উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়শই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে অবকাঠামোগত বা প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে। অথচ একটি বিশ্ববিদ্যালয় মূলত একটি জটিল জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবেশ, যেখানে জ্ঞান সৃষ্টি, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ, উদ্ভাবন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এই বহুমাত্রিক ব্যবস্থার কার্যকর পরিচালনা কেবল নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসনের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন নেতৃত্ব, যা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থবিরতা থেকে গতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ভাইস-চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, এবং ট্রেজারার এর ভূমিকা নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
সম্প্রতি আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে একপাক্ষিক আলোচনা দেখা যায়, সেখানে একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, নেতৃত্বের প্রশ্নটিকে ব্যক্তিগত একাডেমিক সাফল্যের সঙ্গে সরলীকৃতভাবে যুক্ত করা। বিশেষ করে গবেষণা প্রকাশনা, ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বা সাইটেশন সংখ্যাকে কেন্দ্র করে নেতৃত্বের যোগ্যতা নির্ধারণের প্রবণতা ক্রমশ জোরদার হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা গবেষণায় এ বিষয়ে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। Burton R. Clark (1998) তাঁর *Creating Entrepreneurial Universities* গ্রন্থে দেখিয়েছেন, একটি সফল বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে তার প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোজনক্ষমতা এবং নেতৃত্বের কৌশলগত দূরদৃষ্টি, ব্যক্তিগত গবেষণা-অর্জন নয়। একইভাবে, OECD (2019) উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রধান দায়িত্ব হলো “Enabling environment” তৈরি করা, যেখানে জ্ঞান উৎপাদন ও উদ্ভাবন বিকশিত হতে পারে।
এই বাস্তবতায় ভাইস-চ্যান্সেলরের দায়িত্বকে কেবল একাডেমিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। বরং তাঁকে একইসঙ্গে একজন নীতিনির্ধারক, সংগঠক, কৌশলবিদ এবং পরিবর্তন-নেতা হিসেবে কাজ করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং একাডেমিক স্বাধীনতা রক্ষা ইত্যাদি তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের নেতৃত্ব গবেষণার সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে রূপান্তরিত করা হয়েছে, তার মাধ্যমে মূল্যায়িত হয়।
উদাহরণস্বরূপ, সিঙ্গাপুরের National University of Singapore (NUS) বা হংকংয়ের University of Hong Kong-এর অগ্রগতির পেছনে যে নেতৃত্ব কাজ করেছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল ও বৈশ্বিক সংযোগ বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সেখানে ভাইস-চ্যান্সেলররা ব্যক্তিগত গবেষণার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষণা তহবিল সংগ্রহ, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা এবং শিল্প-অ্যাকাডেমিয়া সংযোগ তৈরিতে। ফলে বোঝা যায়, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতার ওপরই অধিক নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এই প্রশ্নটি আরও প্রাসঙ্গিক। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও মানসম্মত গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়ে গেছে। University Grants Commission (UGC)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, গবেষণা তহবিলের সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সমন্বয়ের অভাব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে। এই প্রেক্ষাপটে একজন ভাইস-চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, এবং ট্রেজারার এর ভূমিকা হয়ে ওঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনিই বা তারাই এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে সম্ভাবনার পথ তৈরি করতে পারেন।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নেতৃত্বের নৈতিকতা ও নিরপেক্ষতা। বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহাসিকভাবে মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। তাই এর নেতৃত্ব যদি সংকীর্ণ দলীয় বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়, তবে তা পুরো একাডেমিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। Philip G. Altbach (2011) উচ্চশিক্ষা প্রশাসন নিয়ে তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন, “Institutional autonomy and leadership integrity are central to academic excellence।” অর্থাৎ, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ভর করে তার নেতৃত্ব কতটা স্বাধীন, নৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে অটল থাকতে পারে তার ওপর। এছাড়া, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় “Shared governance” বা অংশীদারিত্বমূলক নেতৃত্বের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ, ভাইস-চ্যান্সেলর এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নন; বরং শিক্ষক, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল এবং অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন সংলাপের দক্ষতা, সহনশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাব, যা কেবল একাডেমিক অর্জনের মাধ্যমে অর্জিত হয় না।
অতএব, ভাইস-চ্যান্সেল, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, এবং ট্রেজারার নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও পরিপক্ব ও বাস্তবভিত্তিক করতে হবে। শুধুমাত্র গবেষণা-সূচক বা ব্যক্তিগত একাডেমিক পরিচয় নয়, বরং নেতৃত্বের সামগ্রিক সক্ষমতা, যেমন কৌশলগত পরিকল্পনা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, রাজনেতিক প্রজ্ঞা, সংকট ব্যবস্থাপনা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি, এসবকেই প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে তার নেতৃত্বের ওপর। একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভাইস-চ্যান্সেল বা প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, এবং ট্রেজারার এর সমন্বয়ে তার টীম একটি প্রতিষ্ঠানকে কেবল পরিচালনা করেন না; তিনি সেটিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেন। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা যদি সত্যিকার অর্থে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত হতে চায়, তবে নেতৃত্বের এই প্রশ্নটিকে আমরা আর সরলীকৃতভাবে দেখার সুযোগ নেই। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রত্যাশা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব এমন হাতে ন্যস্ত হোক, যারা জ্ঞান, ন্যায় ও দূরদৃষ্টির সমন্বয়ে একটি প্রগতিশীল, উদ্ভাবনমুখী এবং আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন।
আমরা প্রত্যাশা করি, সাম্প্রতিক সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করবেন, যা একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে সংরক্ষণ করবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের নীতি ও অগ্রাধিকারসমূহের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করতে পারবেন, যেখানে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা বাস্তব উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এই সমন্বিত নেতৃত্ব যদি নৈতিক দৃঢ়তা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং নীতিনির্ভর সিদ্ধান্তগ্রহণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কার্যকর অংশীদার হয়ে উঠবে এবং একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একটি শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।
তথ্যসূত্র:
1. Altbach, P. G. (2011). Leadership for world-class universities: Challenges for developing countries*. In P. G. Altbach & J. Salmi (Eds.), The road to academic excellence: The making of world-class research universities* (pp. 167–181). World Bank.
2. Clark, B. R. (1998). Creating entrepreneurial universities: Organizational pathways of transformation. Pergamon Press.
3. Organisation for Economic Co-operation and Development (OECD). (2019). Benchmarking higher education system performance: Conceptual framework and data, 2019. OECD Publishing. [https://doi.org/10.1787/be5514d7-en](https://doi.org/10.1787/be5514d7-en)
4. University Grants Commission of Bangladesh (UGC). (2022). Annual report 2021. UGC Bangladesh. [https://www.ugc.gov.bd](https://www.ugc.gov.bd)
5. Salmi, J. (2009). The challenge of establishing world-class universities. World Bank. [https://doi.org/10.1596/978-0-8213-7865-6](https://doi.org/10.1596/978-0-8213-7865-6)
লেখক:
ড. মো: হাছান উদ্দীন
অধ্যাপক
ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী
[email protected]
এইচআর/এমএস