ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট মোকাবেলা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ ইতোমধ্যে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আইনের বিভিন্ন ধারা, বিশেষ করে ১৮(ক), ৪ এবং সংজ্ঞাগত পরিবর্তনগুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, এই আইন কাক্সিক্ষত সংস্কারের পরিবর্তে ব্যাংক খাতে শিথিলতা, দায়মুক্তি এবং নৈতিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আইনের অন্যতম আলোচিত দিক হলো ৪ ধারা, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে এই আইনের বিধান অন্য যেকোনো আইনের ওপর প্রাধান্য পাবে। এর ফলে ব্যাংক কোম্পানি আইন কার্যত গৌণ আইনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতদিন ব্যাংকিং খাতের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে ব্যাংক কোম্পানি আইন কাজ করলেও নতুন আইনের প্রাধান্য সেই কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে। আইনের এই ভাষাগত প্রাধান্য ভবিষ্যতে আইনি দ্বন্দ্ব তৈরি করলে রেজুলেশন আইনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে, যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
আইনের আরেকটি বড় সমালোচনার জায়গা হলো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষার সংজ্ঞা পরিবর্তন। ‘পরিবার’, ‘পাওনাদার’, ‘তফসিলি ব্যাংক’ ও ‘ব্যাংকিং গ্রুপ’-এসব শব্দ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হলেও ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান’ ও ‘হোল্ডিং কোম্পানি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলো পুরনো আইন থেকে সরাসরি গ্রহণ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো সাধারণ ত্রুটি নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে এমন পরিবর্তন আনা হয়েছে, যাতে আগে সীমাবদ্ধ থাকা কিছু গোষ্ঠী নতুন করে ঋণসুবিধা পেতে পারে। তারা মনে করছেন এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিতে পারেন ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় লুটেরা এস আলম। কারণ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময় তিনি ইসলামী ব্যাংকসহ যেসব ব্যাংকের মালিকানা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বন্দুকের নলের মাধ্যমে নিজের কব্জায় নিয়েছিলেন তার বেশির ভাগ ব্যাংকেরই শেয়ার ধারণ করা হয় ভুয়া কোম্পানি বা কাগজনির্ভর কোম্পানির মাধ্যমে। তার নিজের নামে কোনো শেয়ার নেয়া হয়নি। এসব তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ওই সব শেয়ার ফ্রিজ করা হয়েছে। এখন ব্যাংক রেজুলেশন আইনের মাধ্যমে ওই সব কোম্পানির মাধ্যমে আবারো ব্যাংকের মালিকানা নেয়ার পথ সুগম হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান’ ধারণাটি দীর্ঘ দিন ধরে উচ্চ আদালতে পর্যালোচিত এবং পরিশীলিত হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনিয়ম অন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রভাবিত করত, ফলে ঝুঁঁকি নিয়ন্ত্রণে থাকত। কিন্তু নতুন সংজ্ঞায় এই বাধা অনেকটাই শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে খেলাপি ঋণগ্রহীতারা নতুন করে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন, যা ব্যাংক খাতে নৈতিক ঝুঁকি বাড়াবে। আইনের ৫(গ) ধারায় স্বার্থসংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও নতুন সংজ্ঞার কারণে এর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। অর্থাৎ একটি গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হলেও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই ঋণ পেতে পারে। এতে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে ১৮(ক) ধারা। এই ধারায় আর্থিক অনিয়ম, ঋণকেলেঙ্কারি বা ব্যাংক দখলের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর জন্য পুনর্গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ গুরুতর অনিয়মে জড়িত থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পুনরায় ব্যবস্থাপনায় অংশ নিতে পারেন। এতে করে দায় নির্ধারণ ও শাস্তির পরিবর্তে পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা আইনগত জবাবদিহিতার ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। এ ধারায় আরো অভিযোগ রয়েছে যে, ঋণখেলাপি বা অনিয়মে জড়িত মালিকপক্ষকে পুনরায় শেয়ারধারী বা পরিচালনায় ফেরার সুযোগ দেয়া হয়েছে। যদিও কিছু শর্তের কথা বলা হয়েছে, তবে এসব শর্ত কতটা কঠোরভাবে প্রয়োগ হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এতে করে একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বারবার ব্যাংক দখল ও অনিয়ম করার সুযোগ পেতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা হলো- বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অনেক বিষয় নিষ্পত্তির সুযোগ রাখা। এতে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিচারিক পর্যালোচনা এড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হলে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। আইনের ৩১ ধারায় ‘রেজুলেশন টুল’ উল্লেখ করা হলেও ‘রেজুলেশন মেকিং পাওয়ার’ ও ‘সুপারভাইজারি পাওয়ার’-এর মধ্যে স্পষ্ট সমন্বয় নেই। ফলে একই খাতে ভিন্নধর্মী ক্ষমতা কাঠামো তৈরি হচ্ছে, যা বাস্তব প্রয়োগে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এক দিকে তদারকি ক্ষমতা, অন্য দিকে পুনর্গঠন ক্ষমতা- এই দুইয়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য ব্যাংকিং খাতে নীতিগত জটিলতা তৈরি করবে।
এ ছাড়া আইনের বিভিন্ন ধারায় ‘ব্যাংক’-এর আগে ‘ইসলামী’ শব্দ ব্যবহার করা হলেও এর কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেয়া হয়নি। এতে করে নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাংকের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করা হচ্ছে কি না- এ প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনে যেখানে সব ব্যাংকের জন্য সমান বিধান রাখা হয়েছিল, সেখানে নতুন আইনে ভিন্নতা তৈরি হওয়া নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। আইনের ভাষা ও কাঠামো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি ব্যাংক খাতে একটি সঙ্কট ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করতে চাইলেও এর মধ্যে বেশ কিছু ফাঁকফোকর রয়েছে। এসব ফাঁকফোকর ভবিষ্যতে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সংজ্ঞা পরিবর্তন, দায়মুক্তির সুযোগ এবং আইনের প্রাধান্য- এই তিনটি বিষয় ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ইতোমধ্যে উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং স্বচ্ছতার ঘাটতির মতো সমস্যায় জর্জরিত। এই বাস্তবতায় নতুন কোনো আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আরো সতর্কতা প্রয়োজন ছিল; কিন্তু বর্তমান রেজুলেশন আইনের কিছু ধারা সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সবমিলিয়ে ব্যাংক রেজুলেশন আইনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও এর বর্তমান কাঠামোতে গুরুতর সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দায়মুক্তির সুযোগ কমিয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, সংজ্ঞাগত অস্পষ্টতা দূর করা এবং বিদ্যমান আইনের সাথে সামঞ্জস্য আনা জরুরি। অন্যথায় এই আইন ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে আরো অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি ও অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে।