স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।  দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা এক দারুণ উচ্চতা ছুঁয়েছে, যেখানে সব আর্থসামাজিক সূচকে অগ্রগতি দৃশ্যমান। তবে এই সামগ্রিক উন্নয়নের হিসাব কষতে গেলে কৃষি এবং এর উপখাতগুলোই বরাবরের মতো সবচেয়ে শীর্ষে অবস্থান করে। করোনা মহামারির ধাক্কা সামলে ওঠার পর যখন বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তখনই চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং সাপ্লাই চেইনের সংকট সারা পৃথিবীকে নতুন করে খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে। উন্নত থেকে শুরু করে স্বল্পোন্নত সব দেশের জন্যই এই পরিস্থিতি এক কঠিন পরীক্ষা। তবে নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তার ধারাবাহিক অগ্রগতি টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছে। কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমই এর মূল চালিকাশক্তি। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বিরূপ প্রভাব, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারের অস্থিরতার কারণে এই অনুকূল অবস্থা ধরে রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতের পাশাপাশি সার্বিক বিচারে কৃষি খাতকেই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সময়।

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছর সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন জেলার গ্রামগঞ্জে বহু কৃষক, খামারি এবং কৃষিসংশ্লিষ্ট মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। তৃণমূলের সেই অভিজ্ঞতালব্ধ চাওয়া, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাগুলোকে জাতীয় বাজেটের প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে সুপারিশ আকারে তুলে ধরা হলো :

১. কৃষিতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা যুগোপযোগীকরণ

► বৈশ্বিক বাজারে সারের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটেও কৃষিতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা অপরিহার্য। সারে ভর্তুকি থাকার কারণেই কৃষক এখনো ধান আবাদ ধরে রেখেছেন।

► বর্তমানে উৎপাদন খরচের তুলনায় ধান আবাদ কৃষকের জন্য খুব একটা লাভজনক নয়; এটি মূলত তাদের এক ধরনের ‘জাতীয় দায়িত্ব’ পালন। অনেক কৃষক উচ্চমূল্যের অর্থকরী ফসলের দিকে ঝুঁকছেন, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে এর ফলে ধানের আবাদি জমি কমে গেলে খাদ্যনিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই কৃষককে ধান আবাদে ধরে রাখতে সারের পাশাপাশি নগদ প্রণোদনা ও উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট রূপরেখা বাজেটে থাকা অপরিহার্য।

২. স্মার্ট কৃষি ও পূর্ণাঙ্গ যান্ত্রিকীকরণ

► শুধু জমি চাষের যান্ত্রিকীকরণের মধ্যেই এখন আর সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই। বীজ বপন, চারা রোপণ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ থেকে শুরু করে ফসল কাটা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

► ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের এই যুগে কৃষিতে ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ড্রোন এবং রোবটিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে। কৃষককে এসব স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত করতে বিশেষ আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা বাজেটে বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন।

► কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদেরও আধুনিক প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা কৃষককে সঠিক গাইডলাইন দিতে পারেন।

৩. উপখাতগুলোতে (মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি) সমান নজর

► খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি এখন পুষ্টি নিরাপত্তার দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মৎস্যচাষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন খাত আমাদের আমিষের চাহিদা পূরণে অসামান্য অবদান রাখছে।

► দীর্ঘদিনের দাবি : খামারে ব্যবহৃত বিদ্যুতের বিল ‘বাণিজ্যিক’ হিসেবের পরিবর্তে ‘কৃষি’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পশুখাদ্য বা ফিডের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে খামারিরা চরম সংকটে আছেন।

► কৃষির এই উপখাতগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ গণ্য করে ব্যাংকগুলো সহজে ঋণ দিতে চায় না। বাজেটে এই উপখাতগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং ভর্তুকির সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকতে হবে।

৪. জলবায়ুঝুঁকি মোকাবিলায় শস্য ও খামার বিমা

► সাম্প্রতিক বছরগুলোর তীব্র দাবদাহ, খরা, অকালবন্যা ও ঘূর্ণিঝড় প্রমাণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার আমাদের কৃষি। এই প্রেক্ষাপটে কৃষির সব উপখাতে ‘বীমাব্যবস্থা’ চালু করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

► বিমার প্রিমিয়াম দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষকদের অনাগ্রহ কাটাতে, সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে প্রিমিয়াম পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বাজেট প্রণয়নের সময় থেকেই পুনর্বাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং বর্ধিত বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন।

বাজেটে ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষিকে প্রাধান্য দেওয়া চাই৫. তরুণ উদ্যোক্তা ও এগ্রি-স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম

► শিক্ষিত তরুণরা এখন কৃষিতে ঝুঁকছেন, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তবে বিনিয়োগ এবং বাজারসংযোগের অভাবে অনেক ‘এগ্রি-স্টার্টআপ’ কাক্সিক্ষত সাফল্য পাচ্ছে না।

► শিক্ষিত তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য বাজেটে বিশেষ ‘উদ্যোক্তা প্যাকেজ’ থাকতে হবে। এর আওতায় জামানতবিহীন ঋণ, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সুবিধা এবং উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বাজারে বা বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৬. কৃষি গবেষণা ও নতুন জাত উদ্ভাবন

► তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মাটির লবণাক্ততা এবং নতুন নতুন রোগবালাইয়ের কথা মাথায় রেখে কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ বহুগুণ বাড়াতে হবে। শুধু ফলন বৃদ্ধি নয়, বরং বৈরী আবহাওয়া সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনে গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

৭. করপোরেট কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ রক্ষা

► কৃষিকে শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে অনেক বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এখন কৃষিতে বিনিয়োগ করছে। এর ফলে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ কৃষকের নিজের জমিতেই শ্রমিকে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

► চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের ক্ষেত্রে শিল্পোদ্যোক্তা ও কৃষকের মধ্যে লাভজনক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে একটি সুস্পষ্ট আইনি নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।

৮. সহজলভ্য ও ডিজিটাল কৃষিঋণ

► চলমান বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে কৃষিঋণের আকার ও বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে।

► ঋণ বিতরণে এনজিও বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। এর বদলে কৃষকের ১০ টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং বিশেষ করে ‘বিকাশ’ বা ‘নগদ’-এর মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (MFS) মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের হাতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ঋণ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।

৯. সুনীল অর্থনীতি (Blue Economy) সুরক্ষা ও ব্যবহার

► আমাদের সামনে ব্লু-ইকোনমির বিশাল সম্ভাবনা তৈরি আছে। কিন্তু সম্পদ জরিপ ও গবেষণায় আমরা পিছিয়ে আছি।

► কক্সবাজারসহ বিভিন্ন ফিশ ল্যান্ডিং স্টেশনের তথ্যমতে, সামুদ্রিক মাছের প্রজাতি আশঙ্কাজনকহারে কমছে। অন্যদিকে প্লাস্টিক দূষণের কারণে বঙ্গোপসাগরের জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করেছিলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে সমুদ্রে মাছের চেয়ে প্লাস্টিকের পরিমাণ ভয়াবহ রূপ নেবে। আজ আমরা সেই বাস্তবতারই মুখোমুখি।

► সমুদ্রকে দূষণমুক্ত রাখার পাশাপাশি সামুদ্রিক শৈবাল বা স্পিরুলিনা চাষের মতো সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলোকে সরকারিভাবে কারিগরি ও বাজারব্যবস্থাপনার সহায়তা দিতে হবে।

১০. নগরকৃষি বা ছাদকৃষির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ

► পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, আর সাম্প্রতিক তীব্র দাবদাহে ঢাকা শহরের জনজীবন বিপর্যস্ত। গ্রামের চেয়ে শহরের তাপমাত্রা এখন অনেক বেশি।

► এই পরিস্থিতিতে ছাদকৃষি বা নগরকৃষি শহরের ‘অক্সিজেন কারখানা’ এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করতে পারে। শুধু শৌখিনতা নয়, বিশুদ্ধ খাদ্যের জোগান এবং পরিবেশ রক্ষায় ছাদকৃষিকে উৎসাহিত করতে সরকারিভাবে বড় পরিসরে সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন। ছাদকৃষির উপকরণে ভর্তুকি এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করলে এটি একটি লাভজনক বাণিজ্যিক মডেলে পরিণত হতে পারে।

আশা করি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা ও বরাদ্দের ক্ষেত্রে তৃণমূলের অভিজ্ঞতালব্ধ এই সুপারিশমালা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সময় এই বিষয়গুলো আমলে নিয়ে বাজেট বরাদ্দ বিবেচনা করলে কৃষি ও কৃষকের সমস্যাগুলো নিরসনে ভূমিকা রাখবে বলে অবহিত বিশেষজ্ঞ মহলের বিশ্বাস।

♦ লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews