২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সউদী আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে। সউদী আরবের মক্কা নগরীর আল-সাফা প্রাসাদে সউদী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহবাজ শরীফ নিজ নিজ দেশের পক্ষে চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেন। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সউদী আরব এবং পাকিস্তান ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (ঝঃৎধঃবমরপ গঁঃঁধষ উবভবহপব অমৎববসবহঃ, ঝগউঅ) স্বাক্ষর করেছিল। সউদী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ রিয়াদের আল-ইয়ামামাহ প্রাসাদে নিজ নিজ দেশের পক্ষে তখন চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ হচ্ছে ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’টির সম্প্রসারিত অংশ।
চুক্তির খবর প্রকাশের পরপরই তা বিশ্বব্যাপী আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে এবং এটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। চুক্তিটির যথাযথ বাস্তবায়ন এবং সম্প্রসারণ দেশ তিনটিসহ মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটাবে। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি। চুক্তিটি স¤পর্কে দেশ তিনটির যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, এটি একটি সম্মিলিত প্রতিরক্ষা চুক্তি, যার অধীনে তিনটি দেশের যে কোন একটিকে আক্রমণ, তিনটি দেশকেই আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। তিন দেশের অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থরক্ষা এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে তিন সামরিক বাহিনীর স¤পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হবে। এই চুক্তির উদ্দেশ্য হলো সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। চুক্তিটিতে এক দেশের ওপর হামলাকে তিনটি দেশের ওপর হামলা হিসাবে গণ্য করার এবং যৌথভাবে তা মোকাবেলার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, এটি একটি ব্যাপকভিত্তিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং সব ধরনের সামরিক সহযোগিতা এর অন্তর্ভুক্ত। আরো বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কোনো দেশকে উদ্দেশ্য করে নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্যই এটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটি কোনো আগ্রাসী চুক্তি নয় বরং প্রতিরক্ষা চুক্তি। চুক্তিটির মেয়াদকাল, যৌথ মহড়ার অবকাঠামো, অস্ত্র বিনিময় এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় নিয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ না করলেও এটি একটি ব্যাপকভিত্তিক প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। সউদী আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিদ্যমান। দেশ তিনটিই বন্ধুপ্রতিম মুসলিম দেশ। দেশ তিনটি বিভিন্ন সংকটে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। সউদী আরব এবং পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬৭ সালে প্রথম প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তখন থেকেই পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নিয়মিতভাবে সউদী আরবের সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। দেশ দুটি বিভিন্ন সময়ে একাধিক যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ করেছে এবং সউদী সামরিক বাহিনীর সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে পাকিস্তানিরা নিয়মিতভাবে কাজ করে আসছে। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দেশ দুটি ‘কৌশলগত পার¯পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে, যা তাদের মধ্যে চলমান সামরিক সহযোগিতার বহুমাত্রিক রূপ। এখন সউদী আরব এবং পাকিস্তানের সাথে তুরস্ক যোগ দিয়েছে এবং দেশ তিনটি মিলে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে। এর মাধ্যমে দেশ তিনটির একটি শক্তিশালী সামরিক জোট হিসাবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে। সউদী আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কÑ মুসলিম বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী তিনটি দেশ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জন্মস্থান, পবিত্র কাবা এবং মসজিদে নববী সউদী আরবেই অবস্থিত। স্বাভাবিকভাবেই মুসলিম বিশ্বে সউদী আরবের আলাদা ভাবমর্যাদা এবং প্রভাব বিদ্যমান।
প্রতি বছর সারাবিশ্বের লক্ষ লক্ষ মুসলমান হজ্জ এবং ওমরা পালনে সউদী আরব সফর করেন। তাছাড়া দেশটি তেল এবং গ্যাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক স¤পদে সমৃদ্ধ। ফলে সউদী আরব অত্যন্ত ধনী দেশ এবং তার অর্থনীতি অত্যন্ত শক্তিশালী। অপরদিকে আর্থিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল হলেও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে পাকিস্তান অনেক উন্নত। দেশটি পারমাণবিক শক্তির অধিকারী এবং নিজস্ব প্রযুক্তিতে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে। নিজেরাই ড্রোন, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধ জাহাজ, বিভিন্ন ধরনের বন্দুক এবং গোলাবারুদ তৈরি করছে। দেশটির রয়েছে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। স্বাভাবিকভাবেই সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পাকিস্তানের নিজস্ব একটা অবস্থান আছে। অপরদিকে এশিয়া এবং ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত তুরস্কের রয়েছে অটোম্যান সাম্রাজ্যের দীর্ঘ ইতিহাস। দেশটি ন্যাটোর সদস্য। ড্রোন, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণসহ বিভিন্ন সামরিক ক্ষেত্রে তুরস্কের দৃঢ় অবস্থান রয়েছে এবং দিন দিন উন্নতি করছে। টেক্সটাইল এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রেও তুরস্কের অবস্থান অনেক উন্নত। তুরস্ক এবং পাকিস্তানের প্রযুক্তি আর সউদী আরবের অর্থ একসাথে মিলে কাজ করলে তিনটি দেশই সামগ্রিকভাবে উপকৃত হবে এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। সউদী আরব-পাকিস্তান-তুরস্কের প্রতিরক্ষা চুক্তিটি একটি বৃহত্তর মুসলিম সামরিক জোট গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্যান্য মুসলিম দেশ এই জোটে যোগ দিতে পারে। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সউদী আরব এবং পাকিস্তানের ‘কৌশলগত পার¯পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর শেষে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছিলেন, ‘চুক্তিটিতে অন্যান্য দেশ এবং আরব দেশগুলোর যোগদানের সুযোগ রয়েছে।’ ইতোমধ্যেই সউদী আরব এবং পাকিস্তানের সাথে তুরস্ক যোগ দিয়েছে। বর্তমানে ৫৭টি মুসলিম দেশ ওআইসির সদস্য, তম্মধ্যে ৪৮টিতে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এসবের অর্ধেক সদস্যও যদি এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেয় তাহলে ভবিষ্যতে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত সামরিক জোটে পরিণত হবে। ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, আরব আমিরাত, ওমান, মিশর, সিরিয়া, জর্দান, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, উজবেকিস্থান, তাজাকিস্তানসহ প্রায় সকল মুসলিম দেশই এর সদস্য হতে পারে। এমনকি বাংলাদেশেরও এই জোটে যোগ দেয়ার সুযোগ রয়েছে। সউদী আরবের সাথে ইরানের স¤পর্ক অতীতে খারাপ থাকলেও বর্তমানে বেশ ভালো। ইরান যোগ দিলে এই জোটের শক্তি অনেক বৃদ্ধি পাবে। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ইরান, মিশর সামরিক প্রযুক্তিতে অনেক উন্নত। অপরদিকে কুয়েত, কাতার এবং আরব আমিরাত অনেক ধনী রাষ্ট্র। সবাই যদি একজোট হয় তাহলে বৃহত্তর সামরিক জোট গঠিত হতে পারে, যা মুসলিম দেশসমূহের সামগ্রিক নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা অর্জনকে নিশ্চিত করবে। এই জোট মুসলিম দেশগুলোকে পশ্চিমাদের ওপর নির্ভরতা বাদ দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ এনে দিয়েছে। কেউ কাউকে নিরাপত্তা দেবে না, নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরকেই নিশ্চিত করতে হয়। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়ায় পশ্চিমাদের আগ্রাসন, ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলা এবং ফিলিস্তিন, লেবাননে ইসরাইলি হত্যাযজ্ঞ তার জলন্ত উদাহরণ। পশ্চিমা দেশসমূহ তাদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে নিশ্চিত করার জন্য ১৯৪৯ সালে ন্যাটো প্রতিষ্ঠা করে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বর্তমানে ৩২টি দেশ ন্যাটোর সদস্য। ৭৭ বছর ধরে ন্যাটো পশ্চিমা দেশসমূহের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। অপরদিকে সমাজতান্ত্রিক ৮টি দেশ তাদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে নিশ্চিতে ১৯৫৫ সালে ওয়ারশ জোট প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা সমাজতন্ত্রের পতন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ায় ১৯৯১ সালে বিলুপ্ত হয়। সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, পোলান্ড, রুমানিয়া এক সময় ওয়ারশ জোটের সদস্য হলেও, সমাজতন্ত্র পরবর্তী সময়ে তারা এখন ন্যাটোর সদস্য। ওয়ারশ জোটের সদস্য পূর্ব জার্মানি পরবর্তীতে পশ্চিম জার্মানির সাথে একীভূত হওয়ায় সেও এখন ন্যাটোর সদস্য। সুতরাং বতর্মান বিশ্বে ন্যাটোই একমাত্র সামরিক জোট এবং এটি তার সদস্য দেশসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। এখন মুসলিম দেশসমূহের সম্মিলিত সামরিক জোট প্রয়োজন, যা মুসলিম দেশসমূহের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করবে। সউদী-পাকিস্তান-তুরস্ক প্রতিরক্ষা চুক্তি হতে পারে তার প্রাথমিক পদক্ষেপ। সউদী-পাকিস্তান-তুরস্কের স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। মুসলিম দেশসমূহ এই চুক্তিতে যোগ দিয়ে একটি সামরিক জোট গঠন করলে, পশ্চিমারা আর মুসলিম দেশসমূহের ওপর খবরদারি এবং আক্রমণ করতে পারবে না। তখন মুসলিম দেশসমূহ নিজেরাই একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে এবং বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হবে। ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি হবে এবং একক বিশ্ব ব্যবস্থার অবসান ঘটাবে। বর্তমানে মুসলিম দেশের সংখ্যা ৫৭টি, মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি এবং মুসলিম দেশসমূহের টোটাল জিডিপি প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তাছাড়া দেশসমূহ ব্যাপক পরিমাণে প্রাকৃতিক স¤পদ এবং বিশাল ভূখ-ের অধিকারী। এ অবস্থায় মুসলিম দেশসমূহ ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি প্রতিরক্ষা জোট গঠন করলে, তা দেশসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখবে। প্রতিরক্ষা এবং সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে স্বয়ংস্ব¤পূর্ণতাও অর্জন করতে পারবে। তার জন্য মুসলিম দেশসমূহকে পার¯পরিক সম্মান জানাতে হবে, একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণ বন্ধ করতে হবে। নিজেদের মধ্যকার সমস্যাসমূহ আলাপ-আলোচনা এবং সমঝোতার মাধ্যমে নিজেদেরকেই সমাধান করতে হবে। এক দেশের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের আক্রমণকে পুরো মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে গণ্য করতে করতে হবে এবং সম্মিলিত বাহিনী দিয়ে তা প্রতিহত করতে হবে। মুসলিম দেশসমূহের সামনে সর্বক্ষেত্রে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার যে বিশাল সুযোগ এবং সম্ভাবনা রয়েছে, সউদী-পাকিস্তান-তুরস্ক প্রতিরক্ষা চুক্তি সে পথে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে।
লেখক: প্রকৌশলী এবং রাষ্ট্র চিন্তক।