দীর্ঘ চাকরি জীবনে একের পর এক প্রশাসনিক বঞ্চনা, বিভাগীয় মামলা, পদোন্নতি আটকে যাওয়া, কাঙ্ক্ষিত পদায়ন না পাওয়া-সবকিছুর মধ্যেও পুলিশ বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত ডিসি, সিটিটিসি) মো. ইলিয়াস কবির। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ তুলে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় তাঁকে কৌশলে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল। সরকারের পরিবর্তনের পরও সেই বঞ্চনার পুরো অবসান হয়নি।

পুলিশ সূত্র ও সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইলিয়াস কবির ২০০৬ সালে ২৫তম বিসিএসে পুলিশ সার্ভিসে যোগ দেন। ২০০৮ সালে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগে সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) হিসেবে কর্মরত থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় ট্যাগ ও বিভিন্ন অভিযোগ এনে বিভাগীয় মামলা করা হয়। পরে তাঁকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়। প্রায় ১৪ (চৌদ্দ) বছর তিনি কার্যত কর্মহীন অবস্থায় সংযুক্ত থেকে চাকরি করেন।

ইলিয়াস কবিরের ভাষ্য, ছাত্রজীবনে জাতীয়তাবাদী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণেই তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে। চাকরি স্থায়ীকরণ, উচ্চতর প্রশিক্ষণ, এমনকি সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতিও পাননি তিনি। তাঁর দাবি 'পেশাদার দায়িত্ব পালন করলেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট থেকে দূরে রাখা হয়েছে।'

সূত্র জানায়, ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি রাঙামাটিতে সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। পরে দীর্ঘ সময় পুলিশ সদরদপ্তরে টিআর পদে রেখে টাঙ্গাইল ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে ৯ বছর সংযুক্ত রাখা হয়। তবে ২০২৪ এর বিপ্লবের পরেও ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের ক্ষেত্রে তিনি প্রত্যাশিত মূল্যায়ন পাননি বলে সহকর্মীদের অনেকেই মনে করেন।

পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনেও এই বঞ্চনার প্রভাব পড়ে বলে জানান ইলিয়াস কবির। তাঁর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান রয়েছে। সন্তানের চিকিৎসার সুবিধার কথা বিবেচনায় ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে আবেদন করলেও সেটি পাননি। তাঁর বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত থাকাকালে বিদেশে চিকিৎসার জন্য ছুটির আবেদন করেও অনুমতি পাননি বলে দাবি করেন তিনি।

ইলিয়াস কবির বলেন, 'আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমার পুরো পরিবারকে এক ধরনের মানসিক চাপে রাখা হয়েছিল। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্যও পরোক্ষ চাপ ছিল। তারপরও আমি পেশাদারিত্ব থেকে সরে আসিনি।'

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাঁর প্রত্যাশিত মূল্যায়ন হয়নি বলে দাবি করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি জানান, ডিএমপির গোয়েন্দা রমনা বিভাগে (ডিবি) দায়িত্ব পালনকালে আলোচিত কয়েকটি অভিযানে তিনি ভূমিকা রাখেন। এর মধ্যে- আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অজয় কর খোকন, বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সহ অসংখ্য সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছেন তিনি। তবে কৌশলে তাঁকে সেখান থেকেও (ডিবি) সরিয়ে দেওয়া হয়।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিগত এক দশকে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক কর্মকর্তাকে প্রশাসনিকভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ এখনও সেই প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ইলিয়াস কবির তাঁদেরই একজন।

ইলিয়াস কবির মনে করেন, বর্তমান সরকারের প্রশাসনের উচিত অতীতে বৈষম্যের শিকার হওয়া কর্মকর্তাদের বিষয়ে পুনর্মূল্যায়ন করা। তিনি বলেন, 'রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য রেখে দায়িত্ব পালন করেছি। এখন শুধু ন্যায্য মূল্যায়ন ও বৈষম্যমুক্ত কর্মপরিবেশ চাই।'

পুলিশ প্রশাসনের পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘ সময় বঞ্চনার পরও দায়িত্বে সক্রিয় থাকা কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও পেশাদার দক্ষতাকে কাজে লাগানো গেলে বাহিনী আরও শক্তিশালী হতে পারে।

এদিকে বিসিএস ২৫তম ব্যাচের অধিকাংশ কর্মকর্তা ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলায় পুলিশ সুপার (এসপি) পদে দায়িত্ব পালন করলেও ইলিয়াস কবির এখনো সেই সুযোগ পাননি। এই কর্মকর্তাকে নিয়ে সহকর্মীদের মধ্যে রয়েছে ইতিবাচক মূল্যায়ন। তাঁদের মতে, প্রশাসনিক নানা জটিলতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ইলিয়াস কবিরের পদোন্নতির বিষয়টি পিছিয়ে যায়। সেসময় তাঁর বিষয়টি আলোচনায় এলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। তবে বর্তমান সরকারের সময়ে পেশাদারিত্ব ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে ইলিয়াস কবির যথাযথ মূল্যায়ন পাবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, একজন পেশাদার ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে ইলিয়াস কবিরের সুনাম রয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে সফলতা দেখিয়েছেন। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও কৌশলের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আস্থা অর্জন করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কোনো অপরাধী শনাক্ত হওয়ার পর তাকে পরিকল্পিতভাবে নজরদারিতে এনে ঝামেলা ছাড়াই ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল উল্লেখযোগ্য। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে তাঁর ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন সহকর্মীরা। তাঁদের ভাষ্য, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, সোর্স ম্যানেজমেন্ট এবং অভিযান সমন্বয়ে ইলিয়াস কবিরকে সব সময়ই কার্যকর কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews