সম্প্রতি একজন এ্যাগ্রোর কর্ণধার ফেসবুকে একজন তরুণ মাংস রপ্তানিকারকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। এই অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয়, আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধা ও রাজনৈতিক অর্থনীতির এক কদর্য বৈপরীত্য। বৈধ পথে বাংলাদেশে ডলার আনা যেখানে পাহাড়সম বাধা, ডলার পাচার করা সেখানে জলবৎ তরল। বিশ্বের ১.১৩ ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল মাংসের বাজারে ভাগ বসাতে গিয়ে ১৫টি দপ্তরের ২০টির বেশি লাইসেন্সের বেড়াজাল নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; বরং এটি একটি নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানের চিরায়ত লক্ষণ। রাষ্ট্র যখন উদ্যোক্তার লেনদেন ব্যয় না কমিয়ে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করে, তখন সে কেবল উদ্ভাবনী মেধাকেই নয়, বরং জাতির ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধিকেও বিসর্জন দেয়।

উন্নয়ন অর্থনীতির চিরায়ত তত্ত্বে কৃষি ও শিল্পকে পৃথক খাত হিসেবে দেখা হলেও, উন্নয়নকে সাধারণত কৃষি থেকে শিল্পে কাঠামোগত রূপান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। আর্থার লুইসের (১৯৫৪) ‘ডুয়াল ইকোনমি’ মডেল অনুযায়ী, উন্নয়ন মানে কেবল কৃষি থেকে উদ্বৃত্ত শ্রম সরানো নয়; বরং সেই শ্রমকে উচ্চ উৎপাদনশীল শিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে কাঠামোগত রূপান্তর ঘটানো। অথচ বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। স্বাধীনতার পর জিডিপির ৬০ শতাংশ আসত কৃষি থেকে, যা আজ ১১ শতাংশে নেমে এলেও কর্মসংস্থানের ৪০ শতাংশের বেশি এখনও এই খাতেই আটকে আছে। তত্ত্বমতে, গ্রামীণ উদ্বৃত্ত শ্রম শিল্পে স্থানান্তরিত হওয়ার কথা থাকলেও, শিল্পে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি স্থবির। ফলে শহরমুখী শ্রমিকেরা শোভন কাজের বদলে অনিশ্চিত মজুরির গোলকধাঁধায় পতিত হচ্ছে। সেবা খাত অর্থনীতির অর্ধেকের বেশি দখল করলেও সেখানেও অদক্ষ শ্রম আর মেধা পাচারই মূল বাস্তবতা। এদিকে, পূর্ণ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পেয়েও বাংলাদেশের একজন নাগরিক তার উৎপাদনশীলতা-সম্ভাবনার মাত্র ৪৬ শতাংশ অর্জন করতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের নিচে। তাই, বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত মুক্তি কেবল পোশাক কারখানার সারিতে নয়, বরং এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনে। যখন আমাদের আলু কোল্ড স্টোরেজে পচে যায় অথচ আমরা চিপস আমদানি করি, যখন দেশীয় সুতা অবিকৃত থাকে আর আমরা ভারত থেকে সুতা আনি, কিংবা রাষ্ট্রীয় চিনিকল বন্ধ করে চিনি আমদানিতে ঝুঁকে পড়ি; তখন বুঝতে হবে আমাদের শিল্পায়ন মডেলটি মৌলিকভাবেই ত্রুটিপূর্ণ। এটি কেবল অর্থনৈতিক অপচয় নয়, বরং জাতীয় সক্ষমতার অকাল অপমৃত্যু।

এই ত্রুটিপূর্ণ মডেলের সবচেয়ে কদর্য প্রতিচ্ছবি হলো, রপ্তানি পথের সেই দুর্গম আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এটি কোনো একক উদ্যোক্তার বিলাপ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে তলানিতে থাকার জীবন্ত দলিল। একজন রপ্তানিকারককে প্রথম চালানের আগেই ১৫টি ভিন্ন দপ্তর থেকে ২০টির বেশি লাইসেন্স ও সনদ সংগ্রহ করতে হচ্ছে; সিটি কর্পোরেশন থেকে ধর্ম মন্ত্রণালয় কিংবা এয়ারপোর্টের কোয়ারেন্টাইন। ১.৮ লাখ টাকার আইনি ফি যখন ঘুষ ও দালালি চক্রে ৬ লাখ টাকায় ঠেকে, তখন সেই উদ্যোক্তার অপচয়কৃত ‘সময়ের মূল্য’ কে দেবে?

শুম্পিটারের ‘সৃজনশীল ধ্বংস’ থেকে ২০২৫ সালের নোবেলজয়ী জোয়েল মোকির, ফিলিপ আগিয়োঁ ও পিটার হাউইটের গবেষণা পর্যন্ত বলে, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য পুরোনো অদক্ষ কাঠামো সরিয়ে নতুন উদ্ভাবনী শক্তিকে জায়গা করে দেওয়া অপরিহার্য। অথচ আমাদের আমলাতন্ত্র এই সৃজনশীল ধ্বংসের পথে দেয়াল তুলে দিয়ে নতুনের বদলে অদক্ষ পুরোনোকেই কেবল টিকিয়ে রাখছে না, বরং লাইসেন্স-রাজের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংযোগবিশিষ্ট সিন্ডিকেটকে সুরক্ষা দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো, যে দেশ কৃষি উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দশে থাকার পরও সেই দেশের আমলাতন্ত্র কেন কৃষি-রপ্তানিকে শ্বাসরোধ করতে এতটা মরিয়া?

বাংলাদেশের কৃষি খাতের চরম ট্র্যাজেডি হলো, কৃষক পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না, আবার ভোক্তাও সস্তায় কিনতে পারে না। মাঝখানের এই বিশাল ‘ভ্যালু’ শুষে নিচ্ছে মধ্যসত্ত্বভোগীরা। মানসুর ওলসন (১৯৬৫) তাঁর ‘কালেক্টিভ অ্যাকশন’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, গুটিকয়েক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী (অলিগার্ক) যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার হয়, তখন তারা একটি শক্তিশালী ‘রেন্ট-সিকিং’ গোষ্ঠী তৈরি করে। এই গোষ্ঠীটি হিমাগার, সার এবং বীজের বাজারের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং নিজেদের স্বার্থেই রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আমলাতান্ত্রিকভাবে জটিল করে রাখে, যাতে রপ্তানি সহজ হলে তাদের একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণ ভেঙে না যায় এবং প্রান্তিক কৃষক আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ না পায়। মূলত, এই ভয় থেকেই আমলাতান্ত্রিক লৌহ কাঠামোটি রপ্তানির পথে সুকৌশলে কাঁটা বিছিয়ে রেখেছে।

আমাদের ৮০ শতাংশ পাটের বীজ এখনো ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। পাটের দেশ হয়েও কেন আমরা নিজস্ব বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারলাম না? এর উত্তরও লুকিয়ে আছে সেই কাঠামোতে; যেখানে আমদানির কমিশনভোগী গোষ্ঠী দেশীয় গবেষণাকে বছরের পর বছর পিছিয়ে দিচ্ছে। রাষ্ট্র যখন নিজের সক্ষমতা বিসর্জন দিয়ে আমদানিকারকের স্বার্থ রক্ষা করে, তখন কৃষি-শিল্পায়ন কেবল একটি অলীক স্বপ্নে পরিণত হয়। এই আমদানিনির্ভরতার সুযোগ নিয়ে যারা ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তারাই রপ্তানি প্রক্রিয়াকে জিম্মি করে রাখে; যাতে দেশীয় কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কখনোই বিশ্ববাজারের মূল স্রোতে প্রবেশ করতে না পারে।

অর্থনীতির ক্লাসরুমে আমরা প্রায়ই ‘রপ্তানি প্রমোশন’ বনাম ‘আমদানি বিকল্প নীতি’ নিয়ে দীর্ঘ তর্ক করি। কিন্তু তরুণ এই উদ্যোক্তার গল্পটি প্রমাণ করে, আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক অর্থনীতিতে সুরক্ষাবাদী নীতি এবং রপ্তানি নিরুৎসাহিত করার মধ্যে বাস্তবে কোনো পার্থক্য নেই।
১. রপ্তানির বিপরীতে আমদানির সহজতর গতি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই ‘চীন থেকে কীভাবে পণ্য আমদানি করে লাখপতি হবেন’ সংক্রান্ত হাজারো কোর্সের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। কিন্তু কেউ ‘কীভাবে বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানি করবেন’ তা শেখায় না। একজন আমদানিকারক এলসি খোলে, মার্জিন জমা দেয় এবং শুল্ক পরিশোধ করে অনায়াসে পণ্য আনে। অথচ একজন রপ্তানিকারককে ওই ১৫টি দপ্তরের স্যারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। একে বলা যায় অলিগার্কিক পক্ষাঘাত, যেখানে ব্যবসায়িক সাফল্য দক্ষতা বা উদ্ভাবনের ওপর নির্ভর করে না, বরং ক্ষমতার নৈকট্য ও আমলাতান্ত্রিক ফাঁদ এড়ানোর কৌশলের ওপর নির্ভর করে।

প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। যারা বছরে ৪০-৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করছে, তারা কি একই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ভেতর দিয়ে গেছে? বাস্তবতা হলো, না। তৈরি পোশাক খাত একটি বিশেষ নীতি-সহায়তা, বন্ডেড সুবিধা ও প্রশাসনিক সহজীকরণের সুরক্ষিত বলয়ের মধ্যে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু কৃষি বা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো নতুন খাতগুলো এখনো সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশে কার্যত একটি ‘ডুয়াল এক্সপোর্ট রেজিম’ তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রতিষ্ঠিত খাতগুলো নীতিগত সুবিধা ভোগ করে, আর নতুন খাতগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে থাকে।

২. দক্ষিণাঞ্চলের জুটমিল ও শিল্প হত্যার রাজনীতি: খুলনা ও যশোরের রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল রাজনৈতিক অর্থনীতির এক করুণ অধ্যায়। শুধু পাটকল নয়, ২০২০ সালে লোকসানের অজুহাতে একযোগে ৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল বন্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ মুষ্টিমেয় কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি ঠিকই বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি এনে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। সুতা ও কাগজের কলের ক্ষেত্রেও আমরা একই চিত্র দেখেছি। তাত্ত্বিকভাবে, এগুলোকে বলা হয় ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেটস’। কারখানা বন্ধের পেছনে ভর্তুকি-লোকসানের যুক্তি দেখানো হলেও এসব কারখানায় কয়েক দশকে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। ফলে আমরা ভারতের কাছে কাঁচা পাট রপ্তানি করছি, আর তারা সেই পাট দিয়ে ‘ভ্যালু অ্যাডেড’ পণ্য বানিয়ে বিশ্ববাজার দখল করছে। এটিই হলো ‘পেরিফেরি টু কোর’ মডেল; যেখানে আমরা কেবল কাঁচামালের যোগানদাতা হিসেবে অন্যের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করি, আর নিজেরা ‘শিল্প-শূন্য’ হয়ে পড়ি। কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে না পারলে আমাদের কৃষি খাতের জন্যও একই পরিণতি অপেক্ষা করছে।

৩. প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার অর্থনৈতিক মূল্য: আমলাতান্ত্রিক ওই ২০টি সনদের প্রতিটি আসলে এক একটি ‘প্রবেশ বাধা’ তৈরি করে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলে ‘কৃত্রিম অভাব’। বাজারে প্রবেশের পথ যখন এতটা জটিল হয়, তখন প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং অল্প কিছু খেলোয়াড় একচেটিয়া সুবিধা ভোগ করতে থাকে। ফলে যেসব খাতে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে (যেমন, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকর) সেখান থেকে রপ্তানি বহুমুখীকরণের স্বপ্ন ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো গবেষণা ও উন্নয়নের চরম দৈন্য। সরকারি নীতির বৈরিতার পাশাপাশি কৃষি ও প্রাণিজ পণ্যের গুণগত মানোন্নয়ন, প্যাকেজিং ও রোগমুক্ত সংরক্ষণে গবেষণার এই অভাব রপ্তানির পথে পাহাড়সম অন্তরায়।

৪. বৃহৎ পুঁজির একচেটিয়া বাজার: বাংলাদেশ থেকে বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য (১৭২ ধরনের) রপ্তানি হয়। প্রশ্ন জাগতে পারে, তরুণ উদ্যোক্তার কাছে যা হিমালয় জয়, বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো তা কীভাবে অবলীলায় করছে? এই রপ্তানি বাজারের সিংহভাগই নিয়ন্ত্রণ করে হাতে গোনা কয়েকটি করপোরেট গ্রুপ। তাত্ত্বিকভাবে সকলকেই ওই ১৫ দপ্তরের ধাপ পেরোতে হয়। কিন্তু বৃহৎ পুঁজির অধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ঘুষ বা প্রাতিষ্ঠানিক বিলম্বের এই ‘লেনদেন ব্যয়’ একেবারেই নগণ্য। তাদের বিশাল ‘ইকোনোমি অব স্কেল’ এবং ক্ষমতার নৈকট্য এই আমলাতান্ত্রিক বাধাকে সহজেই হজম করে নেয়। কিন্তু একজন নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য এটি মরণঘাতী। অর্থাৎ, আমাদের লাইসেন্সিং ব্যবস্থাটি মূলত ছোট উদ্যোক্তাদের ছিটকে ফেলে গুটিকয়েক অলিগার্কের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার নিখুঁত ছাঁকনি। অথচ বাস্তবতা হলো, আমাদের খামারিরা যখন কোরবানির হাটে ১৫-২০ লাখ গরু উদ্বৃত্ত রাখে, তখনই প্রমাণ হয় দেশ গবাদিপশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু এই উদ্বৃত্তকে কাজে লাগিয়ে ১.১৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক হালাল মাংসের বাজারে প্রবেশের পথটিই আটকে আছে ওই লাইসেন্স-বেড়াজালে। বর্তমানে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে সরকার যে ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে, মূলত এই ভর্তুকির কারণেই আমাদের আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা ও দুর্নীতির প্রকৃত আর্থিক ক্ষতটি ঢাকা পড়ে আছে।

৫. কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ: ১৮ কোটি মানুষের বিশাল স্থানীয় চাহিদাই হতে পারে আমাদের শিল্পের সবচেয়ে বড় জ্বালানি। পল রোমার (১৯৯০) তাঁর তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, একটি দেশের ভেতরে বিশাল বাজার থাকলে তার শিল্পায়নের গতি হতে হবে ‘এন্ডোজেনাস’। আমাদের গ্রামীণ জনপদে যখন লাখ লাখ খামারি রয়েছেন, তখন আমরা কেন গুঁড়ো দুধ আমদানি করব? রাষ্ট্র যদি একটি ‘সেন্ট্রাল প্রসেসিং গ্রিড’ তৈরি করত, তবে নিউজিল্যান্ডের ডেইরি জায়ান্ট ‘ফনটেরা’র মতো আমাদেরও সমবায়ভিত্তিক বড় শিল্প গড়ে উঠত। একইভাবে, সমুদ্রের ‘নীল অর্থনীতিকে’ কৃষি-শিল্পায়নের সাথে যুক্ত করতে হবে। সামুদ্রিক শৈবাল বা অণুজীব থেকে মাছের খাবার তৈরি করা সম্ভব, যা বর্তমানে পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। কিন্তু যতদিন রপ্তানি প্রক্রিয়া এমন দমবন্ধ করা থাকবে, ততদিন এই সম্ভাবনাগুলো কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

৬. নীতির অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব: সরকার একদিকে কৃষিপণ্য রপ্তানির কথা বলে, অন্যদিকে একই পণ্যের জন্য আমদানি-বিকল্প সুরক্ষা দেওয়ার নামে শুল্ক বাড়ায় এবং অভ্যন্তরীণ বাজার সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দেয়। আমরা যে নীতিই নিই না কেন, বাস্তবায়নের স্তরে গিয়ে তা চরম রপ্তানিবিরোধী ঝোঁকে পর্যবসিত হয়। এই নীতি-দ্বন্দ্বের ফলে উদ্যোক্তারা যে শুধু হয়রানির শিকার হন তা-ই নয়, বরং মূলধনের অপ্রাপ্যতায় ভোগেন। দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩০ শতাংশ। রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ বন্টিত হওয়ায় প্রকৃত উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় পুঁজি পান না। ফলে, লাইসেন্সের পেছনে অর্থ ও সময় খরচের পর আন্তর্জাতিক মানের স্লটারহাউস বা কোল্ড চেইন তৈরির স্বপ্ন তাঁদের কাছে অধরাই থেকে যায়।

কৃষি খাতকে বাঁচাতে কাঠামোগত নীতি বিপ্লব প্রয়োজন। প্রথমত, ডিজিটাল সিঙ্গেল উইন্ডো চালু করে ১৫ দপ্তরের হয়রানি বন্ধ এবং সমবায়ভিত্তিক কারখানা গড়তে হবে, যেখানে কৃষক লভ্যাংশের অংশীদার হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষি-শিল্পের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি এবং দেশীয় গবেষণাকে আইনি সুরক্ষা দিয়ে পাঁচ বছরে বীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে। তৃতীয়ত, উচ্চ লজিস্টিক ব্যয় (১৫-২০%) কমাতে উপজেলা পর্যায়ে পিপিপি মডেলে স্মার্ট কোল্ড স্টোরেজ ও ডিজিটাল বিপণন কেন্দ্র গড়তে হবে। চতুর্থত, রাষ্ট্রায়ত্ত জুটমিল ও সুগারমিলগুলো পাবলিক-প্রাইভেট-কমিউনিটি পার্টনারশিপে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের মাধ্যমে সচল করতে হবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী
Email: [email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews