জাতীয় সংসদ হোক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু

জাতীয় সংসদ হোক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু

আবসার মাহফুজ

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ১:৫৩ অপরাহ্ণ

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল নির্বাচনে নয়, বরং নির্বাচনের পর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নিহিত থাকে। একটি রাষ্ট্রে নির্বাচন যেমন জনমতের প্রতিফলন, তেমনি জাতীয় সংসদ সেই জনমতের ধারাবাহিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ। তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, তার সাফল্য নির্ভর করবে জাতীয় সংসদকে আমরা কতটা রাজনীতির কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে পারি তার ওপর।

গণতন্ত্রের ধারণাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর তিনটি মৌলিক স্তম্ভ-জনপ্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহি ও আইনের শাসন। এই তিনটিরই মিলনস্থল জাতীয় সংসদ। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল মানুষকে ‘রাজনৈতিক প্রাণী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর মতে, নাগরিকেরা যখন পরামর্শ, বিতর্ক ও সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়, তখনই প্রকৃত রাজনীতি বিকশিত হয়। সেই অর্থে সংসদ হলো আধুনিক নগররাষ্ট্রের আগোরা-যেখানে মতের সংঘাত ও সমন্বয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ঘটে।
জন লকের সামাজিক চুক্তি তত্ত্বে জনগণ তাদের স্বাভাবিক অধিকার রক্ষার জন্য রাষ্ট্রকে ক্ষমতা অর্পণ করে। কিন্তু সেই ক্ষমতা সীমাহীন নয়; এটি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। এই দায়বদ্ধতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ সংসদীয় ব্যবস্থায় স্পষ্টতর হয়। সংসদ সরকারের ওপর নজরদারি করে, বাজেট অনুমোদন করে, আইন প্রণয়ন করে এবং প্রয়োজন হলে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করে। ফলে সংসদ কেবল আইন তৈরির কারখানা নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র।
মঁতেস্কিয়ুর ক্ষমতার বিভাজন তত্ত্ব অনুযায়ী- নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগ-এই তিনটি অঙ্গের ভারসাম্যই স্বাধীনতা রক্ষার মূল শর্ত। যখন নির্বাহী বিভাগ অতি-প্রভাবশালী হয়ে ওঠে এবং আইনসভা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন গণতন্ত্রের ভিত কেঁপে ওঠে। আমাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক সময় সংসদ কার্যকর বিতর্কের ক্ষেত্র না হয়ে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বিরোধীদলের অনুপস্থিতি, বর্জন, কিংবা কণ্ঠরোধ-এসব প্রবণতা সংসদকে দুর্বল করেছে। এর ফলে রাজনীতি সরে গেছে সংসদ ভবনের বাইরেÑরাস্তায়, সামাজিক মাধ্যমে কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বলয়ে।
জ্যাঁ জাক রুশো সাধারণ ইচ্ছার কথা বলেছেন- যা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমষ্টিগত কল্যাণকে ধারণ করে। কিন্তু সেই সাধারণ ইচ্ছা আবিষ্কারের উপায় কী? আধুনিক গণতন্ত্রে তার উত্তর হলো প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদীয় প্রক্রিয়া। বিভিন্ন মত, মতাদর্শ ও স্বার্থের প্রতিনিধিরা যখন যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে ঐকমত্য বা সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে পৌঁছান, তখনই সাধারণ ইচ্ছার কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব হয়। সংসদকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে সাধারণ ইচ্ছা বিকৃত হয়, দলীয় বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়।
এডমন্ড বার্ক সংসদ সদস্যকে কেবল নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে দেখেননি; তিনি তাঁদের জাতির প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁর মতে, একজন সংসদ সদস্য কেবল ভোটারের নির্দেশ মানার যন্ত্র নন; বরং তিনি নিজের বিবেক ও বিচারবুদ্ধি দিয়ে জাতির কল্যাণে সিদ্ধান্ত নেবেন। এই ধারণা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সংসদীয় রাজনীতি কেবল দলীয় আনুগত্যের খেলা নয়; এটি নৈতিক দায়িত্বেরও ক্ষেত্র।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংসদকে রাজনীতির কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করতে হলে কয়েকটি মৌলিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রথমত, যুক্তিপূর্ণ বিতর্কের সংস্কৃতি। বিরোধিতা মানেই শত্রুতা নয়-এই বোধ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। গণতন্ত্রে মতপার্থক্য স্বাভাবিক; বরং মতপার্থক্যের মধ্য দিয়েই নীতির উৎকর্ষ ঘটে। জন স্টুয়ার্ট মিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সত্যের অনুসন্ধানের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, ভিন্নমত দমিয়ে দিলে সত্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংসদে যদি ভিন্নমত প্রকাশের অবকাশ সংকুচিত হয়, তাহলে আইন প্রণয়ন হবে একপেশে, নীতিনির্ধারণ হবে ত্রুটিপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, কমিটি পদ্ধতির শক্তিশালীকরণ। উন্নত সংসদীয় গণতন্ত্রে স্থায়ী কমিটিগুলো নীতিনির্ধারণে গভীর গবেষণা ও বিশ্লেষণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ, জনশুনানি আয়োজন এবং মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা- এসবের মাধ্যমে সংসদ বাস্তবিক অর্থে নীতি-নিরীক্ষক হিসেবে কাজ করে। আমাদের সংসদীয় কমিটিগুলোকে দলীয় আনুগত্যের বাইরে এনে পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার ভিত্তিতে পরিচালিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রশ্নোত্তর পর্বকে কার্যকর করা। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের নিয়মিত ও অর্থবহ জবাবদিহি নিশ্চিত করা হলে সংসদের মর্যাদা বাড়ে। প্রশ্নোত্তর পর্ব যদি কেবল লিখিত জবাবের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির উদ্দেশ্য পূরণ করে না। চতুর্থত, সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি পরিহার। বিরোধীদল যদি সংসদকে অকার্যকর মনে করে রাস্তায় রাজনীতি করে, তবে সংসদ দুর্বল হয় এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ে। আবার সরকার যদি বিরোধী কণ্ঠকে গুরুত্ব না দেয়, তবে সংসদে থাকার প্রণোদনাও কমে যায়। এই দ্বিমুখী সংকট কাটাতে হলে উভয় পক্ষের দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য।
হান্না আরেন্ট রাজনীতিকে ‘কর্ম ও বাক্যের প্রকাশ্য ক্ষেত্র’ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, রাজনীতি তখনই অর্থবহ হয় যখন তা উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক হয়। সংসদ সেই উন্মুক্ত ক্ষেত্রের আধুনিক প্রতিরূপ। এখানে নাগরিকেরা প্রত্যক্ষভাবে না থাকলেও তাঁদের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেন। তাই সংসদের কার্যক্রম স্বচ্ছ ও গণমাধ্যমে উন্মুক্ত রাখা জরুরি।
সংসদকে রাজনীতির কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করার আরেকটি শর্ত হলো দলীয় গণতন্ত্রের বিকাশ। রাজনৈতিক দলগুলো যদি অভ্যন্তরীণভাবে গণতান্ত্রিক না হয়, তবে তাদের সংসদীয় আচরণও গণতান্ত্রিক হবে না। প্রার্থী নির্বাচন, নীতি নির্ধারণ ও নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা না থাকলে সংসদ সদস্যরা স্বাধীন মতপ্রকাশে সংকুচিত থাকেন। দলীয় হুইপের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা যেন চিন্তার স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণরূপে স্তব্ধ না করে।
এখানে জার্গেন হাবারমাসের আলোচনামূলক গণতন্ত্রের ধারণা প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, যুক্তিসংগত আলোচনার মাধ্যমে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণই গণতন্ত্রের প্রাণ। সংসদ যদি যুক্তিনির্ভর আলোচনার মঞ্চে পরিণত হয়, তবে তা কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইন পাশের স্থানে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং নৈতিক বৈধতাও অর্জন করবে।
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংসদের ভ‚মিকা কখনো উজ্জ্বল, কখনো ম্লান। সামরিক শাসন, একদলীয় প্রবণতা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইত্যাদি নানা অধ্যায়ে সংসদ কখনো প্রান্তিক হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণ ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতির কাছে ফিরে এসেছে। এই প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে-জনগণ সংসদীয় কাঠামোকেই টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচনা করে।
সংসদকে কার্যকর করতে হলে অর্থনৈতিক নীতি, মানবাধিকার, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য- সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সংসদীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। বাজেট পাসের আগে বিস্তারিত বিতর্ক, সংশোধনী প্রস্তাবের সুযোগ এবং নাগরিক সমাজের মতামত গ্রহণ- এসব প্রক্রিয়া সংসদকে জীবন্ত করে তোলে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তরুণ ও নারীদের অংশগ্রহণ। প্রতিনিধিত্ব কেবল সংখ্যার বিষয় নয়; এটি অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির বৈচিত্র্যের প্রশ্ন। সংসদে যদি সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষা এবং সমাজের বহুমাত্রিক বাস্তবতা প্রতিফলিত না হয়, তবে নীতিনির্ধারণও একপেশে হবে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা।
জাতীয় সংসদকে রাজনীতির কেন্দ্র বানাতে গণমাধ্যমেরও ভ‚মিকা আছে। সংসদীয় বিতর্ককে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন এবং জনপ্রতিনিধিদের কার্যক্রমের মূল্যায়ন- এসবের মাধ্যমে জনমত গঠিত হয়। নাগরিকেরা যদি জানেন তাঁদের প্রতিনিধি কী বলছেন ও করছেন, তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ে।
এখানে আলেক্সিস দ্য তোকভিলের পর্যবেক্ষণ স্মরণীয়। তিনি গণতন্ত্রের সাফল্যকে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল মনে করেননি; বরং নাগরিক সংস্কৃতি ও অংশগ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। সংসদকে কেন্দ্র করে যদি নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়, তবে গণতন্ত্র গভীর হয়।
জাতীয় সংসদকে রাজনীতির কেন্দ্র করার প্রশ্নটি ক্ষমতার প্রশ্নও বটে। নির্বাহী বিভাগের প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে, কারণ প্রশাসন ও নীতির বাস্তবায়ন তার হাতে। কিন্তু সংসদ যদি কেবল অনুমোদনকারী সংস্থায় পরিণত হয়, তবে ভারসাম্য নষ্ট হয়। আইন প্রণয়ন, নীতি পর্যালোচনা ও জবাবদিহির মাধ্যমে সংসদকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ১৭ মাস পরে হলেও অবাধ, সুষ্ঠু ও পরিচ্ছন্নভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সূচনার সুযোগ এসেছে দেশে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে সংসদকে মর্যাদার আসনে বসাতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য সংসদেই সমাধান হোক, সাংবিধানিক প্রশ্ন সংসদেই আলোচিত হোক, জাতীয় সংকটের সমাধান সংসদ থেকেই বেরিয়ে আসুক-এটাই প্রত্যাশা।
মনে রাখতে হবে- রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হলে সংসদকেই হতে হবে প্রধান মঞ্চ। বিতর্ক, সমঝোতা, মতভেদ ও ঐকমত্য-সবকিছুর সংগঠিত রূপই সংসদ। এখানেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রচিত হয়। আমরা আশা করতে চাই- নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে সংসদকে ঘিরেই গড়ে উঠবে নীতিনির্ধারণের সংস্কৃতি। রাস্তায় নয়, সংঘাতে নয়, বরং যুক্তি ও আলোচনায়Ñএই হোক আমাদের রাজনীতির পথ। সংসদ যদি শক্তিশালী হয়, তবে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে; সংসদ যদি প্রাণবন্ত হয়, তবে রাষ্ট্রও প্রাণবন্ত হবে। আর সংসদ যদি রাজনীতির কেন্দ্র হয়, তবে জনগণের আকাক্সক্ষাই হবে রাষ্ট্রনীতির চালিকাশক্তি।

লেখক: সাংবাদিক, গ্রন্থকার; নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিটিক্যাল স্টাডিজ এন্ড রিসার্চ (সিপিএসআর)

পূর্বকোণ/ইবনুর



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews