দেশে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার মসলা আমদানি করতে হতো। সেই আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে মসলার উৎপাদন বাড়াতে বগুড়ার শিবগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয় মসলা গবেষণা কেন্দ্র। দেশের এই মসলা গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণার ফল মাঠে প্রয়োগের মাধ্যমে মসলা চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছে। সেই সঙ্গে খুলে দিয়েছে কৃষি অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার।

বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু বিদেশি মসলা বাদে বেশির ভাগ মসলা ফসলের উৎপাদনের উপযোগী আবহাওয়া ও পরিবেশ আমাদের দেশেই রয়েছে। এ সম্ভাবনা কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলে দেশ মসলা উৎপাদনে স্বনির্ভর হয়ে উঠবে। এতে আর্থিকভাবে ভোক্তা, কৃষক উভয়ই লাভবান হবে। বগুড়া শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার উত্তরে ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের পাশে শিবগঞ্জ উপজেলার রায়নগরে ২৭ দশমিক ৬৯ হেক্টর জমির ওপর ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অধীনে মসলা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। পরের বছর থেকে চালু হয় পূর্ণাঙ্গ গবেষণা কার্যক্রম। ১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু করা এই কেন্দ্রটির প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে মসলা জাতীয় ফসলের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা এবং এর মাধ্যমে মসলা জাতীয় ফসলের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে নিয়ে আসা। কেন্দ্রটি মসলার বহুমুখী জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে সবার নজরে এসেছে। মসলা গবেষণা কেন্দ্রের অধীনে তিনটি আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্র ও চারটি উপ-আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র মাগুরা, কুমিল্লা ও গাজীপুরে। আর উপ-আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র লালমনিরহাট, ফরিদপুর, সিলেট ও খাগড়াছড়িতে।

বর্তমানে মসলা গবেষণা কেন্দ্রে ৪৭টি দেশি-বিদেশি মসলা ফসলের ওপর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২৭টি মসলা জাতীয় ফসলের ওপর গবেষণা করে এ পর্যন্ত ৫৭টি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। যা বর্তমানে কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদ হচ্ছে। এছাড়া উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে উৎপাদন প্রযুক্তি, মৃত্তিকা ও পানি ব্যবস্থাপনা, পোকামাকড় ও রোগ বালাই ব্যবস্থাপনা, পোস্ট-হারভেস্ট প্রযুক্তিসহ আরও ৮০টিরও বেশি উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। এছাড়া আর্থ-সামাজিক, বাজারজাতকরণ ও ভেল্যু চেইন, কৃষক পর্যায়ে গবেষণার প্রভাব যাচাই বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। উদ্ভাবিত ফসলের মধ্যে রয়েছে, পেঁয়াজের সাতটি জাত, মরিচ, রসুন, আদা, হলুদ, ধনিয়া, কালোজিরা, মেথি, মৌরি, ফিরিঙ্গি, দারুচিনি, চুইঝাল, আলুবোখারাসহ অন্যান্য মূল্যবান মসলা। প্রথমবারের মতো দেশে ভ্যানিলা চাষেও সফলতা এসেছে এই কেন্দ্রে। বস্তায় আদা চাষ, বাণিজ্যিকভাবে কালো এলাচ, গোলমরিচ উৎপাদনের সম্ভাবনাও জাগিয়ে তুলেছে কেন্দ্রটি। আরও যেসব মসলা নিয়ে গবেষণা চলছে তার মধ্যে রয়েছে- লেমনগ্রাস, একাঙ্গী, পোলাও পাতা, অলস্পাইস, চিভস, কাবাবচিনি, পেস্তা, জয়ফল, আম আদা, পান বিলাস, কারিপাতা প্রভৃতি।

সূত্র জানায়, ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে দেশে ১ দশমিক ৩৬ লাখ হেক্টর জমিতে মসলা জাতীয় ফসলের উৎপাদন ছিল তিন লাখ টন। বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৪ দশমিক ৪১ লাখ হেক্টর জমিতে ৪৫ দশমিক ৬৭ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। এখন বাংলাদেশে মসলার মোট চাহিদা ৪৭ দশমিক ৮৮ লাখ টন (প্রতিদিন জনপ্রতি ৭৪ গ্রাম)। দেখা গেছে, মসলা জাতীয় ফসলের মোট উৎপাদন বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৫ গুণেরও বেশি। মসলা গবেষণা কেন্দ্রের এই সফলতার সরাসরি সুবিধা পাচ্ছেন, দেশের কৃষক থেকে শুরু করে ব্যবহারকারীরা। উদ্ভাবিত আধুনিক চাষাবাদ ও উন্নত বীজের সহজলভ্যতা কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি মসলার বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে। বিশেষ করে পেঁয়াজের ক্ষেত্রে গ্রীষ্মকাল ও শীতকাল উভয় সময়েই চাষাবাদের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া দেশে বিভিন্ন রান্নায় ৫০ ধরনের মসলা নিয়মিত প্রয়োজন হয়। পেঁয়াজ, আদা, রসুন, হলুদ ও মরিচের মতো প্রয়োজনীয় মসলাগুলো এখন দেশেই উৎপাদিত হয়। তবে এলাচ, দারুচিনি ও লবঙ্গের মতো অনেক মসলা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে যা উৎপাদিত হয় তা চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণ মসলা আমদানি করতে হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৮ কোটি ডলার বিভিন্ন মসলা আমদানিতে খরচ হয়। যা কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৫ কোটি ৯০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। আমদানি নির্ভরতা আরও কমিয়ে নিয়ে আসার জন্য মূলত কৃষক পর্যায়ে দেশে উৎপাদিত মসলা জাতীয় ফসলের চাষাবাদ ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি উৎসাহিত করা হচ্ছে, যা মসলা গবেষণা কেন্দ্র হতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কৃষক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে।

মসলা গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মাসুদ আলম জানান, আগে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে মসলা আমদানি করতে হতো। এখন যেসব জাত আমরা চাষে এনেছি, সেগুলোর কারণে উৎপাদন অনেক বেড়েছে। ভবিষ্যতে আমদানি খরচ আরও কমিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব। চাষ আরও বাড়লে আমরা পুরোপুরি মসলায় স্বনির্ভর হতে পারব।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews