স্থানিক, আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক যুদ্ধে কখনো কারো চূড়ান্ত জয় হয় না। তবে, ঠকে কমবেশি সবাই। পরাভূত হয় মানবতা। প্রাণ যায় মাখলুকের। তছনছ হয় সম্পদসহ সভ্যতা। তালহারা হয়ে যায় অর্থনীতি। বিশ্বায়নের এ যুগে তা উগান্ডা-রুয়ান্ডা, নেপাল-ভুটানে হলেও তাপ পৌঁছে যায় যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের গায়েও। যে নিয়মে সেই রুশ-ইউক্রেনের ঘা এখনো সইছে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের অর্থনীতি। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান সামরিক অভিযানের কারণে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরো আকাশচুম্বী হওয়ার শঙ্কা আছে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসা তেলের অর্ধেকও বন্ধ হয়ে গেলে তেলের ব্যারেল ১৫০ ডলারে উঠে যেতে পারে। মার্কিন নৌবাহিনী এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করা ট্যাংকারগুলোকে আর পাহারা দিতে না পারায় এমন হতে পারে বলে আশঙ্কা। ইরানে হামলার প্রথম দিনেই দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত দুই-তিন দিনে ইউরোপের দেশগুলোতে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ডিজেলের দামও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। গ্যাসনির্ভর দেশগুলো এখন পেট্রোলিয়াম মজুদ করতে শুরু করেছে। বরাবরই যুদ্ধবাজদের যুক্তির অভাব হয় না। এবারো হয়নি। মার্কিন সেনাদের বলা হয়েছিল- ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ‘ঈশ্বরের ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ’।
ধর্ম, ঈশ্বর, বিশ্বাস নিয়ে ধোঁকাবাজি কেবল গরিব দেশে নয়, সভ্যতার গর্ব করা দেশগুলোতেও চলে। মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা ইরান যুদ্ধে সম্পৃক্ততাকে জায়েজ করতে সেনাদের সামনে তুলে ধরেছে বাইবেলে বর্ণিত ‘শেষ জমানা’-সংক্রান্ত চরমপন্থী খ্রিষ্টান বয়ান। একটি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার কাছে জমা পড়া অভিযোগ থেকে এমন খবর জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন-এমআরএফএফ জানিয়েছে, তারা নৌবাহিনী (মেরিন), বিমানবাহিনী, স্পেস ফোর্সসহ সশস্ত্রবাহিনীর সব শাখা থেকে দুই শতাধিক অভিযোগ পেয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের দেখা ওই বয়ানের মূল ভাষ্য : এই যুদ্ধ ‘ঈশ্বরের ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ’। যেখানে আছে আর্মাগেডন (চূড়ান্ত মহাযুদ্ধ) এবং যিশুখ্রিস্টের আসন্ন প্রত্যাবর্তনের কথা। স্বয়ং যিশুখ্রিস্ট নাকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মনোনীত করেছেন, যেন তিনি ইরানে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে আর্মাগেডন শুরু করেন এবং এর মাধ্যমে পৃথিবীতে যিশুর প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত হয়। এর বিপরীত বাস্তবতা হচ্ছে, বোমার আগুন এখন যুক্তরাষ্ট্রের ঘরেই লাগার লক্ষণ।
এই হামলা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়; এটি এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের সীমা, সাংবিধানিক কর্তৃত্ব, তথ্যের সত্যতা- সবই রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কাছে গৌণ হয়ে উঠছে। একবার যদি এই দরজা খুলে যায়, তা হলে সহিংসতার সেই নজির আর কেবল বিদেশের মাটিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রে জনমত ক্রমেই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। যে প্রেসিডেন্ট তথ্য বা আইনের ধার ধারেন না, তার হাতে এই ক্ষমতা থাকলে বিষয়টি চিন্তার হয়ে দাঁড়ায়। বিদেশে কোনো স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ এক কথা; কিন্তু একই ক্ষমতা যদি দেশের ভেতরে নিজের বিরোধীদের ‘দেশের শত্রু’ বলে দমন করতে ব্যবহার করা হয়, তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এখন সেই আশঙ্কাও সামনে চলে এসেছে। প্রশ্ন তাই ইরানকে ঘিরে নয়, প্রশ্ন আমেরিকার গণতন্ত্রকে ঘিরে। যেদিন তেহরানের মাটিতে বোমা পড়তে শুরু করল, সেদিনই ওয়াশিংটন পোস্ট বলেছে, হোয়াইট হাউজ নাকি শিগগির একতরফা নির্বাহী আদেশ জারি করতে পারে, যাতে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কে, কখন, কিভাবে ভোট দেবে, তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট নিজের হাতে টেনে নিতে পারেন।
মার্কিন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১ স্পষ্ট জানায়- কংগ্রেসীয় নির্বাচনের নিয়ম নির্ধারণের ক্ষমতা মূলত অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে, যদিও কংগ্রেস তা অতিক্রম করতে পারে। প্রেসিডেন্টের হাতে একতরফাভাবে ডাকযোগে ভোট নিষিদ্ধ করা বা বাধ্যতামূলক ভোটার পরিচয়পত্র চালু করার ক্ষমতা নেই। রিপাবলিকানদের প্রস্তাবিত ‘সেভ অ্যাক্ট’-এ ভোটার আইডির কথা থাকলেও তা এখনো আইন হয়ে ওঠেনি। এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন এসে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান আন্তর্জাতিক সঙ্ঘাত শুরু করার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসকে দিয়েছে। একই সাথে জাতিসঙ্ঘ সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদ একতরফা শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে, তবু আইনি কর্তৃত্বের ঘাটতি হামলা ঠেকাতে পারেনি। ইরানে হামলার পক্ষে ট্রাম্প যে যুক্তি দেখিয়েছেন, তা প্রমাণহীন ও অতিরঞ্জিত। এই প্রবণতা কেবল পররাষ্ট্রনীতি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। ইরান-সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত হলে বোমাবর্ষণ ও পাল্টা হামলার আবহকে সামনে রেখে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের যুক্তি তৈরি করা আরো সহজ হবে। জাতীয় নিরাপত্তার জরুরি অবস্থা একবার ঘোষিত হলে, তা প্রায়ই ক্ষমতার প্রসার ঘটায়। যথারীতি এবারো পুরনো কাণ্ডকীর্তি ঘটা শুরু করেছে। গত বছরের জুনের শেষের দিকে গাজায় যখন ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছিল, ঠিক তখন ইসরাইলের হাইফা ও জেরুসালেমের মতো বড় বড় শহরে একটি বিশেষ ছবিসহ বিলবোর্ড ওঠে। গত শনিবার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের রাজধানী তেহরানে প্রায় ২০০ জঙ্গিবিমান নিয়ে হামলা চালায়, ঠিক সে মুহূর্তেও জায়ান্ট স্ক্রিনের সেই বিলবোর্ড দেখা যাচ্ছিল। বিলবোর্ডের ছবিতে ১২টি মাথা দেখা যাচ্ছে। মাঝখানের সবচেয়ে বড় মাথাটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
ট্রাম্পের ডানে সৌদি আরবের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ বিন সালমান। তারপর একে একে রয়েছেন- মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারা (এর আগে এই ব্যক্তি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসের নেতা ছিলেন। তখন তাকে সবাই আবু মোহাম্মাদ আল-জোলানি নামে চিনত। যুক্তরাষ্ট্র তার মাথার দাম এক কোটি ডলার ঘোষণা করেছিল), লেবাননের সেনাপ্রধান (তাকে ‘লেবাননের প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়) জোসেফ আউন এবং জর্দানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। ট্রাম্পের বাঁয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তারপর একে একে রয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আমির শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, সুদানের ডি ফ্যাক্টো রাষ্ট্রপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল বুরহান, মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মুহাম্মদ এবং কাতারের আমির হামাদ বিন খলিফা আল থানি। ছবির মাঝখানে শিরোনামের মতো করে লেখা ‘দ্য আব্রাহাম অ্যালায়েন্স’। তার নিচে লেখা ‘ইট ইজ টাইম ফর আ নিউ মিডল-ইস্ট’। বাংলায় যার অর্থ— ‘আব্রাহাম জোট : এখন সময় নতুন মধ্যপ্রাচ্যের’। বিলবোর্ডটি টানিয়েছে ‘কোয়ালিশন ফর রিজওনাল সিকিউরিটি’ নামের একটি ইসরাইলি উদ্যোগ।
জেরুসালেমসহ আরো কিছু শহরে বিশাল বিশাল পোস্টার লাগানো হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে- মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে হাত মেলাচ্ছেন। তাদের পেছনে বড় ইসরাইলি পতাকা এবং পোস্টারে লেখা : ‘ইসরাইল প্রস্তুত’। সেখানে লেখা আছে, ‘ইট ইজ টাইম ফর আ নিউ মিডলইস্ট’। নমুনা কিছুটা ভারতের আরএসএস-সমর্থিত মোদি সরকারের ‘অখণ্ড ভারত’ প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশসহ আশপাশের ভূ-খণ্ডকে নিজের ভূ-খণ্ডের সাথে একীভূত করার ধারণার মতো। মুসলমান-ইহুদি-খ্রিষ্টান- এই তিন সম্প্রদায়েরই ধর্মীয় ভাষ্যমতে, ইসরাইল রাষ্ট্রটি যে পয়গম্বরের নামে হয়েছে, সেই হজরত ইসরাইলের ১২ পুত্র ছিলেন। তাদের বংশধররাই আজকের সেমেটিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের পূর্বপুরুষ। যেহেতু ইসরাইলের প্রশাসন সাধারণত প্রতিটি পদক্ষেপ নেয়ার পেছনে তাদের ধর্মীয় ইঙ্গিতবাহী প্রতীক ব্যবহার করে, সেহেতু বিলবোর্ডের ‘১২’ সংখ্যাটিকে তারা ইসরাইলের ১২ পুত্রের ভ্রাতৃত্বকে একটি ‘বিবলিক্যাল মেটাফোর’ হিসেবে উপস্থাপন করে থাকতে পারে। ২০২০ সালে ট্রাম্প যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তার জামাতা জ্যারেড কুশনার ছিলেন তার মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সিনিয়র উপদেষ্টা। তিনি সে সময় মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কুশনার নিজে একজন কট্টর জায়নবাদী ইহুদি। সে কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ইসরাইলের স্বার্থে কাজ করতে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর উদ্যোগ নেন। তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেন তার শ্বশুর ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখন কি সেটারই ফলোআপ?
বাতকে বাত বলা হয়ে থাকে— যুদ্ধে যারা যায় তারা যুদ্ধ চায় না। যারা চায় তারা যুদ্ধে যায় না। আসলে যুদ্ধ বা হামলা শুরু হয়ে গেলে তখন কে কী বলল, তাতে যুদ্ধবাজের কিচ্ছু যায় আসে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই বলে রেখেছিলেন, ইরান কথামতো না চললে যুক্তরাষ্ট্র এমন হামলা করবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। ঠিকই ঘটনা ঘটিয়ে দিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যমেয়াদি নির্বাচনের প্রথম প্রাইমারিগুলোর তিন দিন আগে ইরানে হামলা চালায় ট্রাম্প প্রশাসন। আগামী দুই বছরের জন্য ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের কংগ্রেসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখবে কি না তা নির্ধারণ করবে এ নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মিলে হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে গোষ্ঠীসুদ্ধ হত্যার ঘটনাকে ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার গুরুতর লঙ্ঘন বা জাতিসঙ্ঘ সনদের নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নিয়মের পরিপন্থী বলে যত গাল দেয়াই হোক, ট্রাম্প আপাতত থামছেন না, তা পরিষ্কার। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কেবল ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বই দেননি, রাষ্ট্রটির চেহারাও ঠিক করে দিয়েছিলেন। হামলার জবাবে তেহরান দৃশ্যত চারদিকে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য এক নজিরবিহীন অস্থিরতার মুখে পড়েছে। চলমান এই ঝড়ের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের সাধারণ মানুষ। গত ডিসেম্বরে হাজার হাজার ইরানি রাস্তায় নেমে আসে। সরকার কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন করে। অনেককে গ্রেফতার করা হয়। বিক্ষোভের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল- ‘সাহায্য আসছে’ বলে। তবে খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের জনগণের ভবিষ্যৎ এখন আরো বেশি বিপজ্জনকভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ইরানে হামলা প্রশ্নে মধ্যমেয়াদি নির্বাচনের প্রথম প্রাইমারিগুলোর তিন দিন আগে ট্রাম্প দেখিয়ে দিলেন গোটা বিশ্বকে। দিলেন কাঁপিয়েও। তা খোদ তার নিজ দেশের মানুষ অপছন্দ করলেও। ইরানের যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সায় নেই দেশটির নাগরিকদের। প্রতি চারজনের মধ্যে মাত্র একজন মার্কিনি মনে করেন, ইরানে হামলা ঠিক হয়েছে। এ তথ্য উঠে এসেছে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের জরিপে। দূরের সেই যুদ্ধ কেবল দূরের জন্য নয়, কাছে-কিনারে সবার জন্যই উদ্বেগের। বাদ নেই বাংলাদেশও।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট