বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনকাল ছিল বিরল ব্যতিক্রম। ১৯৭৫-এর ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও সংহতি’র মাধ্যমে বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন তিনি। এই পটভূমি তাঁকে জনগণের আকাক্সক্ষা ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের নৈতিক বৈধতা দিয়েছিল। ফ্যাল্যান্ড ও পার্কিনসনের (১৯৭৬) ‘টেস্ট কেস’ ও কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ উপহাসে জিয়ার আবির্ভাব ছিল রাষ্ট্রীয় প্যারাডাইম শিফট। তিনি বুঝেছিলেন, ১৯৭১-এর ভৌগোলিক স্বাধীনতার পর জনগণের প্রকৃত মুক্তি ও আপনতা অর্জনে প্রয়োজন লুণ্ঠনমুক্ত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো। তাত্ত্বিকভাবে, ১৯৭২-৭৫ কালপর্বের নিষ্কাশনমূলক অলিগার্কিক কাঠামো উপড়ে ফেলতে জিয়াউর রহমান দক্ষ রাষ্ট্র প্রকৌশলীর ভূমিকা নেন। তাঁর দর্শনের মূলকথা ছিল ‘উৎপাদনমুখী অন্তর্ভুক্তিবাদ’; যা অলিগার্কিক তোষণের বদলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও মেধাভিত্তিক পুঁজিবাদী রূপান্তর ঘটায়। তিনি কেবল খাদ্য নিরাপত্তা বা পোশাক খাতের সূচনা করেননি, বরং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়েছিলেন। তাঁর সততা ও মেধাতন্ত্রনির্ভর ‘ডেভেলপমেন্টাল রিপাবলিক’ প্রকল্পই স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্থায়ী ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক দর্শন কেবল উন্নয়নবাদ নয়, বরং লুণ্ঠনমূলক অলিগার্কি নিধনে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রীয় প্রজেক্ট। এসেমগলু ও রবিনসনের (২০১২) তাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী, তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও গ্রামীণ উৎপাদনকে রাষ্ট্রীয় বৈধতা দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইনক্লুসিভ করেন। মার্শালের (১৯৫০) দর্শনে তিনি কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে ‘অন্নের অধিকার’ ও জনগণের ‘আপনতা’ নিশ্চিত করেন। হান্টিংটনের (১৯৬৮) তত্ত্বানুযায়ী আমলাতন্ত্রে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে তিনি এক দক্ষ টেকনোক্রেটিক ন্যাশনালিজম গড়ে তোলেন। শুম্পেটারের (১৯৪২) দর্শনে রাজনীতিতে মেধার এন্ট্রি ব্যারিয়ার তৈরি করে অযোগ্যদের পথ রুদ্ধ করেন। সর্বোপরি, ওয়েবারের (১৯২২) আইডিয়াল টাইপ আমলাতন্ত্র এবং নর্থের (২০০৯) ‘ওপেন এক্সেস অর্ডার’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি অলিগার্কিক ক্লোজার ভেঙে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি: শহীদ জিয়ার সবচেয়ে যুগান্তকারী অবদান হলো কৃষিকে রাষ্ট্রের প্রধান জাতীয় কর্মসূচিতে নিয়ে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়া। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের অন্ধকার সময়ে তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, বৈদেশিক সাহায্যনির্ভরতা কমিয়ে যদি দেশজ উৎপাদন না বাড়ানো যায়, তবে জাতীয় সার্বভৌমত্ব কেবল কাগুজে দলিলে সীমাবদ্ধ থাকবে।
খাল খনন বিপ্লব: ১৯৭৭ সাল থেকে শুরু হওয়া ‘খাল খনন কর্মসূচি’ কেবল একটি ভৌত অবকাঠামো প্রকল্প ছিল না; বরং এটি ছিল খাদ্য নিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ উন্নয়নের এক অনন্য হাইব্রিড মডেল। অস্ত্রোম তাঁর ‘গভর্নিং দ্য কমন্স’ (১৯৯০) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, স্থানীয় সম্পদ যখন স্থানীয় মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণে পরিচালিত হয়, তখন তা দীর্ঘস্থায়ী সুফল দেয়। জিয়াউর রহমানের এই প্রকল্প ছিল অস্ত্রোমের তত্ত্বের এক আগাম সফল প্রয়োগ। কয়েক হাজার কিলোমিটার খাল খননের মাধ্যমে তিনি একদিকে বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা এবং অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করে দ্বিমুখী উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছিলেন। এই কর্মসূচিতে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামবাসীকে সরাসরি শ্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত করা হয়। এটি কেবল ভৌত মূলধন নয়, বরং গ্রামীণ সমাজে এক বিশাল সামাজিক মূলধন ও সমন্বয় ক্ষমতা তৈরি করেছিল।
প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, কৃষি গবেষণা ও মেধাভিত্তিক সবুজ বিপ্লব: জিয়াউর রহমান কেবল খাল খনন করেই থেমে থাকেননি; তিনি কৃষিকে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে সম্প্রসারিত করে পর্যাপ্ত বাজেট ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের বীজের মাধ্যমে এক বিশাল সবুজ বিপ্লব ঘটানো। সার, বীজ এবং কৃষি উপকরণ যাতে প্রান্তিক কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, সেজন্য তিনি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-কে শক্তিশালী করেন। এটি ছিল অমর্ত্য সেনের (১৯৯৯) ‘ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ’-এর এক বাস্তব রূপ; যেখানে মানুষের উৎপাদনশীল ক্ষমতা বৃদ্ধিকেই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য ধরা হয়।
গ্রামীণ ইনক্লুসিভিজম ও কেইনসীয় প্রভাব: গ্রামীণ অবকাঠামো ও কৃষি বিনিয়োগের ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের পকেটে টাকা পৌঁছায়; যা ‘সাপ্লাই-সাইড ইকোনমিক্স’ ও ‘কেইনসীয় পাবলিক ওয়ার্কস’-এর সমন্বয়। গ্রামে উৎপাদন বাড়লে শহরের শিল্পের জন্য একটি বিশাল বাজার তৈরি হয়, যা সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। মার্শালের ভাষায়, এটি ছিল ‘অন্নের অধিকার নিশ্চিতকরণে রাষ্ট্রের সক্রিয় দায়িত্ব’। জিয়াউর রহমান প্রমাণ করেছিলেন যে, খাদ্য নিরাপত্তা কেবল মানবিক বিষয় নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান স্তম্ভ।
তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে পটেনশিয়াল ইকোনমি: ‘টেস্ট কেস’ ন্যারেটিভকে আমূল বদলে দিয়ে ১৯৭৯-৮১ সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ খাদ্য ঘাটতি কাটিয়ে স্বনির্ভরতার দিকে এক বিশাল লাফ দেয়। এটি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোকে বার্তা দিয়েছিল যে, বাংলাদেশ আর দয়া বা সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল কোনো ‘বাস্কেট কেস’ নয়, বরং এটি একটি উদীয়মান উৎপাদনশীল রাষ্ট্র।
তৃণমূল ক্ষমতায়ন ও গ্রামীণ অবকাঠামো: জিয়ার স্বনির্ভর দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা, যা কেন্দ্রীয় শাসনের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে স্থানীয় মানুষের হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ন্যস্ত করেছিল। এর সমান্তরালে তিনি ১৯৭৭ সালে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন, যা গ্রামীণ জনপদে আধুনিক সেচ ও ক্ষুদ্র শিল্পের বিপ্লব ঘটায়। এছাড়া সামাজিক শৃঙ্খলা ও উন্নয়নমূলক কাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে তিনি গ্রাম প্রতিরক্ষা দল এবং শিক্ষার প্রসার ঘটাতে ব্যাপক গণশিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন। এই বহুমুখী পদক্ষেপগুলোই মূলত বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলকে একটি উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক ইউনিটে রূপান্তর করেছিল।
শিল্প, বেসরকারি খাত ও মুক্তবাজারের ভিত্তি: জিয়ার অর্থনৈতিক দর্শনের দ্বিতীয় প্রধান স্তম্ভ ছিল ১৯৭২-৭৫ কালপর্বের সমাজতান্ত্রিক স্থবিরতা থেকে বেরিয়ে এসে একটি গতিশীল ‘মিশ্র অর্থনীতি’ এবং বেসরকারি উদ্যোক্তা-চালিত প্রবৃদ্ধির সূচনা করা। তাঁর এই পদক্ষেপগুলো কেবল সাময়িক সংস্কার ছিল না, বরং তা ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির ডিএনএ পরিবর্তনের এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
বিরাষ্ট্রীয়করণ ও মিশ্র অর্থনীতির অভ্যুদয়: জিয়া অনুধাবন করেছিলেন যে, দক্ষতাহীন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলো অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার ‘স্টেট বিল্ডিং’ (২০০৪) দর্শনের আদলে রাষ্ট্রকে ব্যবসার মালিকের পরিবর্তে ‘সহায়ক’ হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৭৫-৭৬ পরবর্তী সময়ে তিনি সমাজতান্ত্রিক জাতীয়করণ নীতি পর্যালোচনা করে বেসরকারি মালিকানাকে পুনরায় বৈধতা দেন এবং লুণ্ঠিত শিল্পকারখানাগুলো যোগ্য উদ্যোক্তাদের হাতে ফিরিয়ে দিতে শুরু করেন।
পুঁজি বাজারের পুনর্জীবন ও আর্থিক সংস্কার: স্বাধীনতার পর কার্যত মৃত ও অবহেলিত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে তিনি পুনরায় সক্রিয় করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল জনগণের ‘অচল সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তরের’ একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তিনি বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকের শাখা খোলার অনুমতি দেন। এটি মিল্টন ফ্রিডম্যানের বাজার-ভিত্তিক সমাধানের কাছাকাছি হলেও তিনি একে একটি ‘সোশ্যাল সেফটি নেট’ যুক্ত ভারসাম্যমূলক কাঠামোয় ধরে রেখেছিলেন।
রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন ও ইনসেনটিভ-ভিত্তিক নীতি: আজকের বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের যে আকাশচুম্বী সাফল্য, তার বীজ বপন করা হয়েছিল জিয়ার সুদূরপ্রসারী শিল্প নীতির মাধ্যমে। ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রবর্তন করেন, যা পুঁজিহীন উদ্যোক্তাদের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ করে দেয়। এটি ক্লাসিক উন্নয়নকামী রাষ্ট্রের রপ্তানি কৌশলের সাথে হুবহু মিলে যায়। ১৯৭৯-৮০ সালে তিনি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের ভিত্তি স্থাপন করেন। নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য সাত বছরের কর-ছাড়, শুল্ক রেয়াত এবং বিদ্যুৎ বিলে বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে তিনি একটি শক্তিশালী ‘ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট’ তৈরি করেন।
মেধাভিত্তিক শিল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রোডাকশন-নির্ভর নৈতিকতা: জিয়ার শিল্প নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পেশাদারিত্ব। তিনি শিল্পকারখানাগুলোতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেন। তাঁর কাছে বাজার উন্মুক্ত করার অর্থ ক্রোনি ক্যাপিটালিজম বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদ নয়, বরং একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা। জোসেফ শুম্পিটারের ‘সৃজনশীল ধ্বংস’ তত্ত্বের মতো তিনি পুরনো অকার্যকর ব্যবস্থাকে ভেঙে উদ্যোক্তাদের সৃজনশীলতাকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা দিয়েছিলেন।
মানবসম্পদ, প্রশাসন ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন: জিয়ার অর্থনৈতিক প্রকল্পকে কেবল সাধারণ পলিসি লিস্ট দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়; এর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে মেধা ও সততার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হতে পারে, কিন্তু যদি মানবসম্পদকে মেধাতান্ত্রিকভাবে গড়ে তোলা যায়, তবে সেই রাষ্ট্র অপরাজেয় হয়ে ওঠে।
স্টেট-বিল্ডিং ও আমলাতান্ত্রিক মেধা: ফুকুয়ামা তাঁর ‘স্টেট বিল্ডিং’ (২০০৪) গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন যে, দক্ষ আমলাতন্ত্র ও শক্তিশালী পাবলিক ইনস্টিটিউশন ছাড়া কোনো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রই বাজার-উন্মুক্তিকরণ বা সংস্কার টিকিয়ে রাখতে পারে পারে না। জিয়া এই সত্যটি অনুধাবন করেছিলেন। তিনি সিভিল সার্ভিস, সামরিক বাহিনী ও পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। এটি ছিল ওয়েবার (১৯২২) বর্ণিত নিয়মনিষ্ঠ আমলাতন্ত্রের এক বাস্তব প্রয়োগ। তিনি প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে এনে এমন এক ‘টেকনোক্রেটিক ন্যাশনালিজম’ গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে আত্মীয়তা ও দলীয় আনুগত্যের চেয়ে ব্যক্তিগত দক্ষতা ও নৈতিকতাকে বড় করে দেখা হতো।
অলিগার্কি-বিরোধী এন্ট্রি ব্যারিয়ার: শুম্পেটারের (১৯৪২) গণতন্ত্রের ধারণার মতো জিয়া চেয়েছিলেন রাজনীতিকে লুটেরা শ্রেণি এবং অলিগার্কিক তদ্বিরবাজদের হাত থেকে মুক্ত করতে। তিনি রাজনীতিতে মেধা, সততা ও ত্যাগের এক কঠিন মানদ- স্থাপন করে দুর্বৃত্তদের জন্য রাজনীতির পথকে দুর্গম করতে চেয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন এক রাজনৈতিক বাজার তৈরি করা যেখানে কেবল যোগ্যরাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংস্কার: জিয়া মানবসম্পদ উন্নয়নকে কেবল সামাজিক কল্যাণ হিসেবে দেখেননি, বরং একে অর্থনীতির ভৌত অবকাঠামোর মতো সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বেকারের (১৯৬৪) ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল থিওরি’-র আদলে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা, গণশিক্ষা এবং বিশেষ করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেন। তাঁর আমলেই কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও থানা শিক্ষা অফিসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী ভিত্তি পায়। মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয় গঠন করে তিনি দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল শ্রমবাজারে সম্পৃক্ত করার প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি করেন। এটি ছিল সেনের (১৯৯৯) ‘ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ’-এর এক সফল প্রয়োগ। তাঁর মানবসম্পদ উন্নয়নের দর্শন কেবল অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য ছিল না। ১৯৭৬ সালে ‘জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রবেশের পথ সুগম করেন। তাঁর এই জনশক্তি রপ্তানি নীতি আজ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের যে প্রধান স্তম্ভ (রেমিট্যান্স), তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
গ্রামীণ স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা: গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মডেল এবং পল্লী চিকিৎসকদের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যান। এটি ছিল প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর এক সুদূরপ্রসারী কৌশল।
ব্যক্তিগত সততা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা: জিয়ার ব্যক্তিগত সততা, মিতব্যয়ী জীবনযাপন এবং কঠোর পরিশ্রমের উদাহরণ তাঁর ‘ক্যারিশম্যাটিক অথরিটি’-কে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দিয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের নৈতিক উচ্চতা ছাড়া প্রশাসনে মেধা ও সততা প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব।
অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ: শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি স্থিতিশীল এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে কেবল ‘পলিসি’ যথেষ্ট নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয় এবং প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক পরিবেশ অপরিহার্য।
অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’: জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কেবল একটি পরিচয়তাত্ত্বিক আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির একটি রাজনৈতিক ফ্রেম। ধর্ম-বর্ণ-পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সবাইকে রাষ্ট্রের নাগরিকত্বের ছাতার নিচে এনে তিনি একটি ‘বিগ টেন্ট’ কৌশল গ্রহণ করেছিলেন। এটি সমাজবিজ্ঞানী টি. এইচ. মার্শালের নাগরিকত্ব তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায়, যখন একটি জাতি বিভক্ত থাকে, তখন সেখানে বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়ে। জিয়া বিভাজনের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি সমন্বিত জাতিসত্তা গড়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। এটি ছিল শ্রমবাজার, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদে সবার সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার একটি রাজনৈতিক গ্যারান্টি।
বহুদলীয় গণতন্ত্র: একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থার মাধ্যমে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ‘ক্লোজার’ তৈরি হয়েছিল, জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে তা ভেঙে দেন। নর্থ, ওয়ালিস ও ওয়েইংগাস্ট তাঁদের ‘ভায়োলেন্স অ্যান্ড সোশ্যাল অর্ডার্স’ (২০০৯) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, টেকসই প্রবৃদ্ধি তখনই সম্ভব যখন রাষ্ট্র ‘লিমিটেড এক্সেস অর্ডার’ থেকে ‘ওপেন এক্সেস অর্ডার’-এ রূপান্তরিত হয়। জিয়া বিরোধী দলকে বৈধতা দিয়ে এবং ভিন্ন মতের রাজনৈতিক দলগুলোকে (ডান-বাম-মধ্যপন্থী) মূলধারায় ফিরিয়ে এনে অলিগার্কিক ক্লোজড-সিস্টেম ভেঙে দিয়েছিলেন। একটি প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক বাজার থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক বাজারে অলিগার্কদের একচ্ছত্র আধিপত্য কমে আসে। জিয়ার বহুদলীয় গণতন্ত্র এই প্রতিযোগিতার দুয়ার উন্মোচন করেছিল।
অলিগার্কি-বিরোধী অর্থনীতি: জিয়ার বিরুদ্ধে প্রায়শই সামরিক আইন বা কঠোর শাসনের সমালোচনা করা হয়। তবে রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশ্লেষণী ফ্রেমে এগুলোকে দেখা যায় ‘অলিগার্কিক প্যাট্রোনেজ ভাঙার কস্ট’ বা মাসুল হিসেবে। তৎকালীন সময়ে যে অলিগার্কিক অক্টোপাস রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনে লিপ্ত ছিল, তাকে ভাঙতে জিয়ার কঠোরতা ছিল একটি প্রি-ইনস্টিটিউশনাল অর্ডার রিস্টোরেশন। এটি মূলত স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের (১৯৬৮) সেই তত্ত্বের বাস্তবায়ন, যেখানে দ্রুত আধুনিকায়নের জন্য শুরুতে শক্তিশালী প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রয়োজন হয়। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘রাজনীতি কঠিন করে দেওয়া’ ছিল মূলত লুটেরা ও অলিগার্কদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দক্ষ ও নৈতিক নেতৃত্বের জন্য একটি ‘এন্ট্রি ব্যারিয়ার’ তৈরি করা। এটি অলিগার্কি-বিরোধী একটি প্রচ্ছন্ন অর্থনৈতিক রাজনীতি ছিল।
‘টেস্ট কেস’ থেকে ‘ডেভেলপমেন্টাল রিপাবলিক’: জিয়ার অর্থনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়া প্রমাণ করেছে যে একটি দুর্বল রাষ্ট্রও যথাযথ রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ব্যর্থ রাষ্ট্রের ন্যারেটিভকে পাল্টাতে পারে। তিনি রাষ্ট্রকে কোনো পরাশক্তি বা দেশীয় সিন্ডিকেটের ক্লায়েন্ট স্টেট হতে দেননি। এই রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি তিনি কেবল দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখেননি। আঞ্চলিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক সংহতি ও বাজার তৈরির লক্ষ্যে তিনি ‘সার্ক’ গঠনের ঐতিহাসিক উদ্যোগ নেন। তাঁর এই ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কূটনীতি বাংলাদেশকে কোনো বড় পরাশক্তির ‘স্যাটেলাইট স্টেট’ হওয়া থেকে রক্ষা করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম অর্থনৈতিক সত্তা হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করে।
জিয়া মডেল ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা: শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন দুর্বল রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে একটি ডেভেলপমেন্টাল রিপাবলিক নির্মাণের স্থপতি। তাঁর এই দর্শনের পুনর্জাগরণই হতে পারে বাংলাদেশের বর্তমান সংকট উত্তরণের বৌদ্ধিক সূচনা বিন্দু। জিয়াউর রহমানের এই মডেলটি আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক কারণ বর্তমানের সপ্তভুজ লৌহ কাঠামো ভাঙতে তাঁর সেই দেশপ্রেম, সততা, ইনস্টিটিউশনাল ডিসিপ্লিন, স্বজনপ্রীতিমুক্ত এবং মেধাভিত্তিক প্রশাসনিক নেতৃত্বের বিকল্প নেই। তাঁর দেখানো পথে একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের সমন্বয়ই হতে পারে ‘টপ-ডাউন’ অলিগার্কি থেকে ‘বটম-আপ’ জন-আকাঙ্ক্ষার অর্থনীতিতে ফেরার একমাত্র পথ।
লেখক: বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা, অর্থনীতির শিক্ষক ও গবেষক
[email protected]