শক্তির প্রধান উৎস সূর্য। সূর্য থেকে আমরা আলো এবং তাপ পাই। বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সূর্যের তাপকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অনেক দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। সূর্য আয়তনে পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ১৩ লাখ গুণ বড়। সূর্যের ভর পৃথিবীর ভরের চেয়ে তিন লাখ ত্রিশ হাজার গুণ ভারী। সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৬৫০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং কেন্দ্রের তাপমাত্রা প্রায় তিন কোটি ডিগ্রী সেলসিয়াস। সূর্য পৃথিবী থেকে গড়ে ১৪ কোটি ৮৮ লাখ কিলোমিটার দূরে। সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে প্রায় ৮ মিনিট। সূর্য এক বিশাল শক্তির উৎস। যুগের পরিবর্তন ও প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ সূর্যের আলো প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্নভাবে ব্যবহার করছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সোলার প্যানেল বা সৌরবিদ্যুৎ। সোলার প্যানেল এমন একটি যন্ত্র যা পরবর্তীতে ব্যবহারের জন্য সূর্যের শক্তি ধরে রাখে। এর প্লেটগুলো সূর্যের তাপকে ফটোভোলটাইক শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে। সোলার প্যানেলের মাধ্যমে কৃষিকাজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, বাড়ি-গাড়ি, ক্যালকুলেটর, হাত ঘড়ি বৈদ্যুতিক বাতি, মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইট ইত্যাদি সূর্যের আলো থেকে শক্তি নিয়ে কাজ করে।
পাওয়ার ডেভেলপমেন্টের কোনো বিকল্প নেই। যে দেশ বিদ্যুৎ ও শক্তি উন্নয়নে যত এগিয়ে, সেই দেশ সামগ্রিক উন্নয়ন ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তত এগিয়ে থাকে। আমাদের দেশে জ্বালানি তেলের জন্য ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। বিদ্যুৎ, সেচ, পরিবহনসহ নানা খাতে ব্যবহার করার জন্য বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করতে হয়। এতে প্রতি বছর বিপুল বৈবদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। অথচ আমরা এমন একটি দেশে বাস করি, যেখানে বছরের অধিকাংশ সময় পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পাওয়া যায়। এই প্রাকৃতিক সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যদি সারাদেশে পরিকল্পিতভাবে সোলার এনার্জির বিস্তার ঘটানো যায়, তাহলে শুধু বিদুৎ উৎপাদনই নয়, বিদেশে ডলার চলে যাওয়ার চাপও অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
ইউরোপের অনেক দেশ, যেখানে বছরের বড় সময় বরফ আর শীত থাকে, তারাও গ্রিন এনার্জির উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। অথচ আমাদের দেশ প্রকৃতিগতভাবেই সৌরশক্তির জন্য অনেক বেশি উপযোগী। আমরা যদি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করি, তাহলে তিনটি বড় উপকার হবে। ১. তেল আমদানিনির্ভরতা কমবে। ২. বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। ৩. পরিবেশবান্ধব শক্তির দিকে দেশ এগিয়ে যাবে।
বাস্তব অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরতে চাই। আমাদের গ্রাম-গঞ্জ, শহর, কলকারখানা প্রায় সব জায়গাতেই ভবনের ছাদ রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের খোলা জায়গা ও টিনের চালার ওপরও সহজেই সোলার প্যানেল স্থাপন করা সম্ভব। এই বিদ্যমান অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে আমরা সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে অন-গ্রিড বা অফ-গ্রিড, উভয় ধরনের বিদ্যুৎ সহায়তা পেতে পারি।
একটি সোলার সিস্টেমের জন্য প্রধানত তিনটি উপাদান প্রয়োজন। এগুলো হচ্ছে, সোলার প্যানেল, ইনভার্টার এবং ব্যাটারি। এর মধ্যে সোলার প্যানেলের মেয়াদ সাধারণত ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত, যা দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত কার্যকর। ইনভার্টার তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল এবং কয়েক বছর ব্যবহারযোগ্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল অংশ হচ্ছে ব্যাটারি, যা সাধারণত ২ থেকে ৪ বছরের মধ্যে পরিবর্তন করতে হয়। এখানেই মূল সমস্যা। আমাদের দেশে সোলার ব্যাটারির উপর উচ্চ হারে আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যার ফলে এই খরচ সরাসরি সাধারণ ব্যবহারকারীর ওপর পড়ে। এতে প্রাথমিক বিনিয়োগ অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে গ্রামের ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ মাসে হয়তো ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে। খোনে তিনি কেন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি খরচ করে একটি সোলার সিস্টেম স্থাপন করবেন, এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে সামনে আসে। ফলে তারা খরচ-সুবিধা বিবেচনা করে এই বিনিয়োগ থেকে সরে আসেন।
এই প্রেক্ষাপটে, সরকারের কাছে প্রস্তাব হচ্ছে, সোলার খাতে এই বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে ব্যাটারির উপর আরোপিত কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হলে, সাধারণ মানুষ সহজেই এটি ব্যবহার করতে উৎসাহিত হবে। পাশাপাশি সহজ কিস্তি বা আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা চালু করা হলে প্রাথমিক বিনিয়োগের চাপ অনেকটাই কমে আসবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা, সব জায়গায় সোলার ব্যবস্থার বিস্তার করতে পারলে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ অনেকটাই কমে যাবে। একইসঙ্গে বিদ্যুতের ঘাটতি কমবে, ব্যয়বহুল বিকল্প উৎসের উপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে এবং দেশ ধীরে ধীরে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাবে।
সৌরশক্তি প্রকৃতির অফুরন্ত সম্পদ। সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমাধান নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই পথ। তাই এই খাতকে যথাযথ নীতিগত সহায়তা প্রদান করা হলে, এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। আশার বিষয় হচ্ছে, রাজধানীতে বিদ্যুতের লোড কমাতে সব বাসায় সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত ৭ মে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও নির্মাণ সরঞ্জাম বিষয়ক বিআইআইডি এক্সপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিদ্যুতের ব্যাকআপ ব্যবস্থা তৈরি করতে সোলার পাওয়ারকে সহজলভ্য করা হবে। আগামী জুন মাসের মধ্যে সরকারি আদেশ জারির মাধ্যমে এ বিষয়ে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। তিনি আরও বলেন, নেতৃত্বের অভাবে দেশে এখন পর্যন্ত ব্যাপকভাবে সোলার ব্যবস্থায় যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে সোলার ও উইন্ড এনার্জিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চায়।
দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ২০২৮ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৮০৯ দশমিক ৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে ১ হাজার ৪৫১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫ দশমিক ০১ শতাংশ।
উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের যোগান নিশ্চিত করা কঠিন। গ্যাস, তেল বা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প দিয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুতের পুরো চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। সাময়িকভাবে চাহিদা পূরণ কোনভাবে করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বিপর্যয় ডেকে আনবে। তাই সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের পথ।
লেখক : বাজার বিশ্লেষক ও অর্থ ব্যবস্থাপনা পরামর্শক।