অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে সবচেয়ে বেশি ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের। এ সময়ে এ মন্ত্রণালয়ে তেমন কোনো কাজ হয়নি। উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, মাহফুজ আলম, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও সচিব মাহবুবা ফারজানা তথ্য মন্ত্রণালয়কে তেমন কোনো কিছুই দিতে পারেননি। হঠাৎ উপদেষ্টা হওয়ার সুযোগে নাহিদ ইসলামের সময় কেটেছে ‘ভাব’ নিতে নিতে। মাহফুজের সময় কেটেছে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে। রিজওয়ানার সময় কেটেছে অতি কথনে। আর মাহবুবা ফারজানার সময় কেটেছে উপদেষ্টাদের প্রটোকল দিয়ে ও নিজেকে পরিপাটি রেখে। গণমাধ্যমের কর্মীদের কাছে দুই উপদেষ্টার পরিচিতি ছিল ‘চ্যাড়া উপদেষ্টা’ আর রিজওয়ানার পরিচতি ছিল ‘ট্যাপ রেকর্ডার’ হিসেবে। আর সচিব মাহবুবা ফারজানার পরিচিতি ছিল ‘প্রটোকল অফিসার’ হিসেবে। এ চারজন বিগত সরকারকে কিছু দিতে পারেনি বা তাদের দ্বারা কিছু টাউট-বাটপারের ব্যক্তিগত উপকার হলেও গণমাধ্যমের কোনো উপকার হয়নি। এমনকি প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডের মর্যাদাও রক্ষা করতে পারেনি।
স্বাধীনতার পর থেকে ২০২১ সালের ১৪ মার্চ পর্যন্ত এ মন্ত্রণালয়ের নাম ছিল তথ্য মন্ত্রণালয়। আওয়ামী সরকারের সময়ে ড. হাসান মাহমুদ যখন মন্ত্রী তখন এর নাম পরিবর্তন করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় করা হয়। মন্ত্রণালয়টির ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের সব বিখ্যাত ব্যক্তিরা এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ডাকসাইটের আমলারা এ মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। যাদের নাম এখনো শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। এটি সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়। শুধু গণমাধ্যম নিয়ে এ মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়, দেশের স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ইমেজ তৈরির কাজটি করার দায়িত্বও অনেকখানি। গুরুত্বপূর্ণ এ মন্ত্রণালয়টির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন শুরু হয় ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে, যখন মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রথম মন্ত্রী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ। তার পর শেখ মুজিবুর রহমান, মোহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী, শেখ আবদুল আজিজ, এম কোরবান আলী, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, হাবিবুল্লাহ খান, শামসুল হুদা চৌধুরী, তোফাজ্জল হোসেন খান, সৈয়দ নাজিমুদ্দিন হাশিম, এ আর ইউসুফ, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী জাফর আহমেদ, বেগম খালেদা জিয়া, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, এম শামসুল ইসলাম, শেখ হাসিনা, ড. আবদুল মঈন খান, তরিকুল ইসলামসহ বিখ্যাত ও খ্যাতিমান রাজনৈতিক নেতারা। সাংবাদিকদের মধ্যে তথ্যমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন তাহের উদ্দিন ঠাকুর, সিরাজুল হোসেন খান, আনোয়ার জাহিদ, সৈয়দ দিদার বখত, ড. মিজানুর রহমান শেলী। বিভিন্ন সময়ে এ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ড. আকবর আলী খান, শামসুল হুদা চৌধুরী, এ আর এস দোহা, মাহবুবুল আলম, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এসব ব্যক্তিত্বের পাশে নাহিদ ইসলাম, মাহফুজ আলম, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নাম কেমন যেন বড্ড বেমানান মনে হয়।
এই মন্ত্রণালয়ের প্রথম সচিব ছিলেন এম হোসেন আলী। তার পর বাহাউদ্দিন চৌধুরী, খোরশেদ আলম সিএসপি, আনিসুজ্জামান খান সিএসপি, জহুরুল হক সিআইএস, এটিএম শামসুল হক সিএসপি, এবিএম গোলাম মোস্তফা সিএসপি, আনম ইউসূফ সিএসপি, মনজুর মোরশেদ সিএসপি, এজেডএম নাসিরুদ্দিন সিএসপি, কাজী মুহাম্মদ মনজুরে মওলা সিএসপি, নুরুদ্দিন আহমেদ, আলম মাসুদ সিএসপি, সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ সিএসপি, ড. মুহম্মদ মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার হায়দার আলী, হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, মরতুজা আহমেদসহ ডাকসাইটের ও অভিজ্ঞ, সিনিয়র আমলাদের তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হতো। আওয়ামী লীগ সরকার খাজা মিয়াকে সচিবের দায়িত্ব দিয়ে এ মন্ত্রণালয়ের ইমেজ অনেকটা মøান করেছে। তার পর থেকে মেধাবী, যোগ্য, দক্ষ কোনো আমলাকে এ মন্ত্রণালয়ে সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বর্তমান তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানা গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পদোন্নতি পেয়েছেন। ১৮ মাসে যোগ্যতা, দক্ষতা বা মেধার কোনো প্রমাণ তিনি রাখতে পারেননি বলে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জীবন বাজি রেখে রাজনীতি করছেন। মৃত্যুর দুয়ার থেকে তিনি ফিরে এসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তথ্য মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরে তিনি দলের অত্যন্ত ত্যাগী নেতা জহির উদ্দিন স্বপনকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি একজন সাবেক মেধাবী ছাত্রনেতা। অনেক ত্যাগ ও কাঠখড় পুড়িয়ে তিনি রাজনীতিতে টিকে আছেন। হামলা-মামলা মোকাবিলা করে তিনি আজ মন্ত্রী হয়েছেন। ইয়াসের খান চৌধুরী হলেন প্রতিমন্ত্রী। ইয়াসের খান চৌধুরী একজন তথ্যপ্রযুক্তি বিজ্ঞানী। দীর্ঘদিন বিবিসি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক লন্ডনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার আগে বিশ্বের সর্ববৃহৎ কম্পিউটার টেকনোলজি কোম্পানি আইবিএম ও ভোডাফোনে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে কর্মরত ছিলেন। ক্লিন ইমেজের মানুষ। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা নিযুক্ত হয়েছেন ডা. জাহেদ উর রহমান। গণমাধ্যমে তিনি পরিচিত মুখ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে তার যোগাযোগ ভালো। তাদেও চেয়ারের ওপরে অনার বোর্ডে বিখ্যাতদের নামও আছে, অখ্যাতদের নামও আছে। তারা যদি খ্যাতিমান ব্যক্তিদের কাতারে নিজেদের নাম রাখতে চান, তাহলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধার করতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়কে আগের মর্যাদায় ফিরিয়ে নিতে হবে বলে মনে করেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা।