দেশের সাতটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান নিয়োগে পুরনো চর্চা থেকে বের হতে পারেনি বিএনপি। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মতে নতুন নির্বাচিত বিএনপি সরকারও পতিত আওয়ামী লীগের দেখানো পথেই হাঁটছে। বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগে দলটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার এমনকি দলের ৩১ দফাকে বৃদ্ধাঙ্গলি প্রদর্শন করেছে। শিক্ষাঙ্গনে মেধা এবং দক্ষতাকে যেখানে প্রধানতম বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখার কথা সেখানে দলীয় লোকজনকে নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গনে আবারো দলীয় এবং লেজুড়ভিত্তিক অধ্যায়কে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলেও মত দিয়েছেন শিক্ষাবিদদের অনেকেই। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও ‘বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ এবং ‘সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ, দক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার’ কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এখন ভিসি নিয়োগ প্রক্রিয়াতে সব কিছুকে পাশ কাটিয়ে চলা শুরু করেছে বিএনপি।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে গত ১৭ বছরে দেশের প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে যেভাবে দলীয় লোকজন নিয়োগ দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশকে কলুষিত করা হয়েছিল গত ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর সবার ধারণা ছিল শিক্ষাঙ্গনে হয়তো অতীতের সেই কলঙ্কিত অধ্যায়ের আর কোনো সূত্রপাত হবে না। বড় বড় পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে দক্ষ ও যোগ্য এবং মেধাবী শিক্ষকদেরই শীর্ষ পদে নিয়োগ দেয়া হবে। কিন্তু গত ১৬ মার্চ দেশের শীর্ষ সাতটি পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় এবং বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান পদে যেভাবে দলীয় পদধারী শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে সেখানে অতীতের কলুষিত অধ্যায়েরই পুনঃসূচনা করা হয়েছে বলে মনে করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তার মতে, বর্তমান সরকার নির্বাচিত। তারা অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে, নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া তৈরি করবে, এটা মানুষ প্রত্যাশা করতেই পারে। কিন্তু যেভাবে নিয়োগ হচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে, তারাও অতীতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতেই বেশি আগ্রহী। এমন হতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে যে ধস দেখা যাচ্ছে, তা থেকে বের হওয়ার রাস্তা পাওয়া যাবে না। এটা লক্ষণ হিসেবে খারাপ।
এদিকে গত সোমবার বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ে নতুন ভিসি নিয়োগের খবর প্রকাশিত হওয়ার পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন তার ফেসজবুকে লিখেছেন শিক্ষাঙ্গনে এখন কী চমৎকার ‘অরাজনৈতিক’ নিয়োগ চলছে! দলীয়করণের বদলে যোগ্যতাকে নাকি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, আর সেই যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি হলো কে কত বড় দলীয় লোক। এমন জাদুকরী রাজনৈতিক নিয়োগ দেখে চরম হতাশা প্রকাশ ছাড়া কিছু করার নেই যা আসলে দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার এক চরম করুণ পরিণতি। ঢাবির এই শিক্ষক আরো লিখেছেন, বিএনপির চেয়ারম্যান নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষাকে দলীয়করণের ঊর্ধ্বে রাখার কড়া নির্দেশনা দিয়েছিলেন, আর এখন সেই নির্দেশনার কী দারুণ বাস্তবায়নই না চলছে! মুখে বড় বড় কথা বললেও বাস্তবে এই দলীয় নিয়োগগুলোই সেই নির্দেশনার আসল ‘নমুনা’। তিনি লিখেছেন, রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ার নামে এ যেন সাধারণ মানুষের চোখের সামনে এক চমৎকার প্রহসন মঞ্চস্থ হচ্ছে!
শিক্ষা এবং বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে সংশ্লিষ্টদের মতে বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসি নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, যোগ্যতা উপেক্ষা, এবং প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার কারণে সব সময়েই বিতর্কিত। তবে এবারে ২০২৪ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ভিন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটনা ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো। অতীতে দেখা গেছে শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের উচ্চ পদে আসীন করা নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, আন্দোলন ও নিয়োগ বাতিলের দাবির ঘটনা প্রায়শই ঘটেছে। প্রায়শই দেখা গেছে রাজনৈতিক বিবেচনা ও দলীয়করণের রাজনীতিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বা দলীয় পরিচয়কে ভিসি নিয়োগে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এমন অভিযোগও রয়েছে যে, অযোগ্য বা কম যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকদের ভিসি করা হয় এবং নিয়োগে ব্যাপক স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেয়া হয়, এমনকি পূর্বে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও ভিসি পদে নিযুক্ত হয়েছেন।
আবার রেজিস্ট্রার বা কর্মকর্তাদের ভিসি নিয়োগের মতো ঘটনা শিক্ষক সমিতিগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়েছে। নিকট অতীতেও ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতি বা প্যানেল পদ্ধতি অনুসরণ না করে সরাসরি বা ‘ইচ্ছামতো’ নিয়োগ দেয়ার অভিযোগও বহুবার এসেছে। এই পরিস্থিতেতে বিতর্কিত নিয়োগের পর শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, সংঘর্ষ এবং ভিসি পদত্যাগের দাবির মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বিএনপি বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করার পর মাত্র এক মাসের সময়ের মধ্যেই একসাথে সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগের পর এই বিতর্ক পুনরায় সামনে এসেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং মেধাভিত্তিক না হলে তা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিবেশ ও শিক্ষার গুণমান নষ্ট করে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এদিকে মাত্র একদিন আগে দেশের প্রথম সারির সাত বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি ও বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান পদে নতুন নিয়োগ দিয়েছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংবাদ সম্মেলন করে নতুন নিয়োগ পাওয়া ভিসি ও চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) বর্তমান ভিসি অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক মামুন আহমেদ। বিএনপি সরকার সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে, তাদের একজন দলের পদে রয়েছেন। বাকি ছয়জন বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতা। অতীতেও এভাবে দলের অনুগত শিক্ষকদের সংগঠনের নেতাদের ভিসি নিয়োগ দেয়া হতো। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পদ পেতে শিক্ষক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়তেন। আশা করা হয়েছিল, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এ ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসবে। তবে তা আসেনি।
ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগের মূল বিধান অনুযায়ী সিনেটে নির্বাচিত তিন সদস্যের প্যানেল থেকে একজনকে নিয়োগ দেয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়াও ঠিকমতো অনুসৃত হয় না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক। পাশাপাশি তিনি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রইস উদ্দিন। তিনি বর্তমানে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ পাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ মাছুদ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে কুয়েটের ভিসি করা হয়েছিল। তবে আন্দোলনের মুখে পরে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। এখন আবার তিনিই ভিসি হয়েছেন।
দলীয় এবং রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত শিক্ষকদের বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সাংবাদিকদের বলেছেন একজন লোকের রাজনীতি করা কি অপরাধ?’ শিক্ষাগত যোগ্যতাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সর্বোচ্চ ‘পারফরম্যান্স’ দেখে বিশ্ববিদ্যালয় অনুযায়ী নিয়োগ দেয়া হয়েছে।