প্রয়াত মার্কিন ধনকুবের এবং দ-িত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং কট্টরপন্থী সেটলার গোষ্ঠীগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নতুন তথ্য সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত কয়েক মিলিয়ন নথির বরাতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে।
প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআই-এর লস অ্যাঞ্জেলেস অফিসের ২০২০ সালের একটি মেমোতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এপস্টেইন ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’-এর একজন প্রশিক্ষিত এজেন্ট ছিলেন বলে ধারণা করা হতো। যদিও এই দাবির পক্ষে শতভাগ প্রমাণ এখনও মেলেনি, তবে নথিতে তাকে ইসরাইলি গোয়েন্দা বৃত্তের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের সঙ্গে এপস্টেইনের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। শুধু তাই নয়, ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা ইয়োনি কোরেনের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। এমনকি ২০১২ সালে কোরেনের ক্যান্সারের চিকিৎসার খরচও এপস্টেইন পরিশোধ করেছিলেন বলে ইমেইল মারফত জানা গেছে।
এপস্টেইন কেবল গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না, বরং ইসরাইলি ভূখ-ে সক্রিয় বিতর্কিত গোষ্ঠীগুলোতেও বড় অংকের অর্থায়ন করতেন। ২০০৬ সালে তিনি ‘ফ্রেন্ডস অফ দ্য ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সেস’ সংস্থাকে ২৫ হাজার ডলার এবং ‘জিউইশ ন্যাশনাল ফান্ড’-কে ১৫ হাজার ডলার দান করেন। উল্লেখ্য, এই সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। এপস্টেইনের দীর্ঘদিনের সঙ্গী ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েলের বাবা ব্রিটিশ মিডিয়া টাইকুন রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গেও মোসাদের যোগসূত্র থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এপস্টেইন ২০১৮ সালের একটি ইমেইলে দাবি করেছিলেন যে, রবার্ট ম্যাক্সওয়েল মোসাদের হয়ে তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং শেষ জীবনে ইসরাইলের কাছে বিপুল অর্থ দাবি করায় তাকে হত্যা করা হতে পারে বলে তিনি সন্দেহ করতেন।
এসব তথ্যের বিপরীতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছেন, এহুদ বারাকের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্ক মানেই তিনি ইসরাইলের হয়ে কাজ করেছেন তা নয়, বরং এটি বারাকের রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রমাণ। অন্যদিকে, এপস্টেইনের আইনজীবী অ্যালান ডারশোভিৎজ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, কোনো গোয়েন্দা সংস্থা এপস্টেইনের মতো ব্যক্তিকে বিশ্বাস করার কথা নয়। এপস্টেইন ২০১৯ সালে কারাগারে মারা গেলেও তার নেটওয়ার্ক এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার গোপন আঁতাত নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখনো চাঞ্চল্য অব্যাহত রয়েছে। নতুন এই নথিপত্রগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও গোয়েন্দা দুনিয়ায় নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান স্টারমারের : ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) পদত্যাগের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত নিয়োগের সিদ্ধান্তের পর তার সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকলেও তিনি বলেছেন, “আমি দেশ বদলানোর জন্য এত কষ্ট করে এসেছি, এখন পদত্যাগ করে দেশকে অরাজকতার মুখে ঠেলে দেব না।”
স্কটিশ লেবার পার্টির নেতা আনাস সারওয়ারের মতো দলেরই একজন শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করার পরও প্রধানমন্ত্রী তার অবস্থানে অটল রয়েছেন। সারওয়ার বলেছেন, “ডাউনিং স্ট্রিটের নেতৃত্বে পরিবর্তন দরকার। এই বিভ্রান্তি শেষ করতে হবে।” মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিতে দেখা গেছে, ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় ম্যান্ডেলসন এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পদ বিক্রি ও কর পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা ফাঁস করেছিলেন বলে অভিযোগ। প্রধানমন্ত্রী লেবার সাংসদদের বৈঠকে বলেন, “আমি আমার ম্যান্ডেট ও দেশের প্রতি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াব না। আমাদের লড়াই হলো নাইজেল ফারাজের রিফর্ম পার্টির মতো পপুলিস্টদের ক্ষমতায় আসা ঠেকানো। এটা আমাদের সবার লড়াই।” বৈঠকে সংসদ সদস্যরা করতালি দিয়ে সমর্থন জানান। ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রায়নার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি, অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারসহ শীর্ষ মন্ত্রীরা স্টারমারের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন। রায়নার এক্স-এ লিখেছেন: “প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করব।” কনজারভেটিভ পার্টির নেত্রী কেমি ব্যাডেনক বলেন, “স্টারমার একটা প্লাস্টিকের ব্যাগের মতো বাতাসে উড়ছেন। তিনি যদি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, তাহলে লেবার পার্টির অন্য কেউ করুকÑঅথবা নির্বাচন দিন।” উল্লেখ্য, সংকটের কারণে সরকারি ঋণের সুদহার বেড়েছে, পাউন্ডের মান ইউরোর বিপরীতে কমেছে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, স্টারমারের পতন হলে আরও বামপন্থী নেতৃত্ব এলে ঋণ ও ব্যয় বাড়তে পারে। স্টারমার এখনও নিরাপদ মনে হচ্ছে। কিন্তু তার সরকারের প্রায় দুই বছরের শাসনকালে গাফিলতি, নীতি-পরিবর্তন ও যোগাযোগ বিভাগের চারজন প্রধানের পদত্যাগের রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একজন লেবার এমপি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “এটা যেন ধীর গতিতে চলা একটা মারাত্মক দুর্ঘটনা দেখছি।” স্টারমারের সামনে এখন দুটি লড়াই: এপস্টেইন-ম্যান্ডেলসন কেলেঙ্কারি থেকে বেরিয়ে আসা এবং ২০২৯ সালের নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা। সূত্র : আল-জাজিরা, এসসিএমপি।