‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সামরিক অভিযানের দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর চারদিকে একটি সাধারণ ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষক ও সমালোচকদের অনেকেই মনে করছেন, ইরান পুরো অঞ্চলজুড়ে তীব্র পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে এবং বিশ্ববাসী মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সিনেটরদের কেউ কেউ, যেমন ক্রিস মারফি, এই পরিস্থিতিকে একটি বড় ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সিএনএন-এর মতো সংবাদমাধ্যমগুলোও প্রতিনিয়ত সতর্ক করছে যে প্রশাসন এই যুদ্ধের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।

এটা সত্য যে, যুদ্ধ সবসময়ই ধ্বংসাত্মক এবং এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের লাখ লাখ মানুষের ওপর প্রকৃত অর্থেই গভীর প্রভাব ফেলেছে। কাতারের রাজধানী দোহাতেও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সতর্কবার্তা বাজছে এবং কাতার এয়ারওয়েজ বাধ্য হয়ে উদ্ধারকারী ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে। কিন্তু এই নেতিবাচক বর্ণনাই পুরো পরিস্থিতির একমাত্র সত্য নয়। সমালোচকরা দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির হিসাব রাখলেও এই অভিযানের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ অনেকাংশেই এড়িয়ে যাচ্ছেন।

যখন ইরানের শক্তির মূল হাতিয়ারগুলোর—যেমন তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার, পারমাণবিক অবকাঠামো, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌবাহিনী এবং তাদের প্রক্সি বা ছায়া বাহিনীগুলোর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর বর্তমান অবস্থা—বিশ্লেষণ করা হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার কোনো চিত্র দেখা যায় না।

বরং এটি গত চার দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি বড় হুমকিকে সুপরিকল্পিত ও পর্যায়ক্রমিকভাবে দুর্বল করার এক সুস্পষ্ট চিত্র। প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে; যা ২৮ ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৩৫০টি, সেটি ১৪ মার্চের মধ্যে প্রায় ২৫টিতে নেমে এসেছে। ড্রোনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়; অভিযানের প্রথম দিনে যেখানে ৮০০টির বেশি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল, পনেরোতম দিনে তা প্রায় ৭৫টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক বিবৃতিগুলোর পরিসংখ্যানে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে, তবে উভয়ের তথ্যের গতিপ্রকৃতি একই দিকে নির্দেশ করে। ইতিমধ্যে শত শত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা অকেজো করে দেওয়া হয়েছে এবং কিছু প্রতিবেদন মতে, ইসরায়েলে আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতার ৮০ শতাংশই ধ্বংস করা হয়েছে।

সামরিক অভিযানের এই ধারাটি মূলত দুটি সুনির্দিষ্ট পর্যায়ে অগ্রসর হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকেজো করা, তাদের কমান্ড ও কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর শীর্ষ পর্যায়কে বিচ্ছিন্ন করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ অবকাঠামোকে ধ্বংস করার ওপর জোর দেওয়া হয়। ২ মার্চের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড পশ্চিম ইরান ও তেহরানের আকাশে নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় এবং এই অর্জনটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো যুদ্ধবিমান হারানোর নিশ্চিত তথ্য ছাড়াই। আকাশপথে আধিপত্য এতটাই সুনিশ্চিত হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের আকাশসীমায় নন-স্টিলথ বি-১ বোমারু বিমান ওড়াচ্ছে, যা তাদের সামরিক আত্মবিশ্বাসেরই পরিচায়ক।

বর্তমানে চলমান দ্বিতীয় পর্যায়ে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র, দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য গবেষণা কেন্দ্র এবং ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এই অভিযান কোনো উদ্দেশ্যহীন বোমা হামলা নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য হলো ধ্বংস হওয়া অবকাঠামো যেন পুনরায় গড়ে তোলা না যায় তা নিশ্চিত করা। এর ফলে ইরান এখন এমন এক কৌশলগত সংকটে পড়েছে যা প্রতিদিনই তীব্রতর হচ্ছে। তারা অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলে উৎক্ষেপণ ব্যবস্থাগুলো দ্রুত ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে, আবার সেগুলো জমিয়ে রাখলে যুদ্ধে কোনো প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হারাচ্ছে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, ইরান এখন তাদের অবশিষ্ট সক্ষমতা কেবল রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্যবহারের জন্য রেশনিং বা সঞ্চয় করছে, যা মূলত একটি ক্ষয়িষ্ণু শক্তির চিত্র, কোনোভাবেই ক্ষমতা প্রদর্শনের লক্ষণ নয়।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, রেকর্ড ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বৈশ্বিক রিজার্ভ থেকে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সম্মুখীন হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া ইরানের জন্য সবসময়ই একটি বড় প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হলেও, এটি তাদের নিজেদের জন্যই একটি আত্মঘাতী কৌশল। কারণ ইরানের নিজস্ব তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই খারগ দ্বীপ এবং এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। তেহরানের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অংশীদার চীনও এই প্রণালি বন্ধ থাকলে ইরানি অপরিশোধিত তেল গ্রহণ করতে পারবে না।

ফলে অবরোধ যত দীর্ঘ হবে, ইরান নিজেদের অর্থনীতির প্রাণশক্তিকে ততটাই দুর্বল করবে এবং জাতিসংঘের মতো মঞ্চে তাদের একমাত্র বড় মিত্রকে দূরে ঠেলে দেবে। এর পাশাপাশি, এই অবরোধ বজায় রাখার জন্য ইরানের যে নৌ-সক্ষমতা প্রয়োজন যেমন দ্রুতগামী আক্রমণকারী নৌকা, মাইন এবং উপকূলভিত্তিক জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র তা প্রতিদিনই ধ্বংস হচ্ছে এবং বন্দর আব্বাস ও চাবাহারের নৌঘাঁটিগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই ক্ষয়ক্ষতি এবং সংঘাতের মূল্যকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। ইরানে এক হাজার চারশোরও বেশি বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, প্রায় ১৫ জন মার্কিন সেনার প্রাণহানি এবং বিশ্বজুড়ে তেলের মূল্যবৃদ্ধির মতো ঘটনাগুলো অত্যন্ত গুরুতর, যার নৈতিক দায়ভার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বহন করতে হবে। উপসাগরীয় অঞ্চলের সবাই প্রতিদিন এই সাইরেনের আতঙ্কের মধ্যেই বাস করছে। কোনো বাধা না থাকলে ইরান হয়তো এতদিনে পারমাণবিক অস্ত্রধারী একটি রাষ্ট্রে পরিণত হতো, যারা ইচ্ছামতো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে পুরো অঞ্চলকে জিম্মি করার ক্ষমতা রাখত।

আজ এতগুলো দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু এবং ক্ষমতার প্রতিটি হাতিয়ার যেমন ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক অবকাঠামো, আকাশ প্রতিরক্ষা, নৌবাহিনী এবং প্রক্সি কমান্ড নেটওয়ার্ক ধ্বংস হওয়ার মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট যে, যুদ্ধপরবর্তী পরিকল্পনার অভাব থাকলেও দৃশ্যমান এই ধ্বংসযজ্ঞের আড়ালে কৌশলগতভাবে আমেরিকা-ইসরায়েলের সামরিক অভিযান তার লক্ষ্য অর্জনেই এগিয়ে যাচ্ছে।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews