গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে। ভারতের আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত হয়ে এখন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে চলছে। সমমর্যাদা এবং সমস্বার্থভিত্তিক সম্পর্কের নীতি জোরদার হওয়া শুরু করেছে, যেটা হাসিনার শাসনামলে এককেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম স্পষ্ট করেই বলেছেন, বাংলাদেশ কী পাবে, তার ওপর ঠিক হবে, প্রত্যেক দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। তার এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, যেকোনো দেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ সবার আগে দেখা হবে। এটাই পররাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিৎ। তবে আমাদের উচিৎ হবে, যে দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং বিশ্বজুড়ে বিপুল বিনিয়োগ, উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, তাদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করা। এক্ষেত্রে, বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি চীন বাংলাদেশের অন্যতম ডেস্টিনেশন হতে পারে। দেশটি বিপুল বিনিয়োগ ও বাণিজ্য নিয়ে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা করছে। আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশ চীনের অর্থনৈতিক সহায়তা ও বিনিয়োগ নিয়ে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ চীনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে চলছে। এমনকি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে অনেক উন্নত দেশকেও চীনের কাছে ধর্ণা দিতে দেখা যায়। অর্থাৎ চীন যুদ্ধবিগ্রহ বা হুমকিÑধমকি নয়, পারস্পরিক উন্নয়ন ও সহযোগিতার মাধ্যমে শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট ও মিত্রচক্র গড়ে তুলছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার কোনো কারণ নেই।
দুই.
অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের যে হাতছানি, তাতে যারা দ্রুত সাড়া দিচ্ছে, তারা তত লাভবান হচ্ছে এবং উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার যেসব দেশের কথা উল্লেখ করেছি, তারা চীনের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। ক্ষয়ীষ্ণু ভারতের দাদাগিরিকে থোড়াইকেয়ার করে তারা চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতির সাথে যুক্ত হয়েছে। এর মানে এই নয়, তারা চীনের পেটের মধ্যে ঢুকে গেছে, কিংবা তার করদরাজ্যে পরিণত হয়েছে। মালয়েশিয়ার উন্নয়নের রূপকার ড. মাহাথির মোহাম্মদের মতো কিংবদন্তি বলেছেন, চীন কখনো অন্যদেশকে উপনিবেশ বা কলোনিতে পরিণত করে না। প্রয়োজনে দেশটি আক্রমণাত্মক হতে পারে, তবে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর মতো অন্যদেশের ওপর শাসন প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তার নেই। তার অর্থ হচ্ছে, চীন আধিপত্যবাদী নীতি নয়, বরং প্রত্যেক দেশের সাথে পারস্পরিক মর্যাদা এবং স্বার্থভিত্তিক সম্পর্কের নীতি নিয়ে চলে। এ নীতির প্রতিফলন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে চীনের ঘনিষ্ট সম্পর্ক থেকে বোঝা যায়। বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়াকে কীভাবে একটি বহত্তর ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করা যায়, চীনের এই নীতি থেকে তার অভাস পাওয়া যায়। বলা যায়, আনুষ্ঠানিক কোনো জোট না হয়েও চীনকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। একটি অর্থনৈতিক রেস শুরু হয়েছে। এই রেস থেকে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার কোনো কারণ নেই। অন্যদিকে, ভারত বৃহৎ প্রতিবেশি হলেও বাংলাদেশের তাতে কোনো উপকার নেই। কারণ, ভারত নিজেই একটি গরিব দেশ। ঠিকমতো চলতে পারে না, কেবল হম্বিতম্বি ছাড়া তার আর কিছু করার নেই। বিশালদেহ নিয়ে নখদন্তহীন বাঘে পরিণত হয়েছে। বিষয়টি অন্যান্য প্রতিবেশি বুঝতে পেরে নিজের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে চীনের সাথে শামিল হয়েছে। ভারত কি বলল, না বলল, সেদিকে তাকানোর সময় তাদের নেই। ভারতের দাসী হাসিনামুক্ত বাংলাদেশেরও এখন তার দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। কারণ, অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন নিজ থেকেই বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার হতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবক্ষেত্রে তার বিনিয়োগ ও সহযোগিতা করার কথা বলেছে। গত মাসে (২২-২৫ জুন) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও বড় বড় বিনিয়োগকারিদের সাথে বৈঠক থেকে তার আভাস পাওয়া গেছে। বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে চীন আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে। এটা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভূরাজনৈতিক কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত থাকতে এর চেয়ে ভালো পলিসি আর কিছু হতে পারে না।
তিন.
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একটি তিস্তা প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ। অন্যটি, চীনের কুনমিং থেকে মায়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর করার প্রস্তাব। চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় এবং সেখান থেকে এই করিডোরের একটি অংশ মায়ানমারের ইয়াঙ্গুন ও অন্য অংশ রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত যাবে। রাখাইন থেকে সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হবে। অর্থনৈতিক এই করিডোরের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বৈঠকের সময় স্বয়ং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং দিয়েছেন। এ প্রস্তাব বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা ইতোমধ্যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অবশ্য এই অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের করিডোর প্রস্তাব নতুন নয়। ২০১৩ সালে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে’র (বিআরঅই) অধীনে বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মায়ানমারের মধ্যে, যেটি বিসিআইএম নামে পরিচিত, এ প্রস্তাব চীন দিয়েছিল। ভারতের আপত্তির কারণে এই করিডোর হয়নি। পরবর্তীতে চীন ভারতকে বাদ দিয়ে চীন, মায়ানমারের সাথে অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির পরিকল্পনা করে এবং এই করিডোরে বাংলাদেশকে যুক্ত করার বিষয়টি আসে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় সেই প্রস্তাবই দিয়েছে চীন। তবে এই অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নে ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এক্ষেত্রে, মায়ানমারে জান্তা সরকারের নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির সংঘাত ও বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন রাখাইনের বড় অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সমস্যা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীন উদ্যোগ নিলে এগুলো কোনো সমস্যাই হবে না। চীন যদি কার্যকর উদ্যোগ নেয় এবং বাংলাদেশ ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাহলে অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়ন সম্ভব। বাংলাদেশের জন্য এই করিডোরের গুরুত্ব অপরিসীম। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারবে, অন্যদিকে যুক্ত হতে পারবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের জোট আসিয়ানের সঙ্গে। ফলে এই অর্থনৈতিক করিডোর বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে। বিপুল বিনিয়োগ আসবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় চীনের বিনিয়োগ বেড়ে যাবে। চীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে। পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয়, দুটোই উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। করিডোর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরো বাধা আসতে পারে। এলে বাংলাদেশকে সমুচিত কূটনৈতিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, চীন যদি উদ্যোগী হয়, তাহলে ভূরাজনীতির এই সমীকরণ মেলানো কঠিন কাজ হবে না। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ভারতের চ্যানেল এনডিটিভিকে বলেছেন, অর্থনৈতিক এই করিডোর একটি মুক্ত প্রকল্প। এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, পর¯পরের সঙ্গে সংযোগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা করা। যেকোনো দেশ চাইলেই এখানে যোগ দিতে পারবে। ফলে চীনের এই ভারসাম্যমূলক ও কৌশলী বক্তব্য নিয়ে ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বলার থাকছে না। অন্যদিকে, ভারত নিজেই এখন চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে নানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একদিকে তার অর্থনৈতিক দুর্দদশা, অন্যদিকে ভারতের অরুণাচল ও লাদাখ নিয়ে চীন যেভাবে খেলছে, তাতে তার অখণ্ডতা রক্ষায় চীনের সাথে পাল্লা দিতে যাবে বলে মনে হয় না।
চার.
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি শাসনামলে দেশ যেভাবে দেউলিয়া হয়েছে, তা থেকে দ্রুত উদ্ধারে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ শুরু করা ছাড়া বিকল্প নেই। অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও গণঅভ্যুত্থান হয়েছে এবং নতুন সরকার ক্ষমতায়। তবে তাদের অর্থনীতি এত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে যে, তা অনেকের কাছে বিস্ময়কর ঠেকছে। তাদের এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে রয়েছে, চীনের সাথে তাদের আর্থিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে করাতে হলে, চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা ছাড়া বিকল্প নেই। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, দেশের অবিসংবাদিত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন ২০০১-২০০৬ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি ভারতের ওপর অতিরিক্ত বাণিজ্যনির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে বহুমুখীকরণের জন্য ২০০২ সালে ‘লুক ইস্ট’ নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এই নীতির মাধ্যমে তিনি পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর এই নীতি ছিল, ভারতের সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্ত হয়ে দেশের অর্থনীতিকে সম্প্রসারিত করে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি দূরদর্শী চিন্তা। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ফ্যাসিস্ট হাসিনা ক্ষমতায় এসে ভারতের ক্রীতদাসে পরিণত হয়ে এই নীতি উপেক্ষা করে গেছে। সে বাংলাদেশকে ভারতের এঁকে দেয়া বৃত্তের বাইরে নিয়ে যেতে পারেননি। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে এখন বিএনপি ক্ষমতায়। ফলে বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার সেই ‘লুক ইস্ট’ নীতি অবলম্বন করে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে শক্তিশালী অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন গড়ে তুলতে পারে। এটা বাস্তবায়ন সম্ভব চীনের দেয়া ‘অর্থনৈতিক করিডোরে’র প্রস্তাবের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব দেশগুলোর সাথে যুক্ত হবে না, এর বিস্তৃতি সুদূর ইউরোপ পর্যন্ত হতে পারে। মায়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া হয়ে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে ইউরোপ পর্যন্ত চলে যাওয়া সম্ভব হবে। বিষয়টি যদি কল্পনায় ভিজ্যুয়ালাইজ করা হয়, তাহলে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এটি হবে বাংলাদেশের গোল্ডেন গেইট বা স্বর্ণদুয়ার। অথচ এটা বাস্তবায়ন করা খুবই সম্ভব। বিশেষ করে যেখানে, চীন এই করিডোর এবং কানেক্টিভিটির প্রস্তাব দিয়েছে, সেখানে এটা বাস্তবায়ন সময়ের ব্যাপার মাত্র। সরকারের উচিৎ হবে, কোনো ধরনের কনফিউশনে না থেকে চীনের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নে কাজ দ্রুত শুরু করা।