সম্প্রতি সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু মন্তব্য আমাদেরকে যুগপথ আশান্বিত ও শংকিত করেছে। শংকার কারণ হচ্ছে, শেখ হাসিনার ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী আমলে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইসলাম ও ধর্মীয় মূল্যবোধশূন্য করার উদ্দেশ্যে যে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে তা এখনো বলবৎ আছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার অনেকগুলো সংস্কার কমিশন করলেও জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের ব্যাপারে কোনো কমিশন গঠন করেনি। তাতে প্রতীয়মান হয়েছে, ভবিষ্যত প্রজন্মকে হিন্দুত্ববাদী ও নাস্তিক্যবাদী মতাদর্শে দীক্ষিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত শিক্ষানীতি কার্যকর করার ব্যাপারে নেপথ্যের কুশিলবরা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল ও আছে।

ফ্যাসিবাদী সরকার শেষ পর্যন্ত স্কুলের নবম দশম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা হতে ১০০ নম্বরের ধর্মীয় শিক্ষা বাতিল করেছিল। এই পদক্ষেপ পতিত সরকারের প্রতি জনরোষ ধূমায়িত করে জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পটভূমি রচনায় ভূমিকা পালন করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর দশম শ্রেণির পরীক্ষায় পূর্বের ১০০ নম্বরের ধর্মশিক্ষা বহাল হলেও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন হয়নি, আগের মতই রয়ে গেছে।

আমাদের সংবিধানে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃত এবং প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে স্বীকার করা হয়েছে। বর্তমান সরকারও মহানবী (সা.)-এর ন্যায়পরায়নতার আদর্শে চালানো এবং সংবিধানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সংযোজিত ‘আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস’-এর মূলনীতি পুনঃস্থাপনের ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন শেষে ক্ষমতায় এসেছে। কাজেই জনপ্রত্যাশা, নির্বাচনী ওয়াদা ও সংবিধানের সামগ্রিক চেতনার আলোকে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামী তথা ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা, শিক্ষা ও আদর্শের প্রতিফলন ঘটানোর জন্যে সরকারের কাছে আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা।

শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বব্যাপী সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নতির সাথে সঙ্গত করার কথা বলা হচ্ছে। এই সুন্দর চিন্তা ও প্রস্তাবনার সাথে বিবেচনার জন্য আমরা কিছুকথা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলদের গোচরে আনতে চাই।
আমাদের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রধান তিনটি ভাগে বিভক্ত; মানবিক, বিজ্ঞান ও কমার্স। ছাত্ররা স্কুলের নবম শ্রেণি থেকে মনস্থির করে ভবিষ্যতে কি সাইন্স নিয়ে পড়বে, নাকি কমার্সে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে, কিংবা মানবিকে সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের কোনো সাব্জেক্টে ক্যারিয়ার গড়বে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির কারণে শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক সময় সাইন্সের বাইরে বকি দুটি প্রধান ভাগকে গুরুত্বহীন হিসেবে গণ্য করা হয়। বিজ্ঞান বিষয়ক কোনো সাব্জেক্টে ভর্তি হতে পারলেই ছাত্রছাত্রীরা জীবন সার্থক বলে মনে করে। অথচ, বর্তমান বিশ্বের প্রগতির চাকা কমার্সের উপরই চলছে, আমেরিকা যখন তখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বিভিন্ন দেশ ও জাতিকে কাবু করে ফেলছে। ব্যাংকিং লেনদেনের মারপ্যাঁচে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বেহাল দশা দেখলে মনে হবে বিষয় হিসেবে কমার্সের গুরুত্ব সাইন্সের চাইতেও বেশি। তবে সত্য হল, সাইন্স ও কমার্সে টাকা পয়সার আমদানির সুযোগ অবারিত; এই কারণে মানবিকের ছাত্রছাত্রীদের দেখলে করুণা হয়।

কিন্তু গভীর দৃষ্টিতে তাকালে মানবিকের গুরুত্ব কমার্স ও সাইন্সের চাইতে অনেক বেশি। কারণ, মানুষকে অন্যান্য জীব থেকে আলাদা করতে হলে তার মধ্যে মানবীয় গুণ, বৈশিষ্ট্য, স্বভাব ও সমাজ-সংস্কৃতির বিকাশ হতে হবে; এ জন্যেই মানবিক অনুষদে সাহিত্য, ইতিহাস, আইন, শিল্প-সংস্কৃতি, দর্শন ধর্মতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয় পড়ানো হয়।
আমরা যদি কেবল সাইন্স ও কমার্সের জয়গান গাই তাহলে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ কোথায় পাব? পারস্পরিক সম্পর্ক, বিয়ে শাদী, সন্তান লালন-পালন, আইন বিচার, সমাজ সংসার ছেড়ে দিয়ে কেবল বিজ্ঞান ও কমার্সের দোহাই দিলে মানব সভ্যতা তো উচ্ছন্নে যাবে। এর সত্যতা প্রমাণের জন্য সম্প্রতি আমেরিকায় এপেস্টেইন কা-ের যে লোমহর্ষক অসভ্যতায় বিশ্বের নামী দামী নেতারা কলুষিত থাকার তথ্য ফাঁঁস হয়েছে, ওটুকুই যথেষ্ট। মানবিককে বাদ দিয়ে সাইন্স টেকনোলজির দোহাই দিয়ে আমরা মানুষকে রোবোটে পরিণত করার কথা বলতে পারব না।

বিশ্বব্যাপী যারা দেশ পরিচালনা করছে তাদের অধিকাংশই মানবিক অনুষদের ছাত্র। সাইন্স ও কমার্সের লোকেরা টাকা পয়সার হিসাব নিকাশে ডুবে থাকার কারণে সমাজ ও রাষ্ট্রে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আসতে পারেন না। মানবিকে যারা লেখাপড়া করে তারাই সমাজ ও রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক অনুষদের অন্তর্গত হচ্ছে ধর্মতত্ত্ব, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ইত্যাদি। বিষয়গুলো আমাদের সমাজে দুটি শাখায় বিভক্ত। একটি শাখা বিশ্ববিদ্যালয়ে, আরেকটি শাখা মাদরাসায়। কুরআন, হাদীস, ফিকাহ, ইসলামের ইতিহাস, আরবি সাহিত্য প্রভৃতি বিষয় আমাদের দেশে পবিত্র জ্ঞান করা হয় এবং ধর্মীয় অনুভূতির সাথে সম্পৃক্ত। আমাদের ধর্মীয় অনুভূতি হচ্ছে, এসব বিষয়ে পুঁথিগত বিদ্যার সাথে বাস্তব অনুশীলনের কিংবা ইলমের সঙ্গে আমলের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পুঁথিগত বিদ্যার উন্নত চর্চা থাকলেও বাস্তব অনুশীলন বা ইলমের সঙ্গে আমলের পরিচর্যা নেই। এগুলোর প্রধান চর্চাকেন্দ্র হচ্ছে মাদরাসা। মাদরাসা শিক্ষায় কুরআন হাদীসের মর্মবাণী বুঝার জন্য সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলো অত্যন্ত যতœ সহকারে পড়ানো হয়। শিক্ষক ছাত্ররা আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর হুকুম আহকাম পালনে যারপর নাই যতœ নেন, যে পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুপস্থিত। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় সাব্জেক্ট পড়ে বড়জোর অরিয়েন্টালিস্ট বা স্কলার হওয়া যাবে, আলেম বা ধর্মীয় নেতা হওয়া যাবে না। কারণ, সেখানে আমল, পাক-পবিত্রতা ও শরীয়ত পরিপালনের পরিবেশ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ার টয়লেটগুলো পরিদর্শন করলেই আমার কথার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যাবে। কেননা, সেখানে বাথরুম সারার পর পবিত্রতা অর্জনের ব্যবস্থা খুবই সীমিত।

কুরআন হাদীসের চুলচেরা বিশ্লেষণ, আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর আদেশ নিষেধের সযতœ অনুশীলন, আদব-আখলাক প্রভৃতির পরিচর্যার জন্য মাদরাসা শিক্ষার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অবশ্যই বলবৎ থাকতে হবে। তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের মাদরাসা শিক্ষা গ্রহণের পর যারা জেনারেল সব্জেক্টে পড়ার জন্য জেনারেল লাইনে চলে আসতে চাইবে তাদের জন্য ফটক খুলে রাখতে হবে। এরপর যারা ইসলামী বিশেষজ্ঞ হতে চাইবে তারা মাদরাসা অঙ্গনেই থাকবে। বর্তমানে আলিয়া নেসাবের মাদরাসাগুলো থেকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসার সুযোগ খোলা আছে। তবে বিপত্তি হচ্ছে, আলিয়া নেসাবের মাদরাসাগুলোকে আধুনিকায়নের টোপ দিয়ে এমন অবস্থা করা হয়েছে, যার ফলে আলিয়া মাদরাসাগুলো অতীতের নিউস্কিম মাদরাসার ভাগ্য বরণের উপক্রম হয়েছে।
বৃটিশ আমলে ১৯১৫ সালে আলিয়া নেসাবের মাদরাসাগুলোকে আধুনিকায়নের নামে একটি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল, নাম দেয়া হয়েছিল নিউস্কিম। ঢাকা, ছারছীনা ও সিলেট আলিয়া বাদে সবগুলো মাদরাসা নিউস্কিমের টোপ গিলেছিল এবং ১৯৫৭ সালে এসে আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক সরকার এক ঘোষণা বলে প্রায় দেড় হাজার মাদরাসাকে স্কুল কলেজে পরিণত করেছিল। যেমন ঢাকা নজরুল কলেজ, আরমানিটোলা হাম্মাদিয়া হাইস্কুল, চট্টগ্রামের মহসিন কলেজ, ভোলার এ রব হাই স্কুল প্রভৃতি। আমাদের জোরালো প্রস্তাব হচ্ছে, আলিয়া নেসাবের মাদরাসাগুলোর দাখিল স্তরে আরবি ভাষাতত্ত্ব, ফিকাহ শেখানোর ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। মাদরাসা শিক্ষার নিজস্ব ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রাখতে হবে।

