‘এক মাসে যুদ্ধ হলো, ঈদ হলো, পূজা হলো… তারপরও মাসটা শেষ হলো না’ — সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন পোস্ট কি আপনার সামনে পড়েছে কখনো? যুদ্ধ-ঈদ-পূজা না হলেও কি কখনো একটা মাসকে অনেক লম্বা মনে হয়েছে আপনার কাছে? এমন অনুভূতি থেকে গোটা বিশ্বকে মুক্তি দেওয়ার খুব কাছেই চলে গিয়েছিল জাতিসংঘের পূর্বসূরি জাতিপুঞ্জ বা লিগ অফ নেশন্স। সেটা হয়ে গেলে বছরে আপনি চাকুরীজীবী হয়ে থাকলে বেতন পেতেন অন্তত ১৩ বার, মাস শেষ হতো ২৮ দিন ঘুরলেই। তবে শেষমেশ তা হয়নি ইহুদি এক ছাপাখানার মালিকের হস্তক্ষেপে।
ঘটনাটা ঘটেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরপর। পুরো বিশ্বকে একটি নতুন ক্যালেন্ডারের আওতায় আনার স্বপ্ন দেখেছিল লিগ অব নেশনস। ১৯২৩ সালে লিগ অব নেশনস ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিক্সড ক্যালেন্ডার’ বা আইএফসির প্রস্তাব নিয়ে কাজ শুরু করে। এই ক্যালেন্ডারে থাকত ১৩টি মাস, প্রতিটি মাসে ২৮ দিন। বাড়তি একটা মাস ঢুকতে পারত জুন আর জুলাইয়ের মাঝে, নাম হতো সোল। প্রতি মাস শুরু হতো রোববারে এবং শেষ হতো শনিবারে। বছরের শেষে একটি বাড়তি ‘বৈশ্বিক ছুটির দিন’ যোগ করে মোট ৩৬৫ দিন পূরণ হতো।
কোডাক ক্যামেরার প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ইস্টম্যানসহ ব্যবসায়ী মহলে এই প্রস্তাব ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ১৪০টিরও বেশি মার্কিন কোম্পানি নিজেদের ব্যবসায় এই ১৩ মাসের ক্যালেন্ডার ব্যবহার শুরু করেছিল।
কিন্তু বিপত্তিটা বাধে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের জন্য। ১৩ মাসের এই পরিকল্পনা বড় সমস্যা তৈরি করত। কারণ বৈশ্বিক ছুটির দিনটাকে কোনো বারে ফেলা হতো না। ইহুদি ধর্মে প্রতি সাত দিন পরপর সাবাথ বা বিশ্রামের দিন পালন করা হয়। নতুন ক্যালেন্ডারে বাড়তি ‘ফাঁকা দিন’ যোগ হওয়ায় এই সাত দিনের চক্র ভেঙে যেত এবং সাবাথ সপ্তাহের ভিন্ন ভিন্ন দিনে পড়ত।
১৯৩১ সালের অক্টোবরে জেনেভায় লিগ অব নেশনসের সম্মেলনে আইএফসি পাসের বিষয়টি কার্যত নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছিল। ইংল্যান্ডের প্রধান র্যাবাই জোসেফ হার্টজ ধর্মীয় যুক্তি তুলে ধরলেও তা প্রথমে উপেক্ষিত হয়। তখন হার্টজ তার সঙ্গে নিয়ে আসেন আর্থার আই লেভাইন নামের এক সাধারণ ইহুদি ছাপাখানার মালিককে।
লেভাইন ধর্মীয় নয়, ব্যবহারিক যুক্তি দিয়ে সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে যত বিমা চুক্তি, মাসিক বা ত্রৈমাসিক হার, বন্ড ও আর্থিক চুক্তি রয়েছে সেগুলো সবই নতুন করে লিখতে হবে। মামলা-মোকদ্দমার শেষ থাকবে না। তা ছাড়া ‘১৩’ একটি মৌলিক সংখ্যা, যা ভাঙলে ভগ্নাংশ আসে, ফলে প্রতিদিনের হিসাব জটিল হয়ে পড়বে।
তার বক্তব্য সম্মেলনের মনোভাবে পরিবর্তন আনে। শুরুতে হালে পানি না পেলেও ব্যবহারিক যুক্তি সামনে আসার পর সপ্তম দিনের অ্যাডভেন্টিস্টরাও সাবাথ নিয়ে আপত্তি তোলেন। ইস্টার কোন দিন পড়বে তা নিয়ে ফিনল্যান্ড, নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ড আলাদা আলাদা অবস্থান নেয়। কলম্বিয়ার প্রতিনিধি ভ্যাটিকানের আপত্তির চিঠি তুলে ধরেন।
বিষয়টা অবশ্য অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারত। সে সমস্যারও একটা সমাধান হতে পারত রোববারকে মাসের শুরু হতেই হবে, এই বাধ্যবাধকতা থেকে সরে এলে। এখন যেমন মাসের শুরুর বার যে কোনো দিন হতে পারে, তখনও তাই হতো।
তখন এই সমাধান নিয়ে কোনো আলাপের খবরই মেলেনি, ফলে ধরে নেওয়া যায় এই সমাধান কারো ভাবনায় আসেনি। ফলে শেষ পর্যন্ত আইএফসির সেই ১৩ মাসে বছরের প্রস্তাব মাঠে মারা যায়, আর আমাকে আপনাকেও এখন বছরে ১২ মাসের বেতনে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।