কোনো এক দূর গাঁয়ের রোদ ঝলমল উঠানে আপন মনে খেলছে বছর দুয়েকের এক শিশু। বাবা বাড়ি নেই। মা ঘরের কাজে ব্যস্ত। তবে শিশুর দিকেও তার তীক্ষ্ম মনোযোগ। ব্যস্ততায় কিছু সময়ের জন্য মনোযোগে বিচ্যুতি ঘটে। শিশুটি চলে যায় পাশের পুকুরের দিকে।
শিশুটিকে যখন খুঁজে পাওয়া যায়, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। পরিবারটি কয়েক মিনিটের মধ্যে হারিয়ে ফেলে তাদের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে। ওর জন্মে পুরো পরিবারে আনন্দে ভেসেছিল। শিশুটির অস্তিত্ব এখন শুধু পরিবারের স্মৃতিতে। বাংলাদেশের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাগুলো সাধারণত এভাবেই ঘটে, শিশুর ওপর থেকে কয়েক মুহূর্তের মনযোগ সরে যাওয়া, সারাজীবন অবিরাম অশ্রুপাত।
কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো কাগজপত্রে অনেক সময় এরকম শিশুদের অস্তিত্বই থাকে না। অনেক শিশুর জন্মনিবন্ধন থাকে না, মৃত্যুর তথ্য কোথাও নথিভুক্ত হয় না, মৃত্যুর কারণও যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয় না। ফলে একটি শিশু, যে পৃথিবীতে এসেছিল এবং পরিবারের আনন্দ হয়ে কিছুদিন বেঁচেছিল, রাষ্ট্রের কোথাও সে নেই। শুধু মায়ের অশ্রু, বাবার হাহাকার এবং স্বজনদের বেদনার মধ্যেই বেঁচে থাকে সেই শিশুর গল্প। শুধু শিশু নয়, অন্যান্য বয়সের যে মানুষেরা পানিতে ডুবে মৃত্যুর শিকার হয়, তারাও অদৃশ্য থাকেন।
ডুবে মৃত্যু: নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট
ডুবে মৃত্যু একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমস্যা, বাংলাদেশের জন্যও এটি তাই। শিশুস্বাস্থ্যে টিকাদান, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও, অনিচ্ছাকৃত আঘাতজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ডুবে মৃত্যু এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়।
সাম্প্রতিক জাতীয় স্বাস্থ্য ও আঘাত জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন ৫১ জন মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এর ৭৫ শতাংশই শিশু। আর এসব শিশুদের বেশিরভাগেরই বয়স থাকে ৫ বছরের নিচে। এসব মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য।
তবে এই সংকটের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু মৃত্যুর সংখ্যা নয়; সমস্যা হলো আমরা এই মৃত্যুগুলোকে কতটা নির্ভুলভাবে দেখতে, বুঝতে এবং বিশ্লেষণ করতে পারছি।
বাংলাদেশে ডুবে মৃত্যুর যে তথ্য পাওয়া যায়, তার বড় অংশ আসে নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিচালিত জাতীয় জরিপ থেকে। কিন্তু নিয়মিত সরকারি তথ্যব্যবস্থা—যেমন মৃত্যুনিবন্ধন, সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস, স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থা বা অন্যান্য প্রশাসনিক রেকর্ডে এই মৃত্যুর পূর্ণ চিত্র প্রতিফলিত হয় না।
ফলে আমরা একটি বড় সংকটের অস্তিত্ব জানি। কিন্তু কোথায় কত মৃত্যু হচ্ছে, কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে এবং কোন ধরনের প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ সবচেয়ে কার্যকর—এসব প্রশ্নের উত্তর সবসময় পরিষ্কারভাবে পাওয়া যায় না।
তথ্য হারিয়ে যাওয়া
ডুবে মৃত্যুর তথ্যের ঘাটতি একক কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা।
ডুবে মৃত্যুর ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে ঘটে। মৃতদের সব সময় হাসপাতালে আনা হয় না। তাই এসব মৃত্যুর তথ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয় না। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় কোনো শিশু বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে মারা গেলে অনেক পরিবার দ্রুত দাফন সম্পন্ন করে। প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় যাওয়ার প্রয়োজন, সময় বা মানসিক প্রস্তুতি অনেকের থাকে না।
মৃত্যুনিবন্ধন ব্যবস্থাতেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একটি শিশুর জন্মনিবন্ধন যদি সম্পন্ন না হয়, তাহলে তার মৃত্যুর কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে সম্পত্তি, ব্যাংক হিসাব বা অন্যান্য প্রশাসনিক প্রয়োজন না থাকায় অনেক পরিবার মৃত্যুনিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না।
ডুবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে আইনি ও সামাজিক বাস্তবতাও একটি বিষয়। অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হিসেবে এসব ঘটনায় অনেক সময় পুলিশি প্রক্রিয়া বা তদন্তের বিষয় আসে। কিন্তু গ্রামীণ সমাজে পরিবারগুলো অনেক সময় এসব প্রক্রিয়াকে জটিলতা বা হয়রানির সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। ফলে অনেক ঘটনা আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে না।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য, পুলিশ, স্থানীয় সরকার এবং পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্যব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি সমন্বিত নয়। ফলে একটি মৃত্যুর তথ্য এক জায়গায় থাকলেও অন্য জায়গায় পৌঁছায় না। তৈরি হয় তথ্যের বিচ্ছিন্নতা। পদ্ধতিগত তথ্যব্যবস্থা থাকলে কী পরিবর্তন সম্ভব?
তথ্য শুধু সংখ্যা নয়; এটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভিত্তি
ডুবে মৃত্যুর একটি কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা থাকলে প্রথমেই জানা সম্ভব হবে কোন এলাকাগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কোন জেলার বেশি শিশু মারা যাচ্ছে, কোন বয়সের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কোন মৌসুমে মৃত্যুর প্রবণতা বাড়ছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে।
যদি নির্ভরযোগ্য তথ্য দেখায় যে এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা বাড়ির আশপাশের জলাশয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তাহলে সেই অনুযায়ী শিশু যত্নকেন্দ্র, অভিভাবক সচেতনতা এবং স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা সহজ হবে।
এছাড়া কোন এলাকায় সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ প্রয়োজন, কোথায় কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে এবং কোন ধরনের কর্মসূচি বাস্তবে কাজ করছে – এসব সিদ্ধান্তও নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া নেওয়া কঠিন।
তথ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ বাজেট ও জবাবদিহির জন্য। একটি কর্মসূচিতে বিনিয়োগের পর তা কতটা মৃত্যু কমাতে পারছে, কোন উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা দরকার, কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন—এসব মূল্যায়নের জন্য নিয়মিত তথ্য অপরিহার্য।
২০৩০ সালের লক্ষ্য এবং তথ্যের প্রয়োজন
ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে জাতীয় কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ডুবে মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অঙ্গীকার।
কিন্তু কোনো মৃত্যুহার কমানোর লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রথম শর্ত হলো—বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা থাকা।
প্রতিবছর কত মানুষ ডুবে মারা যাচ্ছে, কোথায় এই মৃত্যু বেশি হচ্ছে এবং কোন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলে ২০৩০ সালের প্রকৃত অগ্রগতি পরিমাপ করা কঠিন হবে। কারণ, বিভিন্ন সময়ের জরিপগুলো শুধুমাত্র প্রাক্কলন দেখায়, প্রকৃত চিত্র এতে অনুপস্থিত থাকে।
তাই একটি শক্তিশালী তথ্যব্যবস্থা শুধু গবেষক বা পরিসংখ্যানবিদদের প্রয়োজন নয়; এটি জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের একটি অপরিহার্য ভিত্তি।
বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং সামনে পথ
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে জাতীয় কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আগে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সমাজভিত্তিক শিশুযত্ন কেন্দ্র দেখিয়েছে যে পরিকল্পিত কার্যক্রমের মাধ্যমে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
কমিউনিটি পর্যায়ে মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ ও কারণ নির্ধারণের উদ্যোগ, যেমন ভার্বাল অটপসি পদ্ধতি, ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর পথ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পুলিশ এবং পরিসংখ্যান ব্যবস্থার মধ্যে তথ্য সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায়, কার্যকর তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণ করা হয়। ভিয়েতনাম স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার মাধ্যমে আঘাত ও ডুবে মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করে নিয়মিত নজরদারি জোরদার করেছে।
বাংলাদেশও নিজের বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, যেখানে স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য দ্রুত জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহৃত হবে।
প্রতিটি মৃত্যুকে দৃশ্যমান করার উদ্যোগ প্রয়োজন
ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের লড়াই শুধু পানির কাছে নয়; এটি তথ্যের জগতেও একটি লড়াই। কারণ যে মৃত্যু সঠিকভাবে নথিভুক্ত হয় না, সেই মৃত্যু থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় না।
তাই ডুবে মৃত্যুর জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, পুলিশ ও পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য একসঙ্গে ব্যবহৃত হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে দ্রুত মৃত্যু রিপোর্টিং, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ এবং নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে ডুবে মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমানোর জাতীয় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু কর্মসূচি গ্রহণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে অগ্রগতি পরিমাপ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
এর জন্য রাষ্ট্রকে তথ্যব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তবে নতুন কোনো ব্যয়বহুল কাঠামো তৈরি না করেও বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই একটি কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাঠপর্যায়ের কর্মী ও সেবা কাঠামো এবং স্থানীয় সরকারের বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে কমিউনিটি পর্যায় থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)