একটু বৃষ্টি হলেই যেখানে রাজধানীর রাস্তাঘাটে পানি জমে যায়, ড্রেন উপচে ময়লা-আবর্জনা বেরিয়ে আসে, সেখানে একটানা ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে বৃষ্টিপাত হলে অবস্থা কী দাঁড়াতে পারে, সহজেই আন্দাজ করা যায়। তথ্যমতে, ১২ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ১৫৮ মিলিমিটার। ২৪ ঘণ্টায় ১৭৫ মিলিমিটার। তারপরেও বৃষ্টি থামেনি। অঝোরে ঝরেছে পরের দিন পর্যন্তও। এর মধ্যেই গণমাধ্যম খবর দিয়েছে, ১৭ বছরের মধ্যে এটা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। রাজধানী ঢাকা রীতিমতো অচল হয়ে পড়েছে। রাস্তায় পানি জমেছে হাঁটু থেকে কোমর অব্দি। নিচু এলাকার বাড়িঘরেও পানি ঢুকেছে। অফিসগামী, শিক্ষালয়গামী এবং নানা প্রয়োজনে বহির্গামী মানুষের অশেষ দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। রাস্তাঘাটে গণপরিবহন চলেনি তেমন একটা। চলার অবস্থাও ছিল না। ব্যক্তিগত যানবাহনও পারতপক্ষে কেউ বের করেনি। বলতে হয়, বৃষ্টিপাতে ও জলাবদ্ধতায় রাজধানীর অচলাবস্থা ও গণবিপর্যয় ভাষায় বর্ণনাযোগ্য নয়। রাজধানী ঢাকার মতো বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অবস্থাও একই রকম। সেখানেও অবিরাম বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বন্দরনগরীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। কমবেশি ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দিত্বের শিকার, যাদের উদ্ধার ও ত্রাণসামগ্রীর প্রয়োজন অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। খবর বেরিয়েছে, উদ্ধার তৎপরতা এবং ত্রাণসামগ্রী অপ্রতুল। বানভাসি এসব মানুষের দুর্ভোগ-বিড়ম্বনার সীমা-পরিসীমা নেই। রাজধানী ও বন্দরনগরীর বহুবিধ সমস্যার মধ্যে জলাবদ্ধতা একটি বড় সমস্যা। এ সমস্যা দিনকে দিন বাড়ছেই, কমছে না। অথচ এই দুই নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ সিস্টেমের পরিবর্তন ও উন্নয়নে এবং অন্যান্য প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে। কিন্তু কোথাও তেমন কোনো কার্যকর সুফল পাওয়া যায়নি। ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরীর বর্তমান অবস্থাই তার সাক্ষ্য বহন করে। দেশে এখন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায়। সঙ্গতকারণেই মানুষ আশা করে, সরকার দুই প্রধান নগরীর জলাবদ্ধতাসহ অন্যান্য সমস্যা বিশেষ করে যানজট, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দূষণ, ময়লা-আবর্জনার সমস্যার আশু সমাধানে উপযুক্ত উদ্যোগ-পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকারের এসব দিকে খেয়াল নেই। সরকার বরং ব্যস্ত আছে ক্ষমতা-উপভোগে ও ফটোসেশনে। অতীত-সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতাও সরকারের মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে।
নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। জনগণের আশা, আকাক্সক্ষা, কল্যাণ ও মঙ্গল সাধনে কাজ করাই তার অন্যতম প্রধান কর্তব্য। সরকার জনগণের সেবক, মাস্টার নয়। কোনো সরকার যদি উল্টোপথে চলে তবে সেই সরকারের অজনপ্রিয় হতে বেশি সময় লাগে না। গত পাঁচ মাসে সরকারের বেশ কিছু ইতিবাচক কাজ আছে। তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব সম্পন্ন বা লোক দেখানো কাজও আছে বলে মনে করেন সমালোচকরা। তাদের মতে, সরকারের যেখানে যে কর্তব্য পালন আবশ্যক, তা দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে যথাসময়ে করলেই যথেষ্ট। নিছক জনতুষ্টি অর্জনের জন্য কিছু করা সরকারের উপযুক্ত কাজ নয়। এ মুহূর্তে দেশ বন্যার মতো মারাত্মক একটা দুর্যোগের মধ্যে অবস্থান করছে। পানিবন্দি মানুষ উদ্ধারের অপেক্ষায়। দুর্গত মানুষ খাদ্য ও ত্রাণের জন্য হাহাকার করছে। তাদের উদ্ধার করা ও ত্রাণ দেয়া জরুরি। রোগব্যাধি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা আবশ্যক। সরকারের তরফে উদ্ধার, সম্পদ রক্ষা ও ত্রাণ তৎপরতা চালানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এসব নির্দেশ কতটা প্রতিপালন করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কার্যক্ষেত্রে লোকবল, সরঞ্জামবল ও অর্থবলের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ থেকে এটা স্পষ্ট যে, নির্দেশই যথেষ্ট হতে পারে না। নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করার মধ্যেই সাফল্য নিহিত। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, উদ্ধার ও ত্রাণ এ মুহূর্তের প্রধান কাজ। একইসঙ্গে আরো কিছু কাজ রয়েছে, যা গর্ভবতী মা, শিশু ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধার জন্য প্রযোজ্য। এসব কাজ কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। বন্যায় কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, বাঁধের ক্ষতি হয়েছে, রাস্তাঘাটের ক্ষতি হয়েছে। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে কৃষিপুনর্বাসনসহ মেরামত কাজ দ্রুত করতে হবে। এসব ব্যাপারে সরকারের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা থাকতে হবে। কৃষিপুনর্বাসনের জন্য নগদ অর্থ, বীজ, সার ইত্যাদি লাগবে। বাঁধ মেরামতে উপকরণ ও অর্থ লাগবে। একইভাবে রাস্তাঘাট মেরামতে উপকরণ ও অর্থ লাগবে।
সবক্ষেত্রে অর্থই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর, শুল্ক, খাজনা ইত্যাদি ধার্য করে এই অর্থের সংস্থান করে। আমরা লক্ষ করেছি, অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন- তেমন রাস্তাঘাট সংস্কারে সরকার গড়িমসি করে থাকে। প্রতি বছর বর্ষা-বন্যায় রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়, প্রায় যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। চলমান বন্যায় ইতোমধ্যে রাজধানী ও বন্দরনগরীসহ সড়ক-মহাসড়ক ভেঙ্গেচুরে খানাখন্দকে পরিণত হয়েছে। টাকার অভাবের অজুহাতে এসব রাস্তাঘাট ফেলে রাখা যাবে না। প্রতিবছর মেরামতের অভাব বা ঠিকমত মেরামত না করার কারণে যানবাহনের বড় রকমের ক্ষতি হয়। অথচ যানবাহনের মালিকদের এই রাস্তাঘাটে চলাচলের জন্য মোটা অংকের ট্যাক্স গুনতে হয়। রাস্তা-ঘাট যদি মসৃণ ও চলাচলের উপযোগী না থাকে, তবে তারা এই ট্যাক্স দেবেন কেন? মানুষ যদি প্রকৃত সেবা না পায়, তবে বাড়িঘর, জমি-জিরাত ইত্যাদির জন্য ট্যাক্স দেবে কেন? অতীতে সরকারের টাকা হরিলুট হয়েছে। সে কথা বলে এখন লাভ হবে না। এখন নির্বাচিত সরকারের সময়। এ সরকারের সময়ে টাকা হরিলুট হয়েছে, এমন কথা কেউ শুনতে চায় না। সরকারকে সব কিছুর ব্যাপারে দায়বদ্ধ হলেই চলবে না, জনগণের কাছে জবাবদিহিও করতে হবে। আমরা আশা করবো, দায়বদ্ধ ও জবাবদিহির সরকার হিসাবে এ সরকার রাজধানী ও বন্দরনগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে এতটুকু বিলম্ব করবে না।