চাঁদাবাজি এখন আর কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয় বরং এটি একটি সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। বাজার, পরিবহন, টার্মিনাল, নির্মাণখাত, শিল্প এলাকা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো নামে চাঁদাবাজি চলছে। কোথাও এটি “সালামি”, কোথাও “সমিতির চাঁদা”, আবার কোথাও “ম্যানেজমেন্ট খরচ” নামে আদায় করা হয়। কিন্তু নাম যাই হোক, বাস্তবতা একটাই—এটি অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এবং জনমনে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে।

কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায় যে শুধু প্রশাসনিক অভিযান চালিয়ে কি চাঁদাবাজির মতো গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব?

কার্যত এটি অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও বটে। একজন ক্ষুদ্র দোকানদারকে যদি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়, সেই টাকা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর চাপানো হয়। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি হলে ভাড়া বাড়ে। উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজি মানে কাজের মান কমে যাওয়া এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়া। ফলে চাঁদাবাজি সরাসরি মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই চাঁদাবাজির বড় অংশই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে সংঘটিত হয়। স্থানীয় পর্যায়ের কর্মী থেকে শুরু করে প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয়—এই অদৃশ্য সুরক্ষাবলয়ই চাঁদাবাজিকে দিয়েছে ভয়ংকর শক্তি।

প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনীতিবিদরা কেন চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সবসময় দৃঢ় অবস্থান নেন না?
এর পেছনে কয়েকটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা রয়েছে।

প্রথমত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়। দলীয় ও নির্বাচনী প্রচারণা, সভা-সমাবেশ, পোস্টার-ব্যানার, সংগঠন পরিচালনা—সবকিছুর জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এই অর্থের একটি অংশ আসে অনানুষ্ঠানিক ও অস্বচ্ছ উৎস থেকে। ফলে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া অনেক সময় রাজনৈতিক তহবিলের ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব ধরে রাখতে অনেক রাজনৈতিক দল এমন ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করে, যাদের ক্ষমতার ভিত্তি গড়ে উঠেছে দখল, ভয়ভীতি কিংবা চাঁদাবাজির মাধ্যমে। এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

তৃতীয়ত, আমাদের রাজনীতিতে এখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান ‘আমার লোক’ সংস্কৃতি। আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ অনেক সময় দেখা যায় না। কোনো অপরাধী যদি “আমাদের লোক” হিসেবে পরিচিত হয়, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখা যায়। এই মানসিকতাই চাঁদাবাজদের সবচেয়ে বড় ঢাল।

ফলে বাস্তবে দেখা যায়—রাজনীতিবিদরা প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেও মাঠপর্যায়ে অনেক সময় নীরব সমর্থন বা প্রশ্রয় অব্যাহত থাকে।
এর সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। একজন ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে বাধ্য হলে তার পণ্যের দাম বাড়ে। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বাড়লে যাত্রীদের ভাড়া বাড়ে। উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজি হলে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় হয়। অর্থাৎ চাঁদাবাজি কেবল অপরাধ নয়—এটি একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক সময় দেখা যায়, পুরোনো চাঁদাবাজরা সাময়িকভাবে আড়ালে চলে যায়। কিন্তু কিছুদিন পরই তারা নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে আবার ফিরে আসে। ফলে পতাকা বদলায়, কিন্তু চাঁদাবাজির সংস্কৃতি বদলায় না।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে একটি কঠিন সত্য স্বীকার করতেই হবে যে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে চাঁদাবাজি অনেক ক্ষেত্রে একটি অঘোষিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

এমন বাস্তবতায় দ্যর্থহীন ভাষায় বলা যায় যে,যতদিন এ দেশে ভোগবাদী ও তোষামোদনির্ভর প্রচলিত রাজনীতির ধারা অব্যাহত থাকবে, ততদিন সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ক্রমাগত কঠিন থেকে কঠিনতর হতে থাকবে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জীবন হয়ে উঠবে আরও সহজ, নিরাপদ এবং বিলাসী।

অর্থাৎ রাজনীতির বর্তমান কাঠামোতে একটি বিপরীতমুখী বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—জনগণের কষ্ট বাড়ে, আর ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষের সুবিধা বাড়ে।

সুতরাং,রাজনৈতিক ঐক্য এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি কল্যাণমুখী ও নৈতিক নীতিমালা ছাড়া চাঁদাবাজি নির্মূল করা কখনোই সম্ভব নয়।
বিষয়টি সহজ একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়। ধরা যাক, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো একটি যদি সত্যিকার অর্থে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়—অর্থাৎ কোনো চাঁদাবাজকে দলে অন্তর্ভুক্ত না করে, কোনো দখলবাজকে প্রশ্রয় না দেয় এবং চাঁদাবাজির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার না করে—তাহলে বাস্তবে কী ঘটবে?

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যাবে, সেই দলের সাংগঠনিক শক্তি দ্রুত কমে যেতে শুরু করবে। কারণ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বহু ক্ষেত্রে অর্থ, প্রভাব এবং ভয়ভীতি সংগঠনের শক্তির একটি বড় উপাদান হয়ে উঠেছে। নির্বাচনী রাজনীতি পরিচালনা, কর্মী ব্যবস্থাপনা, প্রভাব বিস্তার—এসব ক্ষেত্রে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়, যার একটি বড় অংশ আসে অস্বচ্ছ উৎস থেকে।

ফলে যে দল চাঁদাবাজি বা দখলবাজিকে প্রশ্রয় দেবে, তাদের হাতে থাকবে বিপুল অর্থ এবং প্রভাব। আর যে দল নৈতিক অবস্থান নেবে, তাদের জন্য রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এমনকি ক্ষমতায় যাওয়া বা সরকার গঠন করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে যে দল চাঁদাবাজি ও দখলবাজিকে প্রশ্রয় দেবে, তাদের সাংগঠনিক শক্তি দ্রুত বাড়বে। কারণ চাঁদাবাজি থেকে প্রতিদিন যে বিপুল অর্থ প্রবাহিত হয়, সেটি রাজনৈতিক শক্তির এক বড় উৎসে পরিণত হয়।

বিভিন্ন অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ থেকে ধারণা করা যায় যে সারা দেশে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়। বছরে যার পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা।

এই বিপুল নগদ অর্থের শক্তি এবং এর সঙ্গে যুক্ত ক্ষমতার মোহ থেকে সমাজকে মুক্ত করা কোনো একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা, যার সমাধানও কাঠামোগতভাবেই করতে হবে।

এই বাস্তবতায় শুধুমাত্র পুলিশ, র‍্যাব বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযান চালিয়ে চাঁদাবাজি নির্মূল করা সম্ভব নয়। অভিযান হয়তো সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু সমস্যার মূল শিকড়ে আঘাত করতে পারে না।

চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ের জন্য কয়েকটি বিষয় জরুরি বলে আমি মনে করি—
১. রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
২. দলীয়ভাবে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করতে হবে।
৩. অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত করতে হবে।
৫. গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
৬. চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।
৭. চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতে হবে।
৮. চাঁদাবাজদের আজীবনের জন্য রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করতে হবে।
৯. বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল চাঁদাবাজদের সদস্য করতে পারবে না।

যখন দেশের সব রাজনৈতিক দল একটি জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছাবে—যে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক-সন্ত্রাস এবং দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হবে না।

অর্থাৎ প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে তাদের দলীয় নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে চাঁদাবাজ, দখলবাজ ও দুর্নীতিবাজদের জন্য তাদের দলে কোনো স্থান নেই।

আরেকটি কঠিন বাস্তবতাও এখানে উল্লেখ করা জরুরি। অনেক সময় কিছু রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে এমন মন্তব্য করেন—“চাঁদাবাজি করে যদি দুইশোর বেশি সংসদীয় আসন পাওয়া যায়, তাহলে চাঁদাবাজিতে সমস্যা কোথায়?”
এই ধরনের বক্তব্য শুধু একটি ব্যক্তিগত মন্তব্য নয়; বরং এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকটের প্রতিফলন। যখন চাঁদাবাজিকে রাজনৈতিক শক্তি অর্জনের কার্যকর উপায় হিসেবে দেখা হয়, তখন বোঝা যায় এই ব্যাধির শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত।

এই বাস্তবতার বিপরীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ আমরা দেখতে পাই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মধ্যে।
তিনি একবার বলেছিলেন—
“I will make politics difficult for the politicians.”
অর্থাৎ, “আমি রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে তুলব।”

এই কথার গভীর তাৎপর্য আছে। তিনি আসলে ভোগবাদী রাজনীতির অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে রাজনীতি হবে নীতি, জ্ঞান এবং দেশপ্রেমের ওপর ভিত্তি করে।

এই দর্শনের আলোকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—যদি সত্যিকার অর্থে প্রচলিত ভোগবাদী রাজনীতির ধারা ভেঙে ফেলা যায় এবং এই দর্শন বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ও ভবিষ্যৎ একটি ইতিবাচক ধারায় বদলে যেতে বাধ্য। তখন মানুষের জীবন হবে সহজ, নিরাপদ ও স্বনির্ভর।

পক্ষান্তরে, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক কর্মীদের জীবন হয়ে উঠবে কঠিন ও কষ্টকর। কারণ তখন আর অবৈধ অর্থ, প্রভাব বা তোষামোদ দিয়ে টিকে থাকা সম্ভব হবে না।
তবে এই কষ্টই তাদেরকে সমাজে প্রকৃত মর্যাদা এনে দেবে। মানুষ তাদের দেখবে শ্রদ্ধার চোখে, ভালোবাসার চোখে। তারা হয়ে উঠবেন দেশের গর্বিত সন্তান—যারা ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের জন্য রাজনীতি করেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক নেতা এসেছেন। কিন্তু সততা, দেশপ্রেম এবং বাস্তববাদী নেতৃত্বের যে সমন্বয় জিয়াউর রহমানের মধ্যে দেখা গেছে, তা বিরল। তার দেশপ্রেম ছিল নিষ্পাপ শিশুর মতো নির্মল এবং সদ্য প্রস্ফুটিত ফুলের মতো পবিত্র।

তিনি এমন এক রাজনীতির সূচনা করতে চেয়েছিলেন, যেখানে তোষামোদ, ভোগবাদ এবং অবৈধ অর্থের কোনো স্থান থাকবে না।
আজকের বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা—এই সবকিছুই অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।

এই অবৈধ অর্থের জোরে অনেক নেতা রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে যান। বিদেশে অর্থ পাচার করেন, সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনা করান, বিলাসবহুল বাড়ি ও গাড়ির মালিক হন।
ফলে অনেকের কাছে রাজনীতি আর জনসেবার পথ নয়; বরং এটি একটি বিনা পুঁজির লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

এমন বাস্তবতাও দেখা যায় যে একজন ব্যবসায়ী হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও যে অবস্থানে পৌঁছাতে পারেন না, একজন ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিবিদ অনেক সময় রাতারাতি সেই অবস্থান অতিক্রম করে ফেলেন।

অবৈধ অর্থের এই প্রবাহ শুধু বড় আকারের দুর্নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দৈনন্দিন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেও প্রবেশ করেছে।

অনেক সময় দেখা যায়, অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ইমেজের নেতাদের বাসায়ও নানা ধরনের উপঢৌকন পাঠানো হয়—বাজারের সেরা ফল, তাজা মাছ, বস্তা বস্তা মিহি চাল। এগুলো একটি তোষামোদনির্ভর সংস্কৃতির অংশ, যা রাজনীতিকে নৈতিকতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

ক্ষমতাসীন নেতারা এতো পরিমান উপঢৌকন পান যে, তাদের বাজার থেকে কিছু কিনতে হয় না। বরং উপঢৌকনের কিছু অংশ কাছের মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে মহান দাতার খ্যাতি লাভ করেন।

বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের রাজনীতির অন্দরমহলে এক ধরনের বিকৃত মূল্যায়ন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে যোগ্যতা, সততা বা আদর্শের চেয়ে বেশি মূল্য পায় তোষামোদ, উপঢৌকন এবং অবৈধ অর্থের প্রবাহ।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়—যে কর্মী নেতার বাসায় নিয়মিত বাজারের সেরা ফলের ডালা পৌঁছে দিতে পারে, ঘাটের তাজা মাছ সরবরাহ করতে পারে, কিংবা বাগানের বাছাই করা ফল উপঢৌকন হিসেবে পাঠাতে পারে, সেই কর্মীই হয়ে ওঠে “বিশ্বস্ত” এবং “কাজের লোক”। তার প্রমোশন হয় দ্রুত, তার প্রভাব বাড়ে, এবং ধীরে ধীরে সে ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি চলে যায়।

পক্ষান্তরে, যে কর্মী চাঁদাবাজি করে না, অবৈধ অর্থের সঙ্গে জড়িত নয় এবং তোষামোদ করতে পারে না—তার ভাগ্যে জোটে অবমূল্যায়ন। সে যতই নীতি-নৈতিকতা, জ্ঞান বা আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করুক না কেন, বাস্তবে সে পিছিয়ে পড়ে। তার কোনো প্রমোশন হয় না, তার প্রতি নেতৃত্বের আগ্রহ তৈরি হয় না।

এই বৈপরীত্যই আজকের রাজনীতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক।
কারণ এখানে একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে—
সৎ হওয়া নয়, “উপযোগী” হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
আর এই “উপযোগিতা” নির্ধারিত হচ্ছে কে কতটা অবৈধ অর্থ জোগাড় করতে পারে এবং সেই অর্থ দিয়ে কতটা তোষামোদ করতে পারে—তার ওপর।
যে কর্মী চাঁদাবাজির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উপার্জন করে এবং সেই অর্থ দিয়ে শীর্ষ নেতাদের দামি উপহার পাঠাতে পারে, বিভিন্ন উপলক্ষে উপঢৌকন দিতে পারে—সে দ্রুত নেতার প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠে। তার পদোন্নতি হয়, তার ক্ষমতা বাড়ে, এবং সেই সঙ্গে আরও বেশি অবৈধ অর্থ আয়ের পথ খুলে যায়।

অর্থাৎ একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়—
অবৈধ অর্থ → তোষামোদ → পদোন্নতি → আরও ক্ষমতা → আরও অবৈধ অর্থ।
এই চক্রের বাইরে যারা থাকে—যারা সৎ, চিন্তাশীল, নৈতিকতাবান—তারা ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে।

ফলে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন সৎ, ভালো, সৃজনশীল এবং বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের পক্ষে রাজনীতিতে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা। কারণ যখন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভালো মানুষ টিকে থাকতে পারে না, তখন সেই ব্যবস্থার ভেতর থেকেই অবক্ষয় জন্ম নেয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই বাস্তবতা রাজনৈতিক বক্তৃতা বা বিবৃতিতে প্রতিফলিত হয় না। বাইরে জনকল্যাণ, নীতি, আদর্শের কথা বলা হলেও, ভেতরের চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ বিপরীত।

এই দ্বৈততা রাজনীতিকে শুধু অবিশ্বাসযোগ্যই করে তোলে না; বরং এটি জনগণের মধ্যে গভীর হতাশা সৃষ্টি করে।
কারণ সাধারণ মানুষ যখন দেখে—যে ব্যক্তি অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করছে, তোষামোদ করছে, সে-ই পুরস্কৃত হচ্ছে; আর যে ব্যক্তি সৎ, সে অবহেলিত—তখন তারা রাজনীতির প্রতি আস্থা হারায়।
অতএব স্পষ্টভাবে বলা যায়—রাজনীতির এই অবক্ষয় থেকে মুক্তি না পেলে এ দেশের মানুষের প্রকৃত মুক্তি কখনোই সম্ভব নয়।

কারণ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার—সবকিছুর ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে রাজনীতির ওপর। আর সেই রাজনীতিই যদি ভোগবাদ, তোষামোদ এবং অবৈধ অর্থের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে উন্নয়নের সব বক্তব্যই শেষ পর্যন্ত ফাঁপা হয়ে যায়।
এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি—এবং সেই পরিবর্তন আসতে হবে ভেতর থেকে, মূল্যবোধের পরিবর্তনের মাধ্যমে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল সংস্কারের মাধ্যমে।

এই প্রেক্ষাপটে আবারও মনে পড়ে জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক বক্তব্য। কারণ যদি চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, দখলবাজি এবং অবৈধ অর্থের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি সহজ থাকবে না—বরং কঠিন হয়ে উঠবে।
আর সেই কঠিনতাই হবে একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা।

ইতিহাসের পথপরিক্রমায় আজ সেই জিয়াউর রহমানেরই সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান দেশের রাজনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।

তার ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক 'রেইনবো নেশন' রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে। যদি তিনি তার পিতার সেই নীতিকে অনুসরণ করে সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই একটি নতুন পথে এগিয়ে যেতে পারবে। স্বাধীনতার প্রকৃত সুখ অনুভব করবে সাধারণ মানুষ।

কারণ চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে লড়াই কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি রাজনৈতিক নৈতিকতার লড়াই। অতএব স্পষ্টভাবে বলা যায়—রাজনৈতিক ঐক্য, নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং ভোগবাদী রাজনীতির অবসান ছাড়া বাংলাদেশ থেকে চাঁদাবাজি নির্মূল করা কখনোই সম্ভব নয়।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,
ঢাকা।
ইমেইল: [email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews