মজুতদারি ও সিন্ডিকেট ব্যবসা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং মানবকল্যাণ বিরোধী একটি কার্যক্রম। এটি শুধু অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করে না, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় আদর্শের ওপর গুরুতর আঘাত হানে। মজুতদারি ও সিন্ডিকেট নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মিলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে দেয়, ফলে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খাদ্য, ওষুধ বা জ্বালানির মতো জরুরি পণ্যের দাম বেড়ে গেলে মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পণ্যের সরবরাহ কমিয়ে মানুষের দুর্ভোগ ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা স্পষ্ট জুলুম। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জুলুম থেকে বেঁচে থাক, কারণ জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকার হবে (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।’ আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা মানুষের জিনিসপত্র কম করে দিও না (সুরা আল-আ’রাফ : ৮৫)।’ এ আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায়, মানুষের অধিকার হরণ বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হারাম। অপর আয়াতে তিনি ঘোষণা করেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কর না (সুরা আল-বাকারা : ১৮৮)।’ সিন্ডিকেট ও অবৈধভাবে মজুতদারির মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়া অবশ্যই অন্যায়ভাবে ভক্ষণের অন্তর্ভুক্ত।

মজুতদারি ও সিন্ডিকেট মহাপাপব্যবসায় সিন্ডিকেট ও অবৈধ মজুতদারি সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি করে। ধনী শ্রেণি উচ্চমূল্যে পণ্য কিনতে পারলেও দরিদ্ররা তা ক্রয় করতে পারে না। ফলে ধনী-গরিবের ব্যবধান আরও বাড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে। ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থার কথা বলে, যেখানে ধনসম্পদ কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে না থেকে সবার মাঝে সুষমভাবে বণ্টিত হবে। সিন্ডিকেটব্যবস্থা এই নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যাতে সম্পদ শুধু তোমাদের ধনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে (সুরা আল-হাশর : ৭)।’ ইসলামি দৃষ্টিতে মজুতদারি একটি মারাত্মক পাপ। মানুষের কষ্ট ও বিপদের সুযোগ নিয়ে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ইসলামের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং অন্যায় ও শোষণ প্রতিরোধ করা। সিন্ডিকেট ও মজুতদারি এই মূলনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান করে। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি খাদ্যদ্রব্য মজুত করে রাখে, সে গুনাহগার (সহিহ মুসলিম)।’ আরও এসেছে : ‘গুনাহগার ছাড়া কেউ মজুতদারি করে না (সহিহ মুসলিম)।’ মজুতদারি ও সিন্ডিকেট বাজারব্যবস্থাকে ধ্বংস করে। একটি সুস্থ অর্থনীতির জন্য মুক্ত ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু সিন্ডিকেট গঠনের মাধ্যমে কিছু ব্যবসায়ী বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এবং অন্যদের প্রতিযোগিতা করার সুযোগ নষ্ট করে। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তারা বাজারে প্রবেশ করতে পারে না এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। সিন্ডিকেটমুক্ত বাজারব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ও ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতামূলক আগ্রহকে নষ্ট করে। অথচ ইসলাম মুক্ত ও ন্যায্য বাজারব্যবস্থা সমর্থন করে। সিন্ডিকেট এই স্বাভাবিক বাজারপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষকে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে দাও, আল্লাহ একে অপরের মাধ্যমে তাদের রিজিক দেন (সহিহ মুসলিম)।’ মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের কারণে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ঘটে। যখন সমাজে দেখা যায় যে অসাধু উপায়ে বিপুল মুনাফা অর্জন করা সম্ভব, তখন অনেকেই সৎ পথ ত্যাগ করে অসৎ পথে ঝুঁকে পড়ে। এতে সমাজে দুর্নীতি, প্রতারণা এবং অবিচার বৃদ্ধি পায়, নৈতিক অবক্ষয় ও দুর্নীতির প্রসার হয়। যা একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি কর না (সুরা আল-বাকারা : ৬০)।’ মজুতদারি ও সিন্ডিকেট রাষ্ট্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির কারণে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়, যা কখনো কখনো সামাজিক অস্থিরতা বা রাজনৈতিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা ইবাদতস্বরূপ, যদি তা সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে পরিচালিত হয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সত্যবাদী ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ কিন্তু সিন্ডিকেট ও মজুদদারি এই মহৎ মর্যাদা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে এবং তাকে জুলুমকারীদের কাতারে দাঁড় করায়। কোরআন ও হাদিসের আলোকে স্পষ্ট যে সিন্ডিকেট ও মজুতদারি শুধু অর্থনৈতিক অন্যায় নয়, বরং এটি জুলুম, ফ্যাসাদ ও হারাম উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত। এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক ব্যাধি। ইসলাম এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং সমাজব্যবস্থাও এটিকে সমর্থন করে না। ইসলামের মূল লক্ষ্য হলো ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব-এই অনৈতিক প্রথা প্রতিরোধ করা এবং ন্যায়ভিত্তিক বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা।

♦ লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews