কিছু মানুষের জীবনে ফুটবল শুধু খেলা নয়, তাদের শৈশবের নিঃশ্বাস, তারুণ্যের আগুন, পরিচয়ের গভীরতম উচ্চারণ আর স্মৃতির ভেতরে জমে থাকা এক চিরসবুজ গান এই ফুটবল। সময় বদলায়, শহর বদলায়, জীবনের ঠিকানা দূরে সরে যায়, গ্যালারির গর্জন ম্লান হয়ে আসে। কিন্তু কিছু মানুষের ভেতরে ফুটবল কখনোই মরে না  নীরবে বেঁচে থাকে হৃদয়ের সবচেয়ে গোপন মাঠে। বাংলাদেশের ফুটবলের পরিচিত মুখ, সাবেক জাতীয় দলের মিডফিল্ডার আব্দুর রকিব সেই বিরল মানুষদের একজন, যার জীবনের প্রতিটি বাঁকে জড়িয়ে আছে ঘাসের গন্ধ, বলের শব্দ আর অসম্ভব স্বপ্নের দীর্ঘ পথচলা।

শরীয়তপুরের মাটিতে জন্ম নেওয়া সেই ছেলেটির ফুটবলযাত্রা শুরু হয়েছিল খুব সাধারণ এক বাস্তবতায়। গ্রামের বিকেলের নরম আলো, কাঁচা ধুলোমাখা মাঠ, খালি পায়ে বলের পেছনে ছুটে যাওয়া আর জয় মানে শুধু হাসির বিস্ফোরণের  মাঝেই জন্ম নেয় তার ফুটবলের প্রথম প্রেম। তখন হয়তো কেউই ভাবেনি, এই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন দেশের বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে যাবে।

ধীরে ধীরে প্রতিভার আলো ছড়িয়ে তিনি জায়গা করে নেন ঢাকার প্রতিযোগিতাময় ফুটবল অঙ্গনে। আবাহনী লিমিটেড ঢাকার জার্সি গায়ে যেমন তিনি মাঠে নেমেছেন, তেমনি ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র, বাংলাদেশের ফুটবলের তিন ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের হয়েও লড়েছেন একই আবেগে। প্রতিটি ক্লাব ছিল তার জন্য আলাদা অধ্যায়, আলাদা যুদ্ধক্ষেত্র, আলাদা গল্প।

মিডফিল্ডার হিসেবে তার ভূমিকা ছিল দুর্দান্ত। রকিব ছিলেন সেই অদৃশ্য সেতু, যার ওপর দিয়ে রক্ষণ থেকে আক্রমণের আলো চলাচল করত। বল নিয়ন্ত্রণ, খেলার ছন্দ বদলানো, সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করা, এসব কাজ তিনি করতেন এমনভাবে, যেন ফুটবল নয়, তিনি সময়কেই পরিচালনা করছেন।

জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামার মুহূর্তগুলো ছিল তার জীবনের সবচেয়ে পবিত্র অধ্যায়। লাল সবুজ পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত শোনার সময় বুকের ভেতরে যে কম্পন উঠত, তা আজও তার স্মৃতিতে জীবন্ত। সেই মুহূর্তগুলো তার কাছে শুধু ম্যাচ ছিল না; ছিল পরিচয়ের শিখর, ছিল দেশের হয়ে কিছু করার গর্ব।

সময় কাউকেই থামিয়ে রাখে না। খেলোয়াড়ি জীবনের পর্দা একদিন নেমে আসে। শুরু হয় নতুন অধ্যায়, কানাডার ক্যালগেরিতে। দূর দেশ, নতুন জীবন, নতুন বাস্তবতা। তবুও ফুটবল তাকে ছাড়েনি। সময়ের দূরত্ব তাকে আরও গভীরভাবে বুঝিয়েছে, ফুটবল আসলে শুধু খেলা নয় এমন এক ভাষা, যা হৃদয়ের ভেতর দিয়ে কথা বলে।

ক্যালগেরির শীতল আকাশের নিচে বসেও তার কানে ভেসে আসে ঢাকার গ্যালারির শব্দ, শরীয়তপুরের ধুলোর গন্ধ আর মাঠের সেই পুরোনো দৌড়ের শব্দ।

আর এই দূরত্বের মাঝেই তার ভেতরে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ব্রাজিল নামটি।

ছোটবেলা থেকেই সাম্বার দেশের ফুটবল তাকে মুগ্ধ করেছে। পেলে, জিকো, সক্রেটিস, রোমারিও, রোনালদো, রোনালদিনহো থেকে নেইমার, সব মিলিয়ে ব্রাজিল তার কাছে শুধু একটি দল নয়, বরং ফুটবলের সবচেয়ে রঙিন স্বপ্ন। প্রতিটি খেলা যেন তার কাছে একেকটি শিল্পকর্ম, যেখানে জয় পরাজয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সৌন্দর্য।

যদিও তার পরিবারের ভেতরে বিশ্বকাপ মানেই ভিন্ন ভিন্ন গল্প।

ছেলে জিনান সমর্থন করে পর্তুগালকে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর প্রতি তার ভালোবাসা যেন এক অটুট বিশ্বাস। অন্যদিকে স্ত্রী জিহান কানাডার পাশে। আয়োজক দেশের প্রতি তার টান স্বাভাবিকভাবেই গভীর।

বিশ্বকাপের সময় তাদের ঘর যেন এক ছোট্ট বিশ্বমানচিত্রে পরিণত হয়। এক পাশে ব্রাজিলের হলুদ, আরেক পাশে পর্তুগালের লাল সবুজ, আর মাঝখানে কানাডার লাল সাদা পতাকা। হাসি, তর্ক, উত্তেজনা আর ভালোবাসা, সব মিলিয়ে ফুটবল তাদের পরিবারকে আরও কাছাকাছি বেঁধে রাখে।

২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে তার ভেতরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। কারণ এই প্রথমবার কানাডা বিশ্বকাপ আয়োজন করছে, আর ক্যালগেরির মানুষ হিসেবে তিনি সেই ইতিহাসের খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন।

তবুও একটি আক্ষেপ তাকে বারবার ছুঁয়ে যায়। অনলাইনে বহু চেষ্টা করেও এখনো বিশ্বকাপের টিকিট তার হাতে এসে পৌঁছায়নি। রাত জেগে অপেক্ষা, বারবার চেষ্টা, প্রতিবার ব্যর্থতা, সবকিছুর মাঝেও তিনি হাল ছাড়েননি।

কারণ তার বিশ্বাস, একজন সাবেক ফুটবলারের জীবনে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে বিশ্বকাপ দেখা শুধু একটি ম্যাচ দেখা নয়; এটি নিজের জীবনের এক অসমাপ্ত অধ্যায় পূরণ করা।

হয়তো কোনো একদিন তিনি সত্যিই বসে পড়বেন সেই গ্যালারিতে। চোখের সামনে নেমে আসবে বিশ্বকাপের আলো, কানে বাজবে হাজার মানুষের গর্জন, আর হৃদয়ের গভীর থেকে তিনি আবার ফিরে যাবেন শরীয়তপুরের সেই প্রথম মাঠে, যেখানে শুরু হয়েছিল সবকিছু।

আব্দুর রকিবের গল্প তাই কেবল একজন সাবেক ফুটবলারের গল্প নয়। এটি এক দীর্ঘ যাত্রা, শরীয়তপুরের ধুলা থেকে ক্যালগেরির বরফে ছড়িয়ে থাকা এক আবেগের নাম।

কারণ কিছু মানুষের ভেতরে ফুটবল কখনো শেষ হয় না।

সে শুধু সময়ের ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে, নীরবে, গভীরভাবে, আর চিরকাল।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews