স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রযুক্তির বাজারে ইলন মাস্কের স্টারলিংক দীর্ঘদিন ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে। সেই অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এবার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন মেগা প্রকল্প নিয়ে মাঠে নেমেছে চীন।

২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ১০ হাজারেরও বেশি স্যাটেলাইট স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে ‘স্পেসসেল’। রাজনৈতিক ও নীতিগত জটিলতার কারণে যেখানে স্টারলিংক সুবিধা করতে পারছে না, ঠিক সেসব দেশকেই সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে বেছে নিয়েছে চীনের এই প্রতিষ্ঠান।

বর্তমানে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে স্টারলিংকের সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। বিপরীতে স্পেসসেলের রয়েছে মাত্র কয়েকশ স্যাটেলাইট। তবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রথম পর্যায়ের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালুর জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্যাটেলাইট ইতোমধ্যেই কক্ষপথে রয়েছে এবং খুব দ্রুত এই সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অন্তত ডজনখানেক দেশের সঙ্গে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালুর বিষয়ে আলোচনা করছে স্পেসসেল।

হংকংভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অরবিটাল গেটওয়ে কনসাল্টিং’-এর প্রতিষ্ঠাতা ব্লেইন কার্সিওর মতে, স্পেসসেল এমন সব দেশ ও অঞ্চলকে লক্ষ্য করছে, যেখানে স্টারলিংক রাজনৈতিক কিংবা নীতিগত কারণে বাধার মুখে পড়েছে।

প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট রেস্ট অব ওয়ার্ল্ড-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, স্পেসসেলের কৌশল অনেকটাই চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডির মতো। সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকির মাধ্যমে যেমন বিওয়াইডি বিশ্ববাজারে দ্রুত শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, স্পেসসেলও একই ধরনের পথ অনুসরণ করছে।

যদিও স্পেসসেলের সাম্প্রতিক তহবিল সংগ্রহ স্টারলিংকের মূল প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের বিপুল অর্থায়নের তুলনায় অনেক ছোট, তবুও প্রশ্ন উঠেছে—চীনের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কি এই প্রতিযোগিতায় স্পেসসেলকে দ্রুত এগিয়ে নিতে পারবে?

স্পেসসেল আসলে কী?

‘স্পেসসেল কনস্টেলেশন’ বা চীনা ভাষায় ‘কিয়ানফান’ নামে পরিচিত এই প্রকল্পটি ২০২৩ সালে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত ‘শাংহাই স্পেসকম স্যাটেলাইট টেকনোলজি’ (SSST) চালু করে।

বিশ্বব্যাপী উচ্চগতির, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা দেওয়াই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেইজিং রিভিউ-এর ভাষ্য অনুযায়ী, স্পেসসেল প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো পশ্চিমা অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে চীনের বিদেশি প্রকল্প, সামুদ্রিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক কার্যক্রমে স্বাধীন যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

এসএসএসটির পেছনে রয়েছে ‘চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস’ এবং সাংহাই মিউনিসিপ্যাল পিপলস গভর্নমেন্টের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।

প্রকল্পটির প্রাথমিক বিনিয়োগ ছিল ৬৭০ কোটি ইউয়ান, যা সম্পূর্ণভাবে চীনা অর্থায়নে পরিচালিত। এই বিনিয়োগে কেবল চীনভিত্তিক করপোরেট ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে।

যদিও স্পেসসেলের কার্যক্রম সম্পর্কে জনসমক্ষে খুব বেশি তথ্য নেই, তবু ব্যবসায়িক তথ্যভান্ডার কিচাচার তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা ছিল ৩৪৩ জন। একই সময়ে লিংকডইনে ২০১ থেকে ৫০০ জন কর্মীর তথ্য দেখানো হয়েছে এবং ক্যারিয়ার প্ল্যাটফর্ম জোবউ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি ২২৪টি নতুন পদে নিয়োগ দিয়েছে।

এ পর্যন্ত কতটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে?

২০২৪ সালের আগস্টে ‘লং মার্চ–৬এ’ রকেটের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ১৮টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে স্পেসসেল।

এরপর অক্টোবরে আরও ১৮টি এবং ডিসেম্বরে তৃতীয় দফায় আরও ১৮টি স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো হয়।

চলতি বছরের জুনে ‘লং মার্চ–৮’ রকেট ব্যবহার করে ১২তম উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করার পর বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথে স্পেসসেলের সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা প্রায় ২০০-তে পৌঁছেছে।

কোম্পানির দাবি, সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ পর্যবেক্ষণসহ প্রাথমিক বাণিজ্যিক সেবা চালুর জন্য এখন তাদের পর্যাপ্ত স্যাটেলাইট রয়েছে।

২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে, তখন তাদের সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা ৬৪৮-এ পৌঁছাতে পারে।

এসএসএসটির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই নেটওয়ার্কে ১৫ হাজারেরও বেশি স্যাটেলাইট যুক্ত করা হবে, যাতে বিশ্বব্যাপী পূর্ণাঙ্গ কাভারেজ নিশ্চিত করা যায়।

স্টারলিংকের সঙ্গে স্পেসসেলের তুলনা

বর্তমানে বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ গ্রাহক নিয়ে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারের শীর্ষে রয়েছে স্টারলিংক। কক্ষপথে তাদের প্রায় ১০ হাজার ৪১৩টি সক্রিয় স্যাটেলাইট রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই সংখ্যা ৪২ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্যদিকে স্পেসসেল এখনো গ্রাহকসংখ্যা ও স্যাটেলাইট—উভয় ক্ষেত্রেই অনেক পিছিয়ে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজারের বেশি স্যাটেলাইট পরিচালনার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। কারণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নিজ দেশেও স্পেসসেলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত আরেক প্রতিষ্ঠান ‘স্যাটনেট’-এর সঙ্গে, যারা ‘গুওওয়াং’ নামে একই ধরনের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে।

স্যাটনেট মূলত চীনের অভ্যন্তরীণ টেলিকম ও জাতীয় নিরাপত্তা খাতে গুরুত্ব দিলেও আন্তর্জাতিক বাজারে স্টারলিংকের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্পেসসেলকেই এগিয়ে রাখা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে প্রায় ৩০টি দেশের সঙ্গে সেবা চালুর বিষয়ে আলোচনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে যেখানে স্টারলিংকের কার্যক্রম রাজনৈতিক বা নীতিগত কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে তারা।

ব্রাজিলে স্টারলিংক ও সরকারের দ্বন্দ্বের পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটির টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থা আনাতেল স্পেসসেলকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেয়।

একইভাবে কাজাখস্তানেও ডেটা সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নীতিমালা নিয়ে স্টারলিংকের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে স্পেসসেল সেখানে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করে।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে স্পেসসেল। এর ফলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন বিমানে ইন-ফ্লাইট ওয়াই-ফাই সেবায় স্পেসসেলের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews