মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে অবশেষে শান্তিচুক্তির দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আজ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধীনে এই চুক্তি হতে পারে। শান্তি চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের ঘোষণার পর গতকাল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির খুব কাছাকাছি আছে ইরান। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শান্তি চুক্তি সই হতে পারে। তবে চুক্তির খসড়া নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছে ওয়াশিংটন-তেহরান। ইরান যুদ্ধ ঘিরে চলমান অনিশ্চয়তা অবশেষে কাটতে যাচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকের খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পশ্চিমা সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সবকিছু ঠিক থাকলে রবিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চুক্তিতে সই করতে পারে তেহরান ও ওয়াশিংটন। চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের বন্দরগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে যুদ্ধ শুরুর অজুহাত হিসেবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির যে কথা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, সে বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সমঝোতা হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের জন্য একটি চুক্তি হওয়ার সময় খুবই কাছাকাছি। এর আগে, ইরানের প্রেস টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, এখনো কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। যে চুক্তির বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে তা দুটি ধাপে সম্পন্ন হবে। প্রথম ধাপটি হবে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার সূচনা হবে। তিনি আরও বলেন, প্রথম ধাপের অধীনে লেবাননে ইসরায়েলি আক্রমণসহ সব ধরনের হামলা বন্ধ করা হবে এবং নতুন করে কোনো আক্রমণ না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের আটকে থাকা সম্পদ ছাড় করার মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ইরানের এবং ওমানের সার্বভৌমত্বের অধীনেই থাকবে, তবে এর ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক ব্যবস্থা অতীতের চেয়ে ভিন্ন হবে। আরাগচি সতর্ক করে বলেন, প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকটি এখনো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের প্রতি ইরানের গভীর অনাস্থা রয়েছে। বিশেষ করে পরমাণু আলোচনা চলাকালীন ট্রাম্পের প্রশাসন দুবার আক্রমণ চালিয়েছিল।
পৃথক এক্স পোস্টে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় তা অবশ্যই রাখতে হবে। কোনো যদি, কিন্তু বা অজুহাত চলবে না। সামনে যে চুক্তির আশা দেখা যাচ্ছে, তা সফল করার জন্য এটিই একমাত্র পথ।
আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে একটি শান্তি চুক্তির রূপরেখায় সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। একই সঙ্গে এই চুক্তির চূড়ান্ত খসড়াও প্রস্তুত করা হয়েছে। পাকিস্তান এখন আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্ভাব্য একটি ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর (ই-স্বাক্ষর) অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর পর আগামী সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা একটি শান্তি চুক্তির ইতিহাসের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছি।
এদিকে ১৪ দফা শান্তি চুক্তির তথ্য ফাঁস করেছে ইরানের সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সি। খসড়া এসