রাশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনিকে বিষাক্ত ডার্ট ফ্রগের বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাজ্য ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা।

নাভালনির হত্যাকাণ্ডের জন্য পুতিন প্রশাসনকে দায়ী করা হলেও অভিযোগ অস্বীকার করেছে ক্রেমলিন।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত নাভালনির মৃত্যু হয় দুই বছর আগে সাইবেরিয়ার একটি কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায়। তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৭ বছর।

তিনি ‘হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ করে মারা গেছেন’ বলে রুশ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

কিন্তু তার শরীরে পাওয়া উপাদানের নমুনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর যুক্তরাজ্য ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা জানিয়েছে, নাভালনির শরীরে ডার্ট ফ্রগের এপিবাটিডিন বিষ পাওয়া গেছে।

জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা সম্মেলনে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেন, ‘রাশিয়ার কারাগারে নাভালনি বন্দি থাকা অবস্থায় এই বিষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেবল রুশ সরকারেরই সক্ষমতা, উদ্দেশ্য এবং সুযোগ ছিল।’

যদিও যুক্তরাজ্য ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই বলে দাবি করেছে রাশিয়া। বিষয়টি ‘ইনফরমেশন ক্যাম্পেইন বা প্রচারণা’ বলে দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা তাসে প্রকাশিত খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী কুপার বলেছেন, পুতিন প্রশাসন নাভালনিকে ‘হুমকি হিসেবে দেখতো’। কাজেই তাদের হস্তক্ষেপ ব্যতিত নাভালনির শরীরে এপিবাটিডিন বিষ যাওয়ার অন্য কোনো ব্যাখ্যা নেই।

নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়া বার বার দাবি করে আসছিলেন, তার স্বামীকে বিষ দিয়ে হত্যা করেছে রাশিয়া।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার গত শনিবার মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে নাভালনির বিধবা স্ত্রী নাভালনায়ার সাথে দেখা করেন।

তিনি বলেন, এপিবাটিডিনের মতো একটি প্রাণঘাতী বিষ ব্যবহার করার মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধিতার প্রতি পুতিন সরকারের যে প্রবল ভয় রয়েছে, সেটি আবার স্পষ্ট হয়েছে।

বিরোধী মত দমনে রুশ সরকার যে নানা রকমের ‘ঘৃণ্য হাতিয়ার’ ব্যবহার করছে, সেই বিষয়টিও প্রকাশ্যে এসেছে বলে মন্তব্য করেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ক্রেমলিনকে দায়ী করে যৌথ বিবৃতি

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ডার্ট ফ্রগ হলো এক ধরনের ছোট আকারের, উজ্জ্বল রঙের ব্যাঙ যা মূলত মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার রেইনফরেস্টে পাওয়া যায়।

এদের শরীরের ত্বকে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাকৃতিক বিষ থাকে। আদিম যুগে শিকারিরা এই বিষ তীরের অগ্রভাগে ব্যবহার করে শিকার করতো বলে জানা যায়।

নাভালনির শরীরে এপিবাটিডিন বিষ পাওয়া গেছে, যা প্রাণঘাতী ডার্ট ফ্রগ থেকে পাওয়া অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাকৃতিক বিষ।

এই বিষ “মরফিনের চেয়েও দুই শ’ গুণ বেশি শক্তিশালী” বলে বিবিসি রাশিয়াকে জানিয়েছেন বিষবিদ্যা বিশেষজ্ঞ জিল জনসন।

বিষ প্রয়োগে অ্যালেক্সেই নাভালনির মৃত্যু নিয়ে যুক্তরাজ্য, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস একটি যৌথ বিবৃতিও প্রকাশ করেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সাইবেরিয়ার একটি জেল কলোনিতে বন্দি থাকার সময় নাভালনির ওপর মারাত্মক ওই বিষ প্রয়োগ করার সক্ষমতা, উদ্দেশ্য ও সুযোগ ছিল কেবল রুশ সরকারেরই কাছেই ছিল এবং আমরা তার মৃত্যুর জন্য রাশিয়াকে দায়ী মনে করি।’

এতে বলা হয়েছে, ‘দক্ষিণ আমেরিকার বনাঞ্চলে ডার্ট ব্যাঙের শরীরে এপিবাটিডিন প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়। বন্দি অবস্থায় ডার্ট ব্যাঙ এই বিষ উৎপাদন করে না এবং রাশিয়ায় সেটি প্রাকৃতিকভাবেও পাওয়া যায় না।’

কাজেই ‘নাভালনির শরীরে এর উপস্থিতির কোনো নির্দোষ ব্যাখ্যা নেই,’ যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থাকে রাশিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ সম্পর্কে যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যেই অবহিত করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দফতর।

গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করায় নাভালনির প্রশংসা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার।

তিনি ‘অত্যন্ত সাহসী ছিলেন’ উল্লেখ করে যুক্তরাজ্যের এই নেতা বলেন, ‘সত্য প্রকাশে তার এই দৃঢ় সংকল্পের কথা’ আগামীতেও সবাই মনে রাখবে।

কিয়ার স্টারমার বলেন, ‘রাশিয়ার হুমকি ও পুতিনের খুনি উদ্দেশ্য থেকে আমাদের জনগণ, মূল্যবোধ এবং জীবনযাত্রাকে রক্ষা করার জন্য যা যা করা দরকার, সেগুলোই আমি করছি।’

ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ নোয়েল বারোও তার দেশের পক্ষ থেকে নাভালনির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

অ্যালেক্সেই নাভালনিকে ‘স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাশিয়ার পক্ষে লড়াই করার জন্য নিহত’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি।

কে এই অ্যালেক্সেই নাভালনি?

প্রেসিডেন্ট পুতিনের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত আলেক্সেই নাভালনি।

সরকারের দুর্নীতি প্রকাশ করে দেয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে তার নাম উঠে আসে। তিনি পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া দলকে উল্লেখ করেছিলেন ‘অসৎ ও চোরদের দল’ বলে। এজন্য বেশ কয়েকবার তাকে জেলে যেতে হয়েছে।

পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া সংসদীয় নির্বাচনে ভোট কারচুপি করেছে বলে প্রতিবাদ করার পর তাকে ২০১১ সালে ১৫ দিনের জন্য গ্রেফতার করা হয়।

নাভালনিকে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে আত্মসাৎ করার অভিযোগে অল্পদিনের জন্য জেলে পাঠানো হয়, তবে তিনি বলেন, এই দণ্ডাদেশ ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তিনি ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হিসাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু প্রতারণার দায়ে তিনি আগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এই কারণ দেখিয়ে তাকে প্রার্থিতা দেয়া হয়নি।

নাভালনির মতে, এটাও ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এরপর ২০১৯ জুলাই মাসে নাভালনিকে আবার কারাগারে পাঠানো হয় অনুমোদন না থাকার পরও প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংগঠনের জন্য। সেসময় তিনি কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

চিকিৎসকরা বলেন তার ‘কোনো কিছুর স্পর্শ থেকে চামড়ার প্রদাহ’ হয়েছে। কিন্তু নাভালনি বলেন, তার কখনো কিছু থেকে অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া আগে হয়নি।

তার চিকিৎসক বলেন তিনি ‘কোনো বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে’ এসেছিলেন। নাভালনিও বলেছিলেন তার ধারণা তাকে বিষ দেয়া হয়েছে।

নাভালনির ওপর ২০১৭ সালে অ্যান্টিসেপটিক রঙ দিয়ে হামলা চালানো হলে তার ডান চোখ রাসায়নিকে গুরুতরভাবে পুড়ে যায়।

২০২২ সালে তার দুর্নীতিবিরোধী ফাউন্ডেশনকে সরকারিভাবে ‘বিদেশী গুপ্তচর সংস্থা’ বলে ঘোষণা করা হয়। ফলে এই সংস্থার কর্মকাণ্ডের ওপর সরকার কঠোর নজরদারি শুরু করে।

ভ্লাদিমির পুতিনের কট্টর সমালোচক অ্যালেক্সেই নাভালনিকে অতীতেও হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল।

তাকে ২০২০ সালে বিষপ্রয়োগে হত্যার চেষ্টা করা হলেও তখন প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

বিষ প্রয়োগের ঘটনার পর সেসময় চিকিৎসা নিতে জার্মানিতে গিয়েছিলেন নাভালনি।

পাঁচ মাস জার্মানিতে কাটিয়ে ২০২১ সালে জানুয়ারিতে মস্কো ফেরার সাথে সাথেই তাকে গ্রেফতার করে রুশ সরকার।

সূত্র : বিবিসি



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews