জসিম উদ্দিন মনছুরি
বিগত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করেছেন। সরকারের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান। তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন অতিবাহিত করার পর অবশেষে দেশে ফেরার দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন। বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে বিরোধী দল ও মতের উপর ব্যাপক নির্যাতন, নিপীডন ও স্বেচ্ছাচারিতা জনগণকে অতিষ্ঠি করে তোলে। ছিলো না জনগণের বাকস্বাধীনতা, স্বাধীনভাবে চলাচল এবং বঞ্চিত হতে হয়েছে নাগরিক সুবিধা থেকে। ফলে জনগণ অতিষ্ঠ হয়েছে সরকারি দলের সীমাহীন নির্যাতন ও জুলুমের শিকার হয়ে। ছাত্র-জনতার দুর্বার আন্দোলনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় স্বৈরাচারী সরকারের। স্বৈরাচারী শাসনামলে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকেও মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। যার পরিণতিতে তিনি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে অবশেষে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগেই ইন্তিকাল করেন। তার ইন্তিকালে শোকাহত হয়েছেন সারাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ। তার জানাযা ধরা হয় ঢাকার বুকে অন্যতম একটি বড় জানাযা । দেশের আপামর জনগণ অশ্রুসিক্ত নয়নে তাদের প্রিয় নেত্রীকে বিদায় জানান। অবশেষে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে আপসহীন নেত্রীকে সমাহিত করা হয়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দুইটি জোট থাকলেও বিএনপি জোটকেই জনগণ বেছে নিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে ৩১ দফা সম্বলিত বেশ কয়েকটি আশা জাগানিয়া প্রতিশ্রুতি জনগণকে দিয়ে গেছেন। এবার যেহেতু আপনারা সরকার গঠন করেছেন এখন জনগণের ভাগ্যেন্নয়নে প্রতিশ্রুতি পূরণের পালা।
প্রতিশ্রুতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো একটি স্বনির্ভর ক্ষুধামুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার। চাঁদাবাজদের দমন, সিন্ডিকেটের অবসান, দারিদ্র্য নির্মূলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা। হিংসা বিদ্বেষ রেষারেষি দূর করে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা। আপনার উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি ছিল চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা। এবং ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে ৫০ কোটি গাছ লাগানো।
প্রতিশ্রুতি যাহোক না কেন জনগণ আশা করে আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি জনকল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। বিশেষ করে চাঁদাবাজি দূর করে সিন্ডিকেট ব্যবসার অবসান হবে। মাদকদ্রব্য সমূলে নির্মূল করা এবং সর্বোপরি মানুষ বাক স্বাধীনতা ও স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার ফিরে পাবে। বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে সোশ্যাল মিডিয়ার উপর কঠোর নজরদারি এবং স্বাধীন মতামতের উপর কঠিনভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। আশা করি আপনার সরকার এ বিষয়টি মাথায় রেখে সোশ্যাল মিডিয়াসহ গণমাধ্যমের স্বাধীন মতামতের উপর কঠোরতা আরোপ করবেন না। জনগণকে স্বাধীন মতামতের সুযোগ প্রদান এবং নিরপেক্ষভাবে আপনার সরকার সকল জনগণের জন্য সম অধিকার নিশ্চিত করবে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট ব্যবসার অবসান ঘটানো। বিএনপি সমর্থিত জোটের সরকার গঠন করার পরেও এখনো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চাঁদাবাজির খবরাখবর চাউর হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বিএনপি নামধারী কিছু নেতা কর্মী আইনকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত ছিলো। আশা করি আপনি কঠোর ভাবে সকল চাঁদাবাজদের দমন করে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবেন। চাঁদাবাজদের কোন দল থাকেনা, কোন মত থাকে না, তাদের দল ও মতই হচ্ছে চাঁদাবাজি। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসুক না কেন সেই দলের সুবিধা ভোগ করে চাঁদাবাজিতে অংশগ্রহণ করাই হচ্ছে তাদের ধর্ম । সুতরাং আপনি সকল চাঁদাবাজকে সমান দৃষ্টিতে দেখে তাদেরকে সমূলে নির্মূল করার কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
তাছাড়া আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে একেক সময় একেকটি পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে এবং পণ্যের অব্যবস্থাপনায় ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি হওয়ায় জনগণ অতিষ্ঠ হয়। বিশেষ করে রমযান মাস আসলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে জনগণকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। আশা করি আপনি প্রথম থেকে এই বিষয়টা মাথায় রেখে কঠোরভাবে বাজার নজরদারি ,কালোবাজারি, সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে জনগণের দুর্দশা লাঘবে সচেষ্ট হবেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ১১ মাস ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করলেও রমযান মাসে ন্যায্য মূল্যে ব্যবসা করে থাকেন। বাংলাদেশের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে ১১ মাস ব্যবসা করলেও রমযানের জন্য অপেক্ষায় থাকেন ব্যবসায়ীরা। রমযান আসলেই বাজারকারসাজি করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়। এই মুহূর্তে জনগণ আপনার কাছ থেকে আশা করে আপনি আইনশৃঙ্খলা উন্নতির দিকে মনোযোগী হবেন এবং চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের নির্মূল করবেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে সিন্ডিকেটদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনবেন। আপনার প্রতি জনগণ আস্থা রেখেছেন বিধায় আপনি জনরায়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। এবার আপনার প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের মূল্য দেবার পালা। আপনি আপনার দেওয়া প্রতিশ্রুতি আশা করি জনস্বার্থে, জনকল্যাণে প্রতিফলন ঘটাতে উদ্যোগী হবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার প্রতি জনগণের এই মুহূর্তে প্রত্যাশা আপনি ভঙ্গুর অর্থনীতির এই দেশকে আপনার ম্যাজিক্যাল সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। বিশেষ করে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করে সকল দলের সকল মতের জন্য একই আইন কার্যকর করবেন। বিশেষ করে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের নির্মূল করে একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ গঠনে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করবেন। আশা করি আপনি মরহুম শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের পথ অনুসরণ করবেন। জনগণের এমতই প্রত্যাশা।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।