বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে সুদীর্ঘকাল ধরেই পারিবারিক ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাব বিস্তারকারী ভূমিকা পালন করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেখা গেছে রাজনীতির ‘দ্বিতীয় প্রজন্মের’ এক অভূতপূর্ব ও শক্তিশালী উপস্থিতি। দীর্ঘ সময় ধরে চলা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও পটপরিবর্তনের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, নতুন নেতৃত্ব এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার এক অনন্য মিশেল তৈরি হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকা থেকে অন্তত ২৯ জন এমন প্রার্থী সংসদ সদস্য হিসেবে সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন, যাঁদের পিতা বা মাতা একাধিকবার সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা জাতীয় রাজনীতির শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক ছিলেন। সরাসরি নির্বাচিত ২৯ জনের মধ্যে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ২৬ জন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২ জন এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) ১ জন রয়েছেন। এ ছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়নে আরও ৫ জন নেত্রী নির্বাচিত হয়েছেন, যাঁদের পিতারাও সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। সব মিলিয়ে বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে দ্বিতীয় প্রজন্মের মোট সংসদ সদস্যের (এমপি) সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪ জনে, যা দেশের সংসদীয় ইতিহাসের এক নতুন রেকর্ড।
পিতা-মাতার দেখানো পথেই রাজপথে ও সক্রিয় ভোটের মাঠে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন এই তরুণ ও অভিজ্ঞ নেতারা। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও তাঁরা দলীয় পতাকা সমুন্নত রেখেছিলেন। এবারের নির্বাচনে বিশেষ করে বিএনপির দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রার্থীদের মাঝেই জয়ের হার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। কয়েকজন তরুণ নেতা তাঁদের পিতাদের হারানো আসন দীর্ঘ সময় পর পুনরুদ্ধার করে বড় ধরনের চমক দেখিয়েছেন।
নতুন সংসদে স্থান পাওয়া এই ৩৪ জন সংসদ সদস্যের সিংহভাগই দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন, অর্থনীতি কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী। তবে দেশের সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক বোদ্ধারা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন যে, তরুণ ও আধুনিক মননসম্পন্ন এই সাংসদেরা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং একটি কল্যাণমুখী, বৈষম্যহীন ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অত্যন্ত কার্যকর ও দূরদর্শী ভূমিকা রাখবেন।
দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয় প্রজন্মের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু ও প্রধান আকর্ষণ ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে তিনি শুধু পারিবারিক ঐতিহ্যের বাহকই নন, বরং দলের আধুনিকায়ন ও পুনর্গঠনের প্রধান কারিগর। গত এক দশকে তারেক রহমান দলের ভেতর যে শক্তিশালী ডিজিটাল ও ভার্চুয়াল কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, তা তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ সুদৃঢ় করতে অনন্য ভূমিকা রাখে।
এবারের নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসনেই বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে নিজের নেতৃত্বের সক্ষমতা ও আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা প্রমাণ করেছেন। ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমান ৭২ হাজার ৬৯৯ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী খালিদুজ্জামান পান ৬৮ হাজার ৩০০ ভোট। অন্যদিকে তাঁর চিরচেনা রাজনৈতিক ঘাঁটি বগুড়া-৬ আসনে তিনি পান ২ লাখ ১৬ হাজার ২৮৪ ভোট, যেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের আবিদুর রহমান সোহেল দাঁড়িয়ে পাল্লা প্রতীকে পান ৯৭ হাজার ৬২৬ ভোট। নির্বাচনের পর তিনি সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় দেশের ইতিহাসে প্রথম ‘দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রধানমন্ত্রী’ পাওয়ার এক নতুন দিগন্তের সূচনা হলো।
অভিজ্ঞতার আলোয় প্রবীণদের উত্তরসূরিরা
বর্তমান সংসদে এমন বেশ কয়েকজন বর্ষীয়ান ও নীতিপ্রবীণ নেতা স্থান পেয়েছেন, যাঁদের পূর্বসূরিরা ব্রিটিশ ভারত কিংবা পূর্ব পাকিস্তানের আইনসভা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতিতে গভীর প্রভাব রেখেছিলেন।
মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম (ভোলা-৩): বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির এই সদস্য এবার নিয়ে মোট ৭ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সংসদে এসেছেন। তাঁর বাবা ডা. আজাহার উদ্দিন আহমদ ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং তৎকালীন বিরোধী দলের ডেপুটি লিডার।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১১): বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর রাজনৈতিক পটভূমি পারিবারিকভাবেই অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাঁর পিতা মাহমুদুন্নবী চৌধুরী ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য (এমএলএ) এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের যোগাযোগ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু (সিরাজগঞ্জ-২): বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া টুকুর পিতা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের আইনসভার সদস্য (এমএসএ) এবং তৎকালীন পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী। ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু নিজে এর আগে চতুর্থ, পঞ্চম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মন্ত্রিসভায় চমক ও দীর্ঘদিনের আসন পুনরুদ্ধার
পিতার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করে এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক দুর্গ পুনরুদ্ধার করে এবারের ত্রয়োদশ সংসদে মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিয়েছেন বেশ কয়েকজন তরুণ ও মধ্যম সারির জনপ্রতিনিধি।
আফরোজা খানম রিতা (মানিকগঞ্জ-৩): চারবারের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত শিল্পপতি হারুনার রশিদ খান মুন্নুর মেয়ে আফরোজা খানম ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাইদ নূরকে (৬৪,২৪২ ভোট) বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেন। স্বাধীনতার পর মানিকগঞ্জ-৩ আসন থেকে প্রথম নারী এমপি হিসেবে ইতিহাস গড়ার পাশাপাশি তিনি মন্ত্রিসভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী হিসেবে স্থান পেয়েছেন।
জাকারিয়া তাহের সুমন (কুমিল্লা-৮): তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত একেএম আবু তাহেরের পুত্র এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাকারিয়া তাহের সুমন এবার বিজয়ী হয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। ২০০৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর উপ-নির্বাচনে প্রথমবার বিজয়ী হওয়া সুমন বরুড়া অঞ্চলে দলের প্রধান কাণ্ডারি হিসেবে পরিচিত।
আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন (পিরোজপুর-২): মহান মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরের বেসামরিক প্রধান ও সাবেক এমপি নূরুল ইসলাম মঞ্জুর-এর ছেলে সোহেল মনজুর এবার বিজয়ী হয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন।
ইশরাক হোসেন (ঢাকা-৬): ঢাকার অবিভক্ত নগরের সাবেক সফল মেয়র ও সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার উত্তরসূরি ইশরাক হোসেন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ৭৮,৮৫০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তিনি জামায়াতের প্রার্থী মো. আবদুল মান্নানকে ২৩,১৫৩ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। পুরান ঢাকার রাজনীতিতে তরুণদের মাঝে তুমুল জনপ্রিয় ইশরাক বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল (নাটোর-১): সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল ১ লাখ ২,৪১৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়ে বর্তমানে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনেরও সদস্য ছিলেন।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (যশোর-৩): দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত তরিকুল ইসলামের ছেলে অমিত ২ লাখ ১,৩৩৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়ে পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রেখেছেন। তিনি বর্তমানে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শামা ওবায়েদ (ফরিদপুর-২): বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী কে এম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে শামা ওবায়েদ ১ লাখ ২০,৯০৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন এবং বর্তমানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন (চট্টগ্রাম-৫): সাবেক মন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের ছেলে ব্যারিস্টার মীর হেলাল ১ লাখ ৪৭,০৫৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়ে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন।
ইয়াসের খান চৌধুরী (ময়মনসিংহ-৯): ১৯৯১ সালের সাবেক এমপি আনওয়ারুল হোসেন খান চৌধুরীর ছেলে ইয়াসের খান ৮৫,৪৭৩ ভোট পেয়ে প্রায় ৩৫ বছর পর বাবার আসনটি পুনরুদ্ধার করেছেন। তিনি বর্তমানে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তৃতীয় প্রজন্মের নেতৃত্ব ও অনবদ্য বিজয়
বর্তমান সংসদে পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারা শুধু দ্বিতীয় প্রজম্মেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা তৃতীয় প্রজন্মেও গড়িয়েছে, যা দেশের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
নায়াব ইউসুফ (ফরিদপুর-৩): সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের মেয়ে নায়াব ইউসুফ ১ লাখ ৪৮,৫৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর দাদা ইউসুফ আলী চৌধুরী (মোহন মিয়া) ছিলেন ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের প্রখ্যাত প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী।
হুমাম কাদের চৌধুরী (চট্টগ্রাম-৭): বিএনপির প্রয়াত নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুমাম কাদের ১ লাখ ১,০৪৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর দাদা এ কে এম ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তান সংসদের সাবেক স্পিকার। (একই পরিবারের অপর সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী চট্টগ্রাম-৬ আসন থেকে ১ লাখ ৩৭,২১২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন, যিনি আগেও দুবার এমপি ছিলেন)।
ধানের শীষ ও অন্যান্য প্রতীকে বিজয়ী হেভিওয়েট সন্তানদের পরিসংখ্যান
এবারের সংসদে দ্বিতীয় প্রজন্মের আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় প্রার্থী বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে নিজ নিজ এলাকার হাল ধরেছেন:
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির (সিলেট-১): সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত খন্দকার আবদুল মালিকের ছেলে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ১ লাখ ৭৬,৯৩৬ ভোট পেয়ে ঐতিহ্যবাহী সিলেট-১ আসনে জয়ী হয়েছেন।
সাঈদ আল নোমান (চট্টগ্রাম-১০): বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান এবং সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাঈদ আল নোমান বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে পাহাড়তলী-ডবলমুরিং আসন থেকে ১ লাখ ২২,৯৭৮ ভোট পেয়ে ক্লিন ইমেজের তরুণ নেতা হিসেবে অনায়াস জয় তুলে নিয়েছেন।
রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা (কুষ্টিয়া-১): দৌলতপুর উপজেলা বিএনপির দীর্ঘদিনের সভাপতি ও সাবেক এমপি প্রয়াত আহসানুল হক মোল্লার ছেলে বাচ্চু মোল্লা ১ লাখ ৬৫,০৮৫ ভোট পেয়ে প্রতিপক্ষকে ৮০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।
এম নাসের রহমান (মৌলভীবাজার-৩): দেশের সফলতম সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র এম নাসের রহমান ১ লাখ ৫৬,৭৫৭ ভোট পেয়ে বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন।
ড. রেজা কিবরিয়া (হবিগঞ্জ-১): সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ১১,৯৯৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
মোহাম্মদ নওশাদ জমির (পঞ্চগড়-১): সাবেক স্পিকার ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জমিরউদ্দিন সরকারের ছেলে নওশাদ জমির ১ লাখ ৭৬,১৬৯ ভোট পেয়ে ১৭ বছর পর দলের হারিয়ে ফেলা এই আসনটি পুনরুদ্ধার করেছেন।
এম মঞ্জুরুল করিম রনি (গাজীপুর-২): সাবেক মন্ত্রী আব্দুল মান্নানের ছেলে মঞ্জুরুল করিম রনি ১ লাখ ৮৮,৬০৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
মঈনুল ইসলাম খাঁন (মানিকগঞ্জ-২): সাবেক শিল্পমন্ত্রী শামসুল ইসলাম খানের ছেলে মঈনুল ইসলাম খাঁন ১ লাখ ৭৫,৭৭৬ ভোট পেয়ে বড় জয় পেয়েছেন।
ডা. এম এ মুহিত (সিরাজগঞ্জ-৬): সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মতিনের ছেলে ডা. এম এ মুহিত বাবার আসনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
ইঞ্জি. মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী (শেরপুর-২): সাবেক হুইপ প্রয়াত জাহেদ আলী চৌধুরীর ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ফাহিম চৌধুরী ১ লাখ ১৫,৪৫৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ (ভোলা-১): সাবেক মন্ত্রী নাজিউর রহমান মঞ্জুরের ছেলে এবং বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ ১ লাখ ৪,৪৬২ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তরুণ প্রজন্মের মাঝে তাঁর সাবলীল বক্তৃতা ও টকশোর কারণে ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।
মাসুদ সাঈদী (পিরোজপুর-১): সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছোট ছেলে মাসুদ সাঈদী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৩২,৬৫৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান (পাবনা-১): সাবেক মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে ১ লাখ ২৮,৪৬৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
সংরক্ষিত নারী আসনে উত্তরাধিকারের পঞ্চরত্ন
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়নে যে পাঁচজন নারী নেত্রী সংসদে এসেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই রাজপথের পরীক্ষিত মুখ এবং দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান।
সেলিমা রহমান: পিতা আবদুল জব্বার খান ছিলেন জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পিকার ও সংসদ সদস্য। সেলিমা রহমান নিজে দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য।
নিপুণ রায় চৌধুরী: পিতা নিতাই রায় চৌধুরী বর্তমান সংসদের এমপি ও সাবেক মন্ত্রী। নিপুণ রায় চৌধুরী বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মাঠের রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয়।
মাহমুদা হাবীবা: রাজশাহী-৫ আসনের সাবেক এমপি মরহুম মুহাম্মদ আয়েন উদ্দীনের মেয়ে এবং জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানা: চট্টগ্রাম-৫ আসনের সাবেক চারবারের এমপি ও জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ মরহুম সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের জ্যেষ্ঠ কন্যা। তিনি দীর্ঘ দেড় দশক ধরে রাজপথে ও আইনি অঙ্গনে অত্যন্ত সক্রিয়।
জেবা আমিন খান: পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আখতার উদ্দিন আহম্মেদের মেয়ে জেবা আমিন বর্তমানে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
চ্যালেঞ্জ ও সাধারণ মানুষের বিপুল প্রত্যাশা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে পরিবারভিত্তিক উত্তরাধিকার কোনো নতুন ঘটনা নয়; তবে ত্রয়োদশ সংসদের এই সামগ্রিক চিত্রটি ইঙ্গিত করছে যে রাজনৈতিক দলগুলো এখন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক পরিবারের উচ্চশিক্ষিত, আধুনিক মননসম্পন্ন ও পেশাদার উত্তরসূরিদের ওপর আরও বেশি আস্থা রাখছে।
তবে এই বিপুল সংখ্যক নতুন ও দ্বিতীয় প্রজন্মের সংসদ সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি যেমন তাঁদের নিজ নিজ পরিবারের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে, তেমনি তাঁদের সামনে নিয়ে এসেছে এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা। এলাকার সাধারণ মানুষ তাঁদের পূর্বসূরিদের জনসেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড যেভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন, এই নতুন নেতৃত্বের প্রতিও তাঁদের প্রত্যাশা ঠিক ততটাই আকাশচুম্বী। পারিবারিক পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁরা নিজেদের মেধা, সততা ও কর্মের মাধ্যমে কতটা জনবান্ধব হয়ে উঠতে পারেন, সেটাই এখন দেখার বড় বিষয়।