বাংলাদেশে চাঁদাবাজিকে প্রায়ই অর্থনীতির প্রধান সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—যেন চাঁদাবাজি থাকায় ব্যবসা বাড়ছে না, কর্মসংস্থান হচ্ছে না, রাষ্ট্র কাজ করছে না। কিন্তু বাস্তবে চাঁদাবাজি জন্মায় ঠিক উল্টো পরিস্থিতিতে। যখন অর্থনীতি নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না; রাষ্ট্র যখন নিয়ম বানালেও তা দরিদ্র ও বেকার জনগোষ্ঠীর বাস্তব সমস্যার সঙ্গে খাপ খায় না; যখন আইনের প্রয়োগ বেছে বেছে হয়; আর যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এত ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে যে অঘোষিত অর্থ ছাড়া দল চালানো কঠিন—ঠিক তখনই চাঁদাবাজির জন্ম হয়।
এই অর্থে চাঁদাবাজি কোনো রোগ নয়; এটি রোগের লক্ষণ বা উপসর্গ। তাই উপসর্গ দূর করে রোগ সারানোর চেষ্টা করলে মূল সমস্যা দূর হয় না। বরং একই রোগ ভিন্ন রূপে, কিংবা আরও তীব্রভাবে ফিরে আসে। কারণ, রাষ্ট্র বা আমলাতন্ত্র যখন অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাহীন নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, কিংবা নিয়মতান্ত্রিক অর্থনীতি তাদের জন্য পর্যাপ্ত জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে পারে না, তখন একটি অনানুষ্ঠানিক ও চাঁদানির্ভর বিকল্প শৃঙ্খলাব্যবস্থার জন্ম হয়।
এই ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে শোষণমূলক ও বেআইনি। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একধরনের বিকৃত শাসনব্যবস্থা তৈরি করে, যা কিছু মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ ও ন্যূনতম শৃঙ্খলা বজায় রাখে। মনে রাখা দরকার—এই ব্যবস্থা শুধু চাঁদাবাজদের জীবিকার উৎস নয়; বহু দরিদ্র ও অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাহীন মানুষও এই অনানুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই টিকে থাকে। এই বাস্তবতা বুঝতে বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি—যা দেশের মোট জিডিপির বড় একটি অংশ জোগান দেয়—কীভাবে কাজ করে, তা বোঝা জরুরি।