মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অব্যাহত হুমকির শেষ ধাপে এসে পুরো সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেয়ার আলটিমেটামের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানের ১০ দফা শর্ত মেনে ১৫ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নিয়েছেন ট্রাম্প। ঊনচল্লিশ দিনের বিরতিহীন বিমান হামলা, মিসাইল ও ড্রোন হামলায় ইরান ও ইসরাইলের হাজার হাজার বাড়িঘর, সামরিক স্থাপনা, কলকারখানা, বিশ্ববিদ্যায়লয়, তেল শোধনাগারসহ তেহরান-তেলআবিব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিশেষত দীর্ঘদিন ধরে আকাশ প্রতিরক্ষায় অজেয় শক্তি হিসেবে দাবি করা ইসরাইলের সব প্রতিরক্ষা শক্তি চুরমার করে দিয়ে ইরানের মিসাইলের ধ্বংসযজ্ঞে কেয়ামত দেখেছে দখলদার ইসরাইলিরা। দুই বছর ধরে একচ্ছত্র বিমান হামলা করে গাজা সিটিকে ধ্বংসস্তূপ ও মৃত্যুপুরিতে পরিণত করার শেষ প্রান্তে এসে খোদ ইসরাইলের এমন ধ্বংস দেখে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ ইরানের আইআরজিসি’র প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেছে। ৭ মাসের ব্যবধানে ইসরাইল-আমেরিকাই দ্বিতীয়বারের মতো কূটনৈতিক সমঝোতা ও আলোচনার ফাঁদ পেতে ইরানের উপর প্রথম যৌথ বিমান হামলা করে ইরানে সামরিক-বেসামরিক নেতৃত্ব ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামোগুলো ধ্বংস করে দেয়ার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু করে; শেষ পর্যন্ত ইরানি প্রতিরোধ ও পাল্টা হামলায় নাস্তানাবুদ হয়ে যুদ্ধ বিরতির জন্য চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের কাছে ধর্না দিতে বাধ্য হয়েছে। ইরানে রেজিম চেঞ্জ, প্রতিরোধ শক্তি নিঃশেষ করে দিয়ে তেল সম্পদের দখল নেয়ার লক্ষ্য নিয়ে আক্রমণ শুরুর পর ঊনচল্লিশ দিনের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সব অবস্থানই হারিয়েছে। বিশেষত এই যুদ্ধ হরমুজ প্রণালীর উপর ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ এনে দিয়েছে, যা; বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা ঘটিয়েছে।

ইরানে ইসরাইল-আমেরিকার বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের মৃত্যুর পর ইসরাইলি যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন, এটি তার ৪০ বছরের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা। তাঁরা ধরেই নিয়েছিল, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর ইরানের জনগণ আবার রাস্তায় নেমে এসে রেজিমের পতন ঘটাবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের বশংবদ ব্যক্তিদের ক্ষমতায় বসিয়ে তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। কিন্তু বিদেশি আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের ইস্পাত কঠিন ঐক্য, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের মনোভাব এবং আইআরজিসি ও ইসলামি প্রতিরোধ শক্তির পাল্টা হামলায় আমেরিকা-ইসরাইলের আঞ্চলিক আধিপত্যের মেরুদ- ভেঙ্গে দিতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষত হরমুজ প্রণালীর উপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং আগ্রাসী শক্তির সমর্থক-সহযোগীদের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধের প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বঅর্থনীতিকে চরম চাপের মুখে ফেলে দেয়। এহেন বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যের কোনো আঞ্চলিক শক্তি এমনকি ইউরোপের কোনো দেশই মার্কিন-ইসরাইলের প্রতি সমর্থন দিতে রাজি হয়নি। বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুহীন হওয়ার এমন ঘটনা ঘটল। তেলসম্পদ লুণ্ঠন এবং জায়নবাদী নীলনকশা বাস্তবায়নের আগ্রাসনকে ইসলামোফোবিক এজেন্ডায় একটি ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ হিসেবে রূপ দেয়ার চেষ্টা করেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের কোনো দেশই জায়নবাদীদের এই চক্রান্তের ফাঁদে পা দেয়নি। কিন্তু জিসিসিভুক্ত আরব দেশগুলো ভন্ডামি ও পশ্চিমা লেজুড়বৃত্তি থেকে এবারো বেরিয়ে আসতে পারেনি। তারা মুসলমান ইরানকে ঠেকাতে খ্রিস্টান-ইহুদিদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছে। অথচ, পবিত্র কোরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা হচ্ছে, ‘তোমরা ইহুদি-নাসারাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না, তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু’ সুরা মায়েদা-আয়াত ৫১। এবারের যুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরাইল ইউরোপের কোনো দেশের সমর্থন না পেলেও ট্রাম্প, নেতানিয়াহু ও নরেন্দ্র মোদির ঐক্য এবং আরবদের গোপন আঁতাত ছিল। আরবদের সমর্থনেই ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ইরানে রেজিম বদলের লক্ষ্য নিয়ে আগ্রাসন শুরু করেছিল বলে প্রতিয়মান হয়।

গাজার উপর দুই দশকের সর্বাত্মক অবরোধ অব্যাহত রেখে দুই বছর ধরে বিমান হামলা ও কামানের গোলায় গণহত্যা ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার মধ্য দিয়ে নেতানিয়াহু বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে হিটলারের ইহুদি হত্যার যৌক্তিকতাকেই প্রমাণ করেছে। ৬ হাজার বছরের ধারাবাহিক সভ্যতার উত্তরাধিকার ইরান কখনো কোনো প্রতিবেশীর উপর আগ্রাসন বা দখলদারিত্ব না চালালেও শুধুমাত্র জায়নবাদী নীল নকশা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ভন্ড ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ইরানি সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দিয়ে বিশ্বকে এক চরম উদ্বেগের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাঁর এই হুমকিকে পারমাণবিক হামলার হুমকি হিসেবে দেখেছে বিশ্বের মানুষ। ইরান এনপিটি বা জাতিসংঘের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে সই করা দেশ। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মতো পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ইরানি সভ্যতা চিরতরে শেষ করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে! এমন বাস্তবতা ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর মানসিক বিকৃতি ও অপরিণামদর্শিতার প্রমাণ বহন করে। এরপরও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নীরবতা ছিল লজ্জাজনক এবং ইরানের বিপ্লবী সরকার এবং জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ও সাহসী অবস্থান ছিল বিস্ময়কর। তারা পুরো বিশ্বের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আল্লাহভীরু মুসলমানরা কোনো পরাশক্তির ভয়ে বশ্যতা মেনে নেয় না। বহুল প্রতিক্ষিত যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব এগিয়ে নিয়ে তা সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা গ্রহণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান একটি আঞ্চলিক অণুঘটক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিজয়ী হিসেবে দাবি করেছে। এটি একটি উইন-উইন সিচুয়েশন। তবে ইরান কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন করে না। তারা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান চায়। বিশেষত ফিলিস্তিন ও লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসন ও সম্প্রসারণবাদী তৎপরতা চিরতরে বন্ধ হওয়া জরুরি। ইরানের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির খবর প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে বিশ্বে স্বস্তির আবহ দেখা দিয়েছে। তেলের মূল্য একদিনেই ১৫ শতাংশ কমে যাওয়ার মধ্য দিয়েই প্রমাণ হয়, ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে কতটা প্রভাবক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের শান্তি, হাজার হাজার বছরের সভ্যতার ঐতিহ্য ও নিরাপত্তা কোনো অহংকারী ও পাগলাটে যুদ্ধবাজের হাতে ছেড়ে দেয়া যায় না। একটি পারমাণবিক হুমকি থেকে শান্তির সন্ধিক্ষণে থাকা বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বসম্প্রদায়কে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তে আসতে হবে। অস্থায়ী যুদ্ধ বিরতিকে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পরিণত করতে কালক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews