প্রায় ১১ কোটি ৩০ লাখ বছর আগে বর্তমান থাইল্যান্ডে রাজত্ব করা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম ডাইনোসরের জীবাশ্মের খোঁজ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সরোপড গোত্রের এ বিশালদেহী তৃণভোজী প্রাণীটি তীব্র উষ্ণ জলবায়ুর যুগে বাস করত। বড় আকৃতির কারণে এরা ছিল একেবারেই নির্ভীক।

দ্যা টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে- এ দানবীয় ডাইনোসরটি নিজের বড় আকারের কারণে কোনো শিকারী প্রাণীর ভয় ছাড়াই মনের আনন্দে গাছের মগডাল থেকে পাতা খেয়ে বেড়াত। এটিই ‘নাগাটাইটান চাইয়াফুমেনসিস’, যা এখন পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া সবচেয়ে বড় ডাইনোসর। গবেষকেরা নাগাটাইটানের কঙ্কালের বেশ কিছু অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করেছেন, এরা দীর্ঘ গলা, লম্বা লেজ, ছোট মাথা ও স্তম্ভের মতো চার পায়ের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

ক্রিটেসিয়াস যুগের এ ডাইনোসরের জীবাশ্ম বা ফসিল প্রথম দেখতে পান থাইল্যান্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় চাইয়াফুম প্রদেশের এক গ্রামবাসী। এরপর বিজ্ঞানীরা কয়েক বছর ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে এর মেরুদণ্ড, পাঁজর, শ্রোণিচক্র ও পায়ের হাড় উদ্ধার করেছেন, যার মধ্যে সামনের এক পায়ের হাড় লম্বায় প্রায় ৫.৮ ফুট বা ১.৭৮ মিটার। নাগাটাইটানের সামনের পায়ের হাড় ও পেছনের পায়ের হাড়ের আকৃতি বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ধারণা করছেন, এ ডাইনোসরটির ওজন ছিল প্রায় ২৫ থেকে ২৮ টন। উদ্ধারকৃত জীবাশ্মের মধ্যে এর মাথা বা দাঁত পাওয়া না গেলেও অন্যান্য সরোপড গোত্রের ডাইনোসরদের বৈশিষ্ট্য দেখে এর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ। এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’-এর প্যালেনটোলজি বা জীবাশ্ম বিজ্ঞান বিভাগের পিএইচডি শিক্ষার্থী থিটিওত সেথাপানিচসাকুল বলেছেন, নাগাটাইটান সম্ভবত একবারে অনেক পরিমাণে লতাপাতা ও উদ্ভিদ গিলে খেত। এরা পাইন জাতীয় সুচালো পাতার গাছ ও ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ খেত, যা চিবিয়ে খাওয়ার তেমন কোনো প্রয়োজন হতো না।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সে সময়ের জলবায়ু ছিল উপক্রান্তীয়, যেখানে বনাঞ্চলের পাশাপাশি সাভানা তৃণভূমি ও ঝোপঝাড়ের আধিক্য ছিল। নাগাটাইটান কেবল একাই নয়, বরং সে সময়ের আরও বিভিন্ন প্রজাতির ডাইনোসর ও ডানাওয়ালা উড়ন্ত সরীসৃপ ‘টেরোসর’-এর সঙ্গে একই পরিবেশে বাস করত। ওই আমলের নদীগুলোও ছিল কুমির ও মিষ্টি পানির হাঙরসহ হরেক রকমের মাছে ভরপুর।

ওই সময়ের বাস্তুতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শিকারী প্রাণীটি ছিল আফ্রিকার বিখ্যাত মাংসাশী ডাইনোসর ‘কারকারোডন্টোসরাস’-এর এক আত্মীয়, যা লম্বায় ছিল প্রায় ২৬ ফুট বা ৮ মিটার ও ওজনে ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৫ টন। গবেষক সেথাপানিচসাকুল বলেছেন, বড় আকারের মাংসাশী হলেও নাগাটাইটানের সামনে তা ছিল একেবারেই পুঁচকে। পূর্ণাঙ্গ আকৃতির একটি নাগাটাইটানকে শিকারের সাহস অন্য কোনো প্রাণীর ছিল না বললেই চলে।

পায়ের নিচে পিষ্ট হওয়ার ভয়ে শিকারী প্রাণীরা যে কোনো বড় সরোপড ডাইনোসরের সুস্থ ও পূর্ণবয়স্ক সদস্যদের আক্রমণ এড়িয়ে চলত। তবে এরা বুড়ো, অসুস্থ বা অরক্ষিত ডাইনোসর ছানাগুলোকে নিশানা করত। গবেষণার সহ-লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’-এর জীবাশ্ম বিজ্ঞানী পল আপচার্চ বলেছেন, ডিম থেকে ফোটার পর সরোপডরা খুব দ্রুত বড় হয়ে উঠত। আর এর পেছনে সম্ভবত শিকারী প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচার তাগিদ কাজ করত। এরা যত দ্রুত নিজেদের আকৃতি বড় করতে পারত তত দ্রুতই নিরাপদ হয়ে উঠত। কারণ বড় দেহের প্রাণীদের কাবু করা শিকারীদের পক্ষে অসম্ভব।

সরোপড গোত্রের বিভিন্ন ডাইনোসর ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণী। সেই হিসেবে নাগাটাইটান বড় হলেও দক্ষিণ আমেরিকার ‘আর্জেন্টিনোসরাস’ বা ‘পাটগোটাটান’-এর মতো ১০০ ফুট বা ৩০ মিটারের বেশি লম্বা ডাইনোসরদের চেয়ে আকারে কিছুটা ছোট ছিল। থাইল্যান্ডের বিভিন্ন মন্দিরে ফুটিয়ে তোলা এশীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের সর্পিল আকৃতির পৌরাণিক চরিত্র ‘নাগা’-এর নামানুসারে এ ডাইনোসরটির নামকরণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে থাইল্যান্ডে এখন পর্যন্ত ১৪টি ডাইনোসরের নামকরণ হয়েছে।

সাধারণত বেশ কিছু বড় সরোপড ডাইনোসরের নামের সঙ্গে ‘টাইটান’ শব্দটি যোগ থাকে। গবেষক সেথাপানিচসাকুল বলেছেন, নাগাটাইটানকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শেষ ‘টাইটান’ বলা যেতে পারে। কারণ ক্রিটেসিয়াস যুগের শেষদিকে এ অঞ্চলটি অগভীর সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। যার ফলে এখানে আর কোনো সরোপডের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডাইনোসরদের বৈচিত্র্য বুঝতে নাগাটাইটান বিজ্ঞানীদের দারুণভাবে সাহায্য করছে। এ অঞ্চলে খুব বেশি সরোপডের সন্ধান মেলেনি, যার মধ্যে নাগাটাইটানই সবচেয়ে বড় ও ভূতাত্ত্বিক যুগের দিক থেকে সবচেয়ে নতুন বা কনিষ্ঠ।

নাগাটাইটান সরোপডদের এমন এক উপ-গোত্রের সদস্য ছিল, যাদের হাড়ের ভেতরে অনেক বাতাস ভরা ফাঁপা অংশ ও পাতলা দেয়াল থাকত। এ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে তাদের বড় কঙ্কালটি ওজনে অনেক হালকা হত। এ বিশেষ উপ-গোত্রটির উৎপত্তি হয়েছিল প্রায় ১৪ কোটি বছর আগে। ধীরে ধীরে এরা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ও প্রায় ৯ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বুকে টিকে থাকা একমাত্র সরোপড ডাইনোসর হিসেবে নিজেদের টিকিয়ে রাখে। এরপর ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে এক প্রলয়ঙ্কারী গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসর যুগের অবসান ঘটার আগ পর্যন্ত এরা দাপটের সঙ্গে টিকে ছিল। নাগাটাইটান এমন এক সময়ে পৃথিবীতে বাস করত যখন বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছিল। ফলে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ছিল বেশি।

জীবাশ্ম বিজ্ঞানী পল আপচার্চ বলেছেন, ধারণা করা হয়, ঠিক এ সময়েই সরোপড ডাইনোসরগুলো আকারে বিশেষভাবে বড় হয়ে উঠেছিল। ওই সময় দক্ষিণ আমেরিকা, চীন, সম্ভবত উত্তর আফ্রিকা এবং এখন নাগাটাইটানের খোঁজ প্রমাণ করেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও বেশ বড় আকৃতির ডাইনোসর বাস করত। দেহের এ দানবীয় আকৃতির সঙ্গে তীব্র গরম আবহাওয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে সম্ভবত এ উচ্চ তাপমাত্রা গাছপালার বৃদ্ধিতে এমন কোনো প্রভাব ফেলেছিল, যা এ বিশালদেহী তৃণভোজীদের অনেক পরিমাণে খাবার জোগাতে সাহায্য করেছিল। নাগাটাইটানের সন্ধান আমাদের ডাইনোসরদের দেহের আকার ও বৈশ্বিক তাপমাত্রা উভয়েরই চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছানোর ঠিক এক থেকে দেড় কোটি বছর আগের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের আভাস দিয়েছে।

বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews