সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার ‘চাউলধনী হাওড়ে’ টানা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত কৃষকের স্বপ্নের বোরো ধান! এ হাওড়ে প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেন কৃষকরা। যেখান থেকে কয়েক হাজার টন ধান উৎপাদন করা হয়। কিন্তু কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে এ হাওড়ে তলিয়ে গেছে কৃষকদের কষ্টের ফসল। প্রায় ১২ দিন ধরে হাওড়ে ৭৫ শতাংশ বোরো ধান ২-৩ ফুট পানির নিচে রয়েছে। এসব ধান কাটতে না পারায় কৃষকদের দিন কাটছে চরম হতাশায়। আর বৃষ্টির আগে কিছু ধান কাটা হলেও রোদ না থাকায় এসব ধান শুকাতে পারছেন না কৃষক। ফলে শত শত মন ধানে চারা গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে। কিশোরগঞ্জের হাওড়ে অর্ধ লাখ বোরো চাষির সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ২৫৯ কোটি টাকার ফসলহানি হয়েছে। টানা বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া শেষে দুই দিন ধরে সুনামগঞ্জের হাওড়ে ঝলমলে রোদ বিরাজ করছে। আর রোদের দেখা পেয়ে কৃষক-কৃষাণীরা ধান শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়া হাওড়, মই হাওড় ও পিংলার হাওড়সহ ছোট-বড় ১৫টি হাওড় এখন পানির নিচে। কৃষকরা পানির নিচ থেকে ধান তোলার চেষ্টা করছেন। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
বিশ্বনাথ (সিলেট) : বিশ্বনাথ উপজেলার ‘চাউলধনী হাওড়ে’ সময়মতো বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হতো তাহলে পানিতে তলিয়ে ধান নষ্ট হতো না বলে দাবি করছেন কৃষকরা। হাওড় পাড়ের কৃষকদের দাবি যদি বন্যায় তাদের ধান নষ্ট হতো তাহলে মনকে একটু সান্ত্বনা দিতে পারতেন। কিন্তু বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতায় ধান নষ্টের ফলে সহ্য করতে পারছেন না। প্রায় সাড়ে ৩ বছর আগে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে পানি অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন দেখিয়ে একটি আবেদন করা হয়। কিন্তু এই আবেদনের কোনো সুফল পাননি কৃষকরা। ২০২১-২২ অর্থবছরে মৎস্য আহরণের জন্য হাওড়ের বিল ও গর্ত খননের জন্য প্রায় ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। হাওড়ে নামমাত্র আর লোক দেখানো এই খননে কৃষকের কোনো উপকারে আসেনি। এতে খননের ৬৫ লাখ টাকাই জলে চলে গেছে। কিন্তু চাউলধনী হাওড়ে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন বা পানি আহরণের জন্য সরকার থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ওই হাওড় থেকে মাকুন্দা নদী ও চরচন্ডি নদী ছাড়াও বিভিন্ন দিক থেকে সংযোগ বেশ কয়েকটি খাল রয়েছে। এসকল খাল খননের অভাবে ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে পড়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিল্লাল হোসেন বলেন, তিনি হাওড়ের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। তবে তার দাবি এ বছর চালধনী হাওড়ে ১০২০ হেক্টর বোরো আবাদ হয়েছে, আর ৯৫ হেক্টর বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। বাকি ধানগুলো কৃষকরা বৃষ্টির আগেই কেটে ফেলেছেন।
কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জে ৫০ হাজারেরও বেশি বোরো চাষির ২৫৯ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসলহানি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে এ ক্ষয়ক্ষতির অসম্পূর্ণ চলমান প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। সম্পূর্ণ প্রতিবেদনে এ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও বেড়ে যাবে বলেও জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। বুধবার দুপুরে কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে এমন ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরা হয়। কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামার বাড়ি) এ তথ্যমতে, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলসহ জেলার ১৩টি উপজেলায় উঠতি বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতির এ চিত্র সামনে উঠে এসেছে। কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, সোমবার পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ক্ষয়ক্ষতির এমন তথ্য মিলেছে। আর এ হিসাব শেষ হতে না হতে আরও প্রায় দেড় হাজার হেক্টর বোরো ধান নতুন করে পানিতে তলিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কাজ এখনো চলমান রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সুনামগঞ্জ ও জগন্নাথপুর : রোদের দেখা পেয়ে সুনামগঞ্জের কৃষক-কৃষাণীরা ধান শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। যেন এক মুহূর্তের ফুরসত নেই তাদের। পরিবারের সবাইকে নিয়ে নেমে পড়েছেন ধানের খলায়। ভেজা ধান, চারা গজানো ধান রোদে এক ধরনের দুর্গন্ধ ছড়ালেও সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তাদের। তাদের একটাই কথা, যাই আছে তা দিয়ে সারা বছর না পারি কিছুদিন অন্তত খেতে হবে। সরেজমিন হাওড়ে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের পাশে রোদে ধান শুকাচ্ছেন। হাওড়ের পাশে খলায় খলায় নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ সবাই ধান শুকানোতে ব্যস্ত।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রাথমিকভাবে জেলার দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমির মধ্যে ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমি পানিতে ডুবে গেছে। এর মধ্যে চূড়ান্ত ক্ষতি হয়েছে ১৬ হাজার ৪০১ হেক্টর জমির। ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক চারশ কোটি টাকা হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা নির্ধারণে কাজ চলছে, তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর সঠিক সংখ্যা জানা যাবে।
এদিকে জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়া হাওড়, মই হাওড় ও পিংলার হাওড়সহ ছোট-বড় ১৫টি হাওড়ই এখন পানির নিচে। উপজেলা কৃষি অফিসের পরিসংখ্যানের চেয়েও মাঠের বস্তব চিত্র ভিন্ন। প্রায় ২১ হাজার হেক্টর জমিতে ফলানো বোর ধানের প্রায় অর্ধেক ফসলই তলিয়ে যায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কাওসার আহমেদ বলেন, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, দ্রুত ধান ঘরে তোলার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।