বর্ষা বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্বস্তি ও প্রাণের ঋতু। কিন্তু এ সময়ের অতিরিক্ত আর্দ্রতা, ঘাম, ভেজা কাপড় এবং দীর্ঘক্ষণ স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে থাকার কারণে ত্বকের বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ছত্রাকজনিত (Fungal) চর্মরোগ। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে দেশের চর্মরোগ বহির্বিভাগে আগত রোগীদের একটি বড় অংশই ছত্রাকজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত থাকেন। বিশ্বে ছত্রাকজনিত চর্মরোগে আক্রান্তের সংখ্যা শত কোটি ছাড়িয়েছে। সব চর্মরোগের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ ছত্রাকজনিত। ২০১৬ সালে আক্রান্তের আনুমানিক সংখ্যা ২.১ বিলিয়ন। বর্তমান বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাব ৬১৬.৫ মিলিয়ন। ২০১৬ সালের তুলনায় ২০২১ সালে এ রোগের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। উষ্ণ ও আর্দ্র দেশগুলোতে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি। অনেকেই দাদ বা ছত্রাকজনিত রোগকে সাধারণ সমস্যা মনে করে ফার্মেসি থেকে ইচ্ছামতো ক্রিম কিনে ব্যবহার করেন। বাসায় ইচ্ছামতো ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এতে সাময়িকভাবে চুলকানি কমলেও রোগ পুরোপুরি সারে না। বরং স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিমের অপব্যবহারে রোগের প্রকৃত রূপ পরিবর্তিত হয়ে চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে পড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।

* ছত্রাক কী

ছত্রাক হলো অণুজীবের একটি বিশেষ শ্রেণি, যারা উষ্ণ, আর্দ্র ও অন্ধকার পরিবেশে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মানুষের ত্বক, চুল ও নখে এদের সংক্রমণ হলে তাকে Superficial Fungal Infection বলা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই Dermatophytes, Candida এবং Malasseyia নামক ছত্রাক এ ধরনের সংক্রমণের জন্য দায়ী।

* বর্ষায় কেন সংক্রমণ বেড়ে যায়

বর্ষাকালে কয়েকটি কারণে ছত্রাকের বিস্তার দ্রুত ঘটে-

▶ অতিরিক্ত আর্দ্রতা বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকায় ত্বক দীর্ঘ সময় ভেজা থাকে।

▶ অতিরিক্ত ঘাম ত্বকের ভাঁজে জমে ছত্রাক বৃদ্ধির আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।

▶ ভেজা কাপড় বৃষ্টিতে ভিজে দীর্ঘ সময় একই পোশাক পরে থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

▶ আঁটোসাঁটো পোশাক বাতাস চলাচল কম হওয়ায় ত্বক শুকাতে পারে না। অপরিচ্ছন্নতা, একই তোয়ালে, কাপড় বা জুতা ভাগাভাগি করলে সহজেই সংক্রমণ ছড়ায়।

* কারা বেশি ঝুঁকিতে

ছত্রাকজনিত রোগ যে কারও হতে পারে, তবে কিছু মানুষের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। যেমন-ডায়াবেটিস রোগী, স্থূল বা অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তি, অতিরিক্ত ঘাম হয় যাদের, কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক ও মাঠে কাজ করেন যারা, খেলোয়াড় ও নিয়মিত জিমে যান যারা, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারকারী, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন ব্যক্তি।

* কীভাবে ছড়ায়

অনেকেই মনে করেন দাদ শুধু অপরিষ্কার মানুষের হয়। এটি একটি ভুল ধারণা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মানুষও আক্রান্ত হতে পারেন। সংক্রমণ ছড়াতে পারে, আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বকের সংস্পর্শে, একই তোয়ালে বা কাপড় ব্যবহার করলে, বিছানার চাদর ভাগাভাগি করলে, জিম বা সুইমিং পুলের ভেজা মেঝে থেকে, পোষা প্রাণীর মাধ্যমে, নিজের শরীরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়ায়।

সাধারণত বর্ষায় যেসব ছত্রাকজনিত রোগ বেশি দেখা যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

* দাদ (Tinea corporis)

এটি শরীরের যে কোনো অংশে হতে পারে। সাধারণত গোলাকার লালচে দাগ দেখা যায়, যার কিনারা উঁচু এবং মাঝখান তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকে। তীব্র চুলকানি এর প্রধান লক্ষণ।

▶ যেভাবে যত্ন নেবেন : শরীরের যে কোনো স্থানে গোলাকার লালচে দাগ ও চুলকানি দেখা দিলে তা দাদ হতে পারে।

▶ যা করবেন : আক্রান্ত স্থান সবসময় পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন। গোসলের পর নরম তোয়ালে দিয়ে আলতোভাবে মুছে নিন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ব্যবহার করুন। প্রতিদিন পরিষ্কার সুতি পোশাক পরুন।

▶ যা করবেন না : চুলকানোর জন্য নখ ব্যবহার করবেন না। নিজে থেকে স্টেরয়েডযুক্ত মিশ্রিত ক্রিম ব্যবহার করবেন না। উপসর্গ কমে গেলেই ওষুধ বন্ধ করবেন না।

* কুঁচকির দাদ (Tinea cruris)

বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কুঁচকি, উরুর ভাঁজ এবং নিতম্বের আশপাশে লালচে দাগ, চুলকানি ও জ্বালাপোড়া হয়। দীর্ঘক্ষণ ভেজা অন্তর্বাস ব্যবহার করলে ঝুঁকি বাড়ে।

▶ বিশেষ সতর্কতা : এটি বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। করণীয় হলো, ঢিলেঢালা সুতি অন্তর্বাস ব্যবহার করুন। অন্তর্বাস দিনে অন্তত একবার পরিবর্তন করুন। অতিরিক্ত ঘাম হলে দ্রুত শুকনো কাপড় পরুন। ব্যায়াম বা মাঠে কাজের পর গোসল করুন।

* পায়ের ছত্রাক (Athlete's Foot)

পায়ের আঙুলের ফাঁকে সাদা হয়ে যাওয়া, চামড়া উঠে যাওয়া, দুর্গন্ধ এবং চুলকানি দেখা দেয়। যারা সারাদিন জুতা পরে থাকেন, তাদের মধ্যে এটি বেশি হয়। পায়ের ছত্রাকে অনেকেই শুধু ওষুধ ব্যবহার করেন, কিন্তু পা ভেজা রাখার কারণে সংক্রমণ আবার ফিরে আসে।

▶ ত্বকের যত্ন : প্রতিদিন সাবান ও পানি দিয়ে পা ধুয়ে আঙুলের ফাঁক ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। ভেজা মোজা কখনো ব্যবহার করবেন না। প্রতিদিন পরিষ্কার মোজা ব্যবহার করুন। একই জুতা টানা কয়েক দিন না পরে পর্যায়ক্রমে ব্যবহার করুন।

* নখের ছত্রাক (Oûchomycosis)

নখ মোটা হয়ে যায়, রং পরিবর্তন হয়, ভঙ্গুর হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে বিকৃত হতে পারে। চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি।

নখের সংক্রমণ ধীরে সারে এবং ধৈর্য প্রয়োজন।

▶ পরামর্শ : নখ ছোট রাখুন। নখ কাটার যন্ত্র অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করবেন না। প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ লাগতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করবেন না।

* ক্যান্ডিডা সংক্রমণ

শরীরের ভাঁজ, যেমন বগল, স্তনের নিচে, কুঁচকি বা মোটা মানুষের ত্বকের ভাঁজে বেশি দেখা যায়। লালচে র‌্যাশ, জ্বালাপোড়া এবং ছোট ছোট দানা হতে পারে।

শরীরের ভাঁজে আর্দ্রতা জমে থাকলে এ সংক্রমণ বেশি হয়।

▶ যত্নের নিয়ম : বগল, কুঁচকি ও স্তনের নিচের অংশ শুকনো রাখুন। ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন। সুতি কাপড় ব্যবহার করুন। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।

* পিটিরিয়াসিস ভার্সিকালার

ঘাড়, বুক ও পিঠে সাদা, বাদামি বা হালকা রঙের দাগ দেখা যায়। অনেকেই একে ‘সাদা দাদ’ বলে ভুল করেন। এটি সাধারণত প্রাণঘাতী নয়, তবে চিকিৎসা প্রয়োজন।

▶ কী কী লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন : তীব্র চুলকানি, লালচে বা গোলাকার দাগ, খোসা ওঠা, জ্বালাপোড়া, ত্বক ফেটে যাওয়া, দুর্গন্ধ, নখের রং পরিবর্তন, ত্বকে সাদা বা বাদামি দাগ, এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

▶ কেন অবহেলা করা উচিত নয় : অনেকেই মনে করেন, ‘চুলকানি তো একটু আছে, পরে দেখাব’। কিন্তু অবহেলা করলে, সংক্রমণ শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিবারের অন্য সদস্য আক্রান্ত হতে পারেন। নখ ও মাথার ত্বক আক্রান্ত হলে চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি হয়। বারবার সংক্রমণ ফিরে আসতে পারে। স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম ব্যবহারে রোগের চেহারা বদলে গিয়ে চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

বর্ষায় ত্বক পরিষ্কার ও শুকনো রাখা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ছত্রাকজনিত চর্মরোগ প্রতিরোধের প্রথম ধাপ।

* রোগভেদে ত্বকের যত্ন ও প্রতিরোধ

ছত্রাকজনিত চর্মরোগের চিকিৎসায় একটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ওষুধ নয়, সঠিক ত্বকের যত্নও সমান জরুরি। অনেক রোগী ওষুধ ব্যবহার করলেও পরিচ্ছন্নতা ও জীবনযাপনের নিয়ম না মানার কারণে বারবার একই সমস্যায় আক্রান্ত হন।

* স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম

নীরব বিপদ। বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো প্রেসক্রিপশন ছাড়া স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম ব্যবহার। এসব ক্রিমে সাময়িকভাবে চুলকানি কমলেও ছত্রাক সম্পূর্ণ নষ্ট হয় না। ফলে রোগটি ভেতরে ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে চিকিৎসা অনেক কঠিন হয়ে যায়।

* স্টেরয়েডের অপব্যবহার

রোগের প্রকৃত চেহারা বদলে যায়। ত্বক পাতলা হয়ে যেতে পারে। সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হয়। একই রোগ বারবার ফিরে আসে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম ব্যবহার করা উচিত নয়।

লেখক : ডিপ্লোমা ইন ডার্মাটোলজি, সেক্স এডু উইথ ডক্টর দৃষ্টি।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews