রিকশাচালক বাবার ঘরে তিন ছেলেমেয়ে। তাদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারেন না বাবা।

তিনি ও তাঁর স্ত্রী নিরক্ষর। বড় মেয়ে এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। ছোট মেয়ে মাধ্যমিকে পড়ে। ছেলে পড়ে ক্লাস সেভেনে।

প্রত্যেকেরই রেজাল্ট ভালো। বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন দুই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেবেন। স্ত্রী রাজি নন। যেমন করেই হোক মেয়েদের তিনি পড়াবেন।

এই সংবাদ ছাপা হয়েছিল ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায়। সেদিনই পরিবারটিকে খুঁজে বের করে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল ‘শুভসংঘ’। ২০১৭ সালের কথা। বাবাকে একটি অটোরিকশা কিনে দেওয়া হলো। তিন ছেলেমেয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া হলো।

কিছুদিনের মধ্যেই পরিবারটি দাঁড়িয়ে গেল। বড় মেয়ে এইচএসসি পাস করে নার্সিংয়ে ভর্তি হলো। চার বছর পর প্রশিক্ষিত নার্স হয়ে গেল। এখন ভালো বেতনে চাকরি করছে। ছোট মেয়েও নার্সিং পড়া শেষ করে বেরিয়েছে। ছেলেটি লাইভস্টকে ডিপ্লোমা করে দেশের বিখ্যাত একটি কম্পানিতে চাকরি পেয়ে গেছে। তাদের পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করেছে শুভসংঘ। মাসের প্রথম সপ্তাহেই একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা তারা হাতে পেয়ে যেত। এ তো মাত্র একটি উদাহরণ। এ রকম কয়েক হাজার অসহায়, দরিদ্র মানুষ ও ছাত্র-ছাত্রীর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে ‘শুভসংঘ’।

গোয়ালন্দের একটি পরিবারের কথা বলি। থাকে চরের সরকারি জমিতে। পাটখড়ির ঘর। সেই ঘরে মা-বাবা ও তিন মেয়ে থাকে এক পাশে, অন্য পাশে একটি গরু আর দুটি ছাগলের পাশে শুয়ে থাকে ছেলেটি। পাটখড়ির ফাঁকফোকর দিয়ে নদীর তুমুল হাওয়া আসে, বৃষ্টিতে ভিজে যায় বইপত্র। ছেলেটি তার অঙ্ক করা পৃষ্ঠাগুলো পাটখড়ির বেড়ায় সাঁটিয়ে রাখত যাতে হাওয়া প্রতিরোধ করা যায়, অন্যদিকে অক্ষরগুলোও সে চোখের সামনে দেখতে পায়। সে এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেল। বাবা অসুস্থ। ছেলেমেয়েদের খাওয়াতে পারেন না। মা অন্যের ক্ষেতখোলায় কাজ করেন। ছেলের পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে গেছে। এই পরিবারটির পাশেও দাঁড়াল ‘শুভসংঘ’। প্রথমে তাদের দুই কামরার একটি টিনের ঘর তুলে দেওয়া হলো। চৌকি চেয়ার টেবিল কিনে দেওয়া হলো, হাঁড়ি থালা বাসন যা যা প্রয়োজন একটি সংসারে, সবই কিনে দেওয়া হলো। তিনটি ছাগল ও অনেকগুলো হাঁস-মুরগি কিনে দেওয়া হলো। ছেলেটির পড়াশোনার দায়িত্ব তো নেওয়া হলোই, ছোট তিনটি মেয়েরও পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া হলো। ছেলেটি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বড় মেয়েটি কলেজে পড়ে। তাদের পাশে এখনো দাঁড়িয়ে আছে ‘শুভসংঘ’।

যাত্রা শুরুর সময় থেকেই এসব কাজ করে আসছে ‘শুভসংঘ’। বহু পরিবারকে ঘর করে দেওয়া হয়েছে। হাঁস মুরগি গরু ছাগল কিনে দিয়ে বহু পরিবারকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রতিবন্ধী মানুষকে দোকান করে দেওয়া হয়েছে, হুইলচেয়ার কিনে দেওয়া হয়েছে অনেক অচল মানুষকে। শীতার্তদের মাঝে লাখ লাখ কম্বল বিতরণ, বন্যার্তদের মাঝে বস্তা বস্তা ত্রাণ বিতরণ, পরিবেশ রক্ষায় হাজার হাজার বৃক্ষরোপণ ও জনসচেতনতায় নানা ধরনের কাজ সংগঠনটি শুরু থেকেই করে আসছে। সারা দেশে কয়েক লাখ ছেলেমেয়ে সংগঠনটির সঙ্গে জড়িত। দেশব্যাপী কয়েক শ শাখা রয়েছে শুভসংঘের।

শুভসংঘের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। ‘শুভ কাজে সবার পাশে’—এই স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করে সংগঠনটি। শুভসংঘ পরিচালিত হয় বসুন্ধরা গ্রুপের অর্থায়নে। করোনাকালে বিশাল একটি কাজ করেছিল শুভসংঘ। উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলার ৫০ হাজার পরিবারকে এক মাসের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। শুভসংঘের ছেলেমেয়েরা জীবনের প্রবল ঝুঁকি নিয়ে ৫০ হাজার পরিবারের প্রত্যেকের ঘরে এই খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিয়েছিল।

দিনে দিনে সংগঠনের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। এখন কয়েক হাজার দরিদ্র মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীকে বৃত্তি দেওয়া হয়। বহু অসহায় পরিবারকে মাসোহারা দেওয়া হয়। কোনো মানুষ দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে আছে, অসহায়ত্বের মধ্যে আছে খবর পেলেই শুভসংঘের ছেলেমেয়েরা সেসব মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। রক্তের প্রয়োজন এমন রোগীর খবর পেলেই তারা রক্ত দিতে চলে যায়। এককথায় যত রকমভাবে সম্ভব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে শুভসংঘের সবাই।

এখন শুভসংঘের ছাত্র বৃত্তি তো আছেই। পাশাপাশি অসচ্ছল নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য জেলা-উপজেলায় সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলেছে। সেসব কেন্দ্রে ১২ সপ্তাহ ধরে নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষকের বেতন ইত্যাদি সবই বহন করে শুভসংঘ। যাঁরা প্রশিক্ষণ নিতে আসেন তাঁদের খরচ করতে হয় না এক পয়সাও। প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেককে একটি করে সেলাই মেশিন উপহার দেওয়া হয়। প্রতি মাসে ১০০টি করে সেলাই মেশিন উপহার হিসেবে দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত। এই উদ্যোগ চলছে গত চার বছর ধরে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে কাছেপিঠে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই, সেসব জায়গায় স্কুল করে দিয়েছে শুভসংঘ। পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় চর আগস্তিতেও আছে ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুল’। এ রকম স্কুল ২১টি। বসুন্ধরা শুভসংঘ পাঠাগার চলছে ১০টি। এই বর্ষায় অন্তত ৫০ হাজার চারা রোপণ করবে শুভসংঘ। সব মিলিয়ে ‘শুভ কাজে সবার পাশে’ থেকে এগিয়ে চলেছে সংগঠনটি। আমরা চাই সুখী-সমৃদ্ধিশালী সুন্দর বাংলাদেশ। আমরা চাই স্বাস্থ্যকর সুন্দর পরিবেশে আমাদের সন্তানরা বড় হয়ে উঠুক। আমরা চাই সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি আদর্শ দেশ হিসেবে গড়ে উঠুক। আমরা চাই আমাদের মানুষগুলো বড় হোক। মানুষ বড় হলে দেশ বড় হয়।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews