শিশুর হাতে মোবাইল ফোন এখন আর বিলাসিতা নয়, যেন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত শিশুদের বড় একটি সময় কাটছে মোবাইল ফোন, টিভি, ট্যাব কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ের বাস্তবতায় ডিজিটাল ডিভাইস যেমন শিক্ষার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে, তেমনি অজান্তেই তৈরি করছে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের বা আইসিডিডিআরবির সাম্প্রতিক গবেষণা সেই উদ্বেগকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। গবেষণাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি বাংলাদেশের শহুরে শিশুজীবনের এক উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি।
ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৪২০ জন শিশুর ওপর দুই বছর ধরে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলপড়ুয়া শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা স্ক্রিনে সময় কাটাচ্ছে। শিশুদের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি সময় ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করছে। এর ফল হিসেবে দেখা দিচ্ছে ঘুমের ঘাটতি, স্থূলতা, চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, মনোযোগহীনতা, আচরণগত জটিলতা এবং মানসিক অস্থিরতা। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই সমস্যাগুলোকে অনেক পরিবার এখনো স্বাভাবিক বা সাময়িক সমস্যা বলে ধরে নিচ্ছে।
প্রযুক্তি মানবসভ্যতার বড় অর্জন। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার যখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তখন সেটিই হয়ে ওঠে নতুন সংকটের উৎস। বাংলাদেশের শিশুদের ক্ষেত্রেও এখন সেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোভিড মহামারির সময় অনলাইন ক্লাসের প্রয়োজনীয়তা থেকে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া হয়েছিল। তখন সেটি ছিল সময়ের দাবি। কিন্তু মহামারি শেষ হলেও শিশুদের হাত থেকে মোবাইল আর নামেনি। বরং বিনোদন, গেমস, ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ইউটিউবের আকর্ষণ তাদের ডিজিটাল পর্দার সঙ্গে আরও গভীরভাবে বেঁধে ফেলেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচজন শিশুর মধ্যে চারজন প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে। গড়ে তাদের স্ক্রিন টাইম প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা। অথচ শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের আন্তর্জাতিক সীমা সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা। অর্থাৎ বাংলাদেশের শহুরে শিশুরা প্রতিদিন স্বাভাবিক সীমার প্রায় দ্বিগুণ সময় স্ক্রিনে কাটাচ্ছে। এর প্রভাব তাদের শরীর ও মনে ভয়াবহভাবে পড়ছে।
শিশুদের ঘুমের সমস্যা এখন অনেক পরিবারেই সাধারণ ঘটনা। অনেক মা-বাবা অভিযোগ করেন, সন্তান রাতে দেরি করে ঘুমায়, সকালে উঠতে চায় না, সারাক্ষণ ক্লান্ত থাকে কিংবা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না। এই গবেষণা বলছে, যারা দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টা ঘুমায়। অথচ এই বয়সী শিশুদের দৈনিক অন্তত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শিশুর স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্ক্রিন টাইমের আরেকটি ভয়ংকর প্রভাব হচ্ছে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা। আগে বিকেলে শিশুদের মাঠে খেলতে দেখা যেত। এখন অধিকাংশ শিশু ঘরের ভেতর বসে মোবাইল স্ক্রিনে গেম খেলছে বা ভিডিও দেখছে। ফলে তাদের শারীরিক পরিশ্রম কমে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার। শিশু বয়সে স্থূলতা ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ আজকের অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম আগামী দিনের অসুস্থ প্রজন্ম তৈরি করছে।
চোখের সমস্যাও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। গবেষণায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশুর চোখের সমস্যা শনাক্ত হয়েছে এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু নিয়মিত মাথাব্যথায় ভুগছে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখে চাপ পড়ে, চোখ শুষ্ক হয়ে যায় এবং দৃষ্টিশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষজ্ঞরা শিশুদের জন্য ‘২০-২০-২০’ নিয়ম অনুসরণের কথা বলেছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে হবে। কিন্তু বাস্তবে কত পরিবার এই নিয়ম মেনে চলে?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে প্রায় দুজন দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যায় ভুগছে। শিশুদের স্বাভাবিক সামাজিক মেলামেশা কমে যাচ্ছে। তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে স্ক্রিনে সময় কাটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। ফলে একাকিত্ব, খিটখিটে মেজাজ, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা বাড়ছে। শিশুদের মনোজগৎ ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল জগতের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
এখানে শুধু শিশুরা দায়ী নয়। পরিবার এবং সমাজের ভূমিকাও বড়। অনেক মা-বাবাই সন্তানকে ব্যস্ত রাখার সহজ উপায় হিসেবে মোবাইল ফোন হাতে তুলে দেন। শিশুর কান্না থামাতে, খাওয়াতে কিংবা নিজে ব্যস্ত থাকার সময় সন্তানকে চুপ করিয়ে রাখতে মোবাইল ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ এই অভ্যাস ধীরে ধীরে শিশুর মধ্যে নির্ভরশীলতা তৈরি করছে। আরও বড় বাস্তবতা হলো, অনেক অভিভাবকের নিজেদেরই স্ক্রিন টাইম চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই বড়দের আচরণ অনুকরণ করে। ফলে মা-বাবা নিজেরা যদি সারাক্ষণ মোবাইলে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সন্তানদের স্ক্রিন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শহুরে জীবনের আরেকটি সংকটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। খেলার মাঠ কমে যাচ্ছে। নিরাপদ উন্মুক্ত জায়গার অভাব শিশুদের ঘরের ভেতর বন্দী করে ফেলছে। আগে যেখানে শিশুরা মাঠে দৌড়াত, এখন সেখানে বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে গেছে। ফলে ডিজিটাল ডিভাইসই হয়ে উঠছে তাদের প্রধান বিনোদন। অর্থাৎ স্ক্রিন আসক্তির পেছনে সামাজিক অবকাঠামোগত সংকটও দায়ী।
এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল জ্ঞান অপরিহার্য। শিশুদের পড়াশোনা, সৃজনশীলতা ও তথ্যপ্রাপ্তির জন্য প্রযুক্তির প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত ও স্বাস্থ্যকর ব্যবহার। প্রযুক্তি যেন শিশুর জীবনকে নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং শিশু প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।
এ জন্য পরিবারকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রথমত, অভিভাবকদের নিজেদের স্ক্রিন ব্যবহারে সংযমী হতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুলপড়ুয়া শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টার বেশি হওয়া উচিত নয়। তৃতীয়ত, ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কারণ রাতে স্ক্রিনের নীল আলো মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে এবং ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করে।
পরিবারে ডিভাইস-মুক্ত সময় চালু করা জরুরি। যেমন একসঙ্গে খাওয়ার সময় বা রাতে নির্দিষ্ট কিছু সময় মোবাইল ব্যবহার বন্ধ রাখা যেতে পারে। শিশুদের সঙ্গে গল্প করা, বই পড়া, পারিবারিক আড্ডা, একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া কিংবা খেলাধুলা করার মতো অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিশুরা যত বেশি বাস্তব জীবনের আনন্দ পাবে, তত কম ভার্চুয়াল জগতে ডুবে থাকবে।
স্কুলগুলোরও দায়িত্ব আছে। শুধু প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, বিতর্ক, দলীয় কাজ এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। স্কুলে স্ক্রিন ব্যবহারের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতামূলক ক্লাস চালু করা যেতে পারে। অভিভাবকদের জন্যও কর্মশালা আয়োজন প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। বাংলাদেশে শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ে এখনো সুস্পষ্ট জাতীয় নির্দেশিকা নেই। অথচ উন্নত অনেক দেশে শিশুদের বয়সভিত্তিক স্ক্রিন ব্যবহারের নীতিমালা রয়েছে। বাংলাদেশেও শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ডিজিটাল ব্যবহারের নির্দেশিকা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের সুস্থ বেড়ে ওঠার জন্য নিরাপদ খেলার পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
মিডিয়ার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। টেলিভিশন, পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের স্ক্রিন আসক্তির ক্ষতি নিয়ে ধারাবাহিক সচেতনতামূলক প্রচার চালানো দরকার। কারণ, এটি শুধু একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুরা ভবিষ্যতের নাগরিক। তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। যদি এখনই আমরা সচেতন না হই, তাহলে একসময় এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হবে, যারা প্রযুক্তিতে দক্ষ হলেও শারীরিকভাবে দুর্বল, মানসিকভাবে অস্থির এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
শৈশবের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে মাঠের দৌড়ে, বন্ধুদের সঙ্গে হাসিতে, বইয়ের পাতায়, প্রকৃতির স্পর্শে এবং পরিবারের সান্নিধ্যে। সেই শৈশব যদি পুরোপুরি আটকে যায় মোবাইলের ছোট্ট পর্দায়, তাহলে আমরা হয়তো প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক হব, কিন্তু মানবিকভাবে দরিদ্র হয়ে পড়ব। তাই এখনই সময় শিশুদের হাতে শুধু স্মার্টফোন নয়, একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন তুলে দেওয়ার।
লেখক: প্রকাশক ও কলামিস্ট