিয়ান লাইট’ এই রুট দিয়েই অবাধে বহির্বিশ্বে যাচ্ছে। বাজার পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বর্তমানে ইরান থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি হচ্ছে। মজার বিষয় হলো, যুদ্ধের কারণে ইরানের তেল উত্তোলন মোটেও বাধাগ্রস্ত হয়নি। বরং তেলের জোগান অনিয়মিত হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে গত ফেব্রুয়ারি মাসে যে পরিমাণ তেল বিক্রি করে ইরান ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় করত, বর্তমানে একই পরিমাণ তেল বিক্রি করে তাদের আয় হচ্ছে ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার। তেল বিক্রির পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল বা মাশুল আদায় করেও বড় অংকের মুনাফা লুটছে তেহরান।
গত কিছুদিন ধরে এই রুট দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০ লাখ ডলার টোল আদায় করছে দেশটি। শিপিং বিশ্লেষণ সংস্থা ভরটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সরু অঙ্ক প্রায় ২৪ মাইল প্রশস্ত। তবে অধিকাঙ্ক জাহাজ চলাচল হয় দুটি প্রধান শিপিং লেন দিয়ে, যা আরও সঙ্কীর্ণ। বিশেষজ্ঞরা একে যথার্থ কারণেই ‘চোকপয়েন্ট’ বলে অভিহিত করেন। পৃথিবীতে আরও অনেক চোকপয়েন্ট থাকলেও, বিকল্প পথের অভাবে এটি বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং। সঙ্কীর্ণ এই পথের কারণে জাহাজের চলাচলের সুযোগ সীমিত। উন্মুক্ত সমুদ্রে বিকল্প রুট নেওয়া সম্ভব হলেও, এমন সঙ্কীর্ণ জলপথে তা কার্যত অসম্ভব। ফলে ইরানকে লক্ষ্য খুঁজে বের করতে হয় না, তারা অপেক্ষা করলেই চলে। এছাড়া, ইরানের প্রায় ১ হাজার মাইল দীর্ঘ উপকূল রয়েছে, যেখান থেকে তারা জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র মোবাইল লঞ্চার থেকে নিক্ষেপযোগ্য হওয়ায় এগুলো ধ্বংস করা কঠিন। ইরানের উত্তর উপকূল সমতল নয়। সেখানে পাহাড়, উপত্যকা, দ্বীপ ও জনবসতি রয়েছে, যা শত্রুর নজরদারি কঠিন করে তোলে। আর ইরানের জন্য মোবাইল লঞ্চার লুকিয়ে রাখাও তুলনামূলক সহজ। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের নৌবাহিনীর সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। তবে, ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা প্রায় অসম্ভব। ভবিষ্যতেও এই হুমকি বজায় থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিপক্ষের প্রচলিত নৌ সক্ষমতা দুর্বল করতে সক্ষম হলেও সবচেয়ে বড় হুমকি এখনো ইরানের অপ্রচলিত অস্ত্রভা-ার। যেমন ড্রোন, দ্রুতগামী ছোট নৌযান এবং বিস্ফোরকবোঝাই চালকবিহীন নৌকা দিয়ে ইরান মুহূর্তেই যেকোনও তেলবাহী জাহাজে আক্রমণ চালাতে পারে। এছাড়া, ইরান সাধারণ নৌকা থেকেও সমুদ্রে মাইন ফেলে দিতে পারে। বড় সাবমেরিনের পাশাপাশি ছোট আকারের সাবমেরিনও হুমকি হয়ে থাকতে পারে, যা অগভীর পানিতে সহজে চলাচল করতে সক্ষম। ইতোমধ্যে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি অন্তত ১৯টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের লক্ষ্য পূরণে জাহাজ ধ্বংস করা অপরিহার্য নয়। শুধু হুমকি দিলেই শিপিং কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নেবে না। আর এদিকে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যেসব দেশের সঙ্গে ইরানের বৈরিতা নেই, তাদের জাহাজগুলো ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করলে প্রণালী ব্যবহার করতে পারবে। এই প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬টি জাহাজ পার হয়েছে। যার মধ্যে একটি জাহাজ ২০ লাখ ডলার ফি দিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। রয়টার্স।