ছবির উৎস, AFP via Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
মোজতবা হলেন ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা
Author,
লিস ডুসেট
Role,
চিফ ইন্টারন্যাশনাল করেসপন্ডেন্ট
৫ ঘন্টা আগে
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
ইরানের শাসনব্যবস্থা যখন পাঁচ দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে, ঠিক তখনই দেশটির হাল ধরলেন এমন একজন নেতা যিনি এর আগে কখনোই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি।
এই যুদ্ধের একদম শুরুতেই তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও পারিবারিক প্রভাবই তার ৫৬ বছর বয়সী ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর মোজতবা হলেন ইরানের তৃতীয় সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা। তবে এমন এক সময়ে তিনি দায়িত্ব নিলেন যখন ইরান নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে।
৮৮ জন মুসলিম শিয়া কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস' মোজতবাকে বাছাই করার পরপরই বিপ্লবের কট্টর সমর্থকরা ইরানের রাজপথে নেমে আসেন। 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত করে তোলেন তারা।
ইরানের সবগুলো নিরাপত্তা বাহিনী তাদের নতুন কমান্ডার ইন চিফের প্রতি "শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত" অনুগত থাকার শপথ নিয়েছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখা গেছে, মোজতবার নামে ছোঁড়া প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গায়ে লেখা ছিল, "আপনার সেবায় নিয়োজিত, সৈয়দ মোজতবা"।
তবে, বিরোধিতাও রয়েছে, জানুয়ারিতে তার বাবাকে 'স্বৈরশাসক' আখ্যা দিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন যারা তারা গতরাতেও "মোজতবার মৃত্যু চাই" বলে স্লোগান দিয়েছেন।
এই আন্দোলনে প্রাণ হারানো হাজার হাজার মানুষের জন্য যারা এখনো শোক পালন করছেন তারা মনে করছেন ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন আরো কঠোর, কট্টরপন্থি হবে।
তারা এখনো আশা করতে সাহস করছেন যে, খামেনির দিন এবং তার শাসন ব্যবস্থার দিন হয়তো ফুরিয়ে আসছে।
নিহত আলী খামেনির দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী সন্তান মোজতবা খামেনি তার বাবার অতি রক্ষণশীল আদর্শে গড়া। গত কয়েক দশক ধরে মোজতবা তার বাবার ছায়ায় থেকে কাজ করেছেন।

ছবির উৎস, EPA/Shutterstock
ছবির ক্যাপশান,
৮৮ জন মুসলিম শিয়া আলেমের সমন্বয়ে গঠিত 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস' মোজতবাকে বাছাই করার পরপরই বিপ্লবের কট্টর সমর্থকরা ইরানের রাজপথে নেমে আসেন
দেশের বাইরের হুমকি এবং দেশের ভেতরে গণঅভ্যুত্থান হলে ডিপ স্টেট কীভাবে কাজ করে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানেন মোজতবা।
ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কোরের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে, কেননা কিশোর বয়সেই এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
হাইস্কুলের পাঠ শেষ করে কোমে পড়াশোনা করতে যান, যে শহরটি শিয়া ইসলামিক অধ্যয়নের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
১৯৭৯ সালের বিপ্লব রক্ষার জন্য গঠিত এই বাহিনী এখন কেবল সামরিক শক্তি নয় বরং দেশটির বিশাল এক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যও নিয়ন্ত্রণ করছে। দেশটির সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এখন এই বাহিনীর কমান্ডাররাই।
মোজতবা ছিলেন তাদের নিজস্ব প্রার্থী। এই যুদ্ধ এখন আর শুধু রাজনৈতিক যুদ্ধ নয়, বরং এখন ব্যক্তিগত প্রতিশোধের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি হামলায় মোজতবা খামেনি শুধু তার বাবাকেই হারাননি, বরং তার মা মানসুরে খোজাস্তে বাঘেরজাদে এবং স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং নিজের এক সন্তানকেও হারিয়েছেন।
তিনি নিজেও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে, কিন্তু বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ওই ঘটনার পর থেকে এমনকি তার কোনো চিহ্নও প্রকাশ্যে আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, তিনি তার আদেশ অমান্যকারীদের মোটেও ভালোভাবে নিচ্ছেন না।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উত্তরাধিকারী নিয়ে জল্পনা শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প একাধিকবার বলেছিলেন, আলী খামেনির এই কট্টরপন্থি ছেলেকে নেতা হিসেবে মেনে নেওয়া 'অগ্রহণযোগ্য'।
তিনি এখনো সতর্ক করছেন যে, মোজতবা খামেনি "বেশিদিন টিকবে না"।
ইসরায়েলের নজরেও রয়েছেন তিনি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ তাকে একজন "সুস্পষ্ট লক্ষ্যবস্তু" হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
তাই খামেনি হয়তো আরও কিছুদিন আড়ালেই থাকবেন। এই অন্তরাল তাকে ঘিরে রহস্য আরও গভীর করবে।
তিনি খুব কমই জনসমক্ষে উপস্থিত হয়েছেন, তার প্রকাশ্যে কোনো বক্তৃতার রেকর্ড নাই এবং তিনি কখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি চাকরিও করেননি।
বাবার প্রতিকৃতির পাশে কখনো তার ছবিও দেখা যায়নি।
প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বেঁচে থাকতে নিজের ছেলেকে উত্তরাধিকারী করার বিরোধী ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের বংশপরম্পরা হটিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেটি যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
বেশিরভাগ ইরানিরা এর আগে কখনো তার কণ্ঠস্বর শোনেননি। তবে তার মতামতের কিছু লক্ষণ দেখা গেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
২০১৯ সালে তেহরানে এক অনুষ্ঠানে মোজতবা খামেনিকে দেখা যায়
বর্তমানে একটি বিশেষ সময়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেই সময়টি হলো ২০০৫ সালের নির্বাচনে রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মাহমুদ আহমাদিনেজাদের জয়।
সেসময় তার সংস্কারপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বীরা অভিযোগ তুলেছিলেন, আহমাদিনেজাদের জয় নিশ্চিত করতে খামেনির ছেলে আড়ালে থেকে ষড়যন্ত্র করেছেন।
২০০৯ সালে অআহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনঃনির্বাচন ইরানে এক অভূতপূর্ব বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল যেটি আজ 'গ্রিন রেভুলিউশন বা সবুজ বিপ্লব' নামে চিহ্নিত।
প্রধান সংস্কারপন্থি রাজনীতিবিদদের সেসময় গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের লড়াইয়ে হাসান খোমেনি ছিলেন সবচেয়ে আলোচিত নাম। তিনি ইরানের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি, সংস্কারপন্থিদের দলে ছিলেন তিনি।
তবে মোজতবা খামেনির এই উত্থান ইঙ্গিত দেয় যে দেশটির সংস্কারপন্থি, ইরানের বিভক্ত রাজনৈতিক পরিসরে যারা তুলনামূলক মধ্যপন্থি গোষ্ঠী, যাদের মধ্যে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও রয়েছেন, তারা এখন আরও বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
রাজনৈতিকভাবে মোজতবা খামেনি এমন দুজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ, যারা ইরানের রেভুলিউশনারি গার্ডের সাথে যুক্ত এবং তারা দেশটির নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
এদের মধ্যে একজন প্রসিদ্ধ রাজনীতিবিদ আলী লারিজানি, যিনি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান।
আরেকজন মোহাম্মদ বাকের কালিবফ, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার।
সাম্প্রতিক মাসগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনায় নিহত আয়াতুল্লাহর বন্ধু এবং মিত্রদের আরো বড় দায়িত্ব গ্রহণের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল।
এর মধ্যে কাতারের মধ্যস্ততায় ট্রাম্পের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা এবং তাদের সবচেয়ে বড় শত্রুর সামরিক ও গোয়েন্দা শক্তির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টি ছিল।
একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা লারিজানিকে বাস্তববাদী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
গত মাসে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি নিশ্চিত করার জন্য বাতিল হওয়া আলোচনার সময় ওই কর্মকর্তা লারিজানির সাথে দেখা করেছিলেন।
এই মুহূর্তে কট্টরপন্থিরা, যারা নিজেদেরকে শাসনব্যবস্থার প্রতিরক্ষায় প্রিন্সিপালিস্ট বা নীতিবাদী হিসেবে দাবি করেন তারা এখন শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন।
তবে যে কোনোসময় পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে।
খামেনির ঘনিষ্ঠ একজন রাজনীতিবিদ, আবদোল রেজা দাওয়ারি, বিভিন্ন প্রকাশ্য বক্তব্যে এবং নিউইয়র্ক টাইমসের সাথে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তাকে "অত্যন্ত প্রগতিশীল" এবং "কট্টরপন্থিদের কোণঠাসা করে ফেলতে পারেন" এমন ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি তাকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ইরানি সংস্করণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। যিনি কি না ক্ষমতার ওপর শক্ত দখল বজায় রেখেই উল্লেখযোগ্যভাবে সামাজিক স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।
বর্তমানে ইরানে এ ধরনের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ তো দেখাই যাচ্ছে না, বরং দেশটি এখন এক ভয়াবহ অনিশ্চিত সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এক বিধ্বংসী যুদ্ধের জাঁতাকলে এখন বন্দি ইরান যাতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে দেশটির সম্পর্ককে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ধাক্কাও অস্থিরতা তৈরি করেছে।
মোজতবা খামেনির ক্ষমতা গ্রহণকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই করা শক্তিগুলো তাকে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সেরা সুযোগ হিসেবে দেখছে।