কওমী মাদরাসাগুলো এখন আধুনিকায়নের জন্য একপা খাড়া হয়ে আছে। তাদের কর্তাদের বলব, আলিয়া নেসাবের সংস্কার প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু শেখার চিন্তা করেন, নচেত আপনাদের দশাও পর্যায়ক্রমে নিউস্কিমের মতো হবে।
স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যাতে মানবীয় গুণসম্পন্ন হয়ে বের হয়, তার জন্য আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হচ্ছে, প্রাইমারী থেকে পরিকল্পিত সিলেবাস ও কারিকুলাম অনুসরণ করে ধর্মীয় ও আরবি শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। স্কুল কলেজের একটি স্তরে গিয়ে যারা স্কুল থেকে মাদরাসায় এসে উচ্চতর ইসলামী জ্ঞান অর্জন ও বিশেষজ্ঞ হতে চাইবে তাদের জন্য স্কুল থেকে মাদরাসায় চলে আসার করিডোর খোলা রাখতে হবে।
আমরা লক্ষ্য করেছি, এ পর্যন্ত যতবারই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের জিগির তুলে মাদরাসায় দীনি ও আরবি শিক্ষার গলা টিপে ধরা হয়েছে। অথচ জেনারেল শিক্ষায় ধর্মীয় শিক্ষার পরিচর্যা করার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। পক্ষান্তরে আগে থেকে যেটুকু চালু ছিল তাও বন্ধ বা কোণঠাসা করে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে কলেজ বা এইচ এসসি লেভেলের ইসলামী শিক্ষার ব্যবস্থা রহিত করে। ২০১০ এ জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের মাধ্যমে স্কুলের নবম ও দশম শ্রেণি এবং দশমের পাবলিক পরীক্ষা থেকে ১০০ নম্বরের ধর্মীয় শিক্ষা রহিত করে।

আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হচ্ছে, বর্তমান সফল ও জনপ্রিয় নূরানী পদ্ধতির সাথে সমন্বয় করে প্রাইমারি শিক্ষাকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে একজন ছাত্র পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর কুরআন মজিদ তেলাওয়াত করতে ও নামায পড়তে পারে এবং ইসলামের প্রাথমিক আকিদা বিশ্বাস ও আদব আখলাকের সাথে অভ্যস্ত হয়। হাইস্কুল পর্যায়ে পাবলিক পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক বহাল রাখতে হবে এবং ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১০ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ পরিকল্পনা এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে একজন মুসলমানের ধর্মীয় জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হাসিল করতে পারে। একইভাবে কলেজ লেভেলে সাইন্স, কমার্স ও মানবিকে একশ নম্বরের ইসলামিক স্টাডিজ শিক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরুতে ১০০ নম্বরের ইসলামিক স্টাডিজের ফাউন্ডেশন কোর্স এবং প্রতিটি ডিসিপ্লিন বা বিভাগে হাদীস, কুরআন, ইসলামের ইতিহাস ও ফিকাহ শাস্ত্র থেকে ৪/৫টি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাহলেই আমরা ধর্মীয় চেতনাসম্পন্ন আদর্শ নাগরিক গড়ে তুলতে সক্ষম হব। মনে রাখতে হবে, ইসলামী শিক্ষার ক্ষেত্র কেবল মাদরাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি সাব্জেক্টে ইসলামী শিক্ষার বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য তাদের ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব। এ ব্যাপারে দেশপ্রেমিক সবাইকে সজাগ ও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
লেখক: গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবিদ।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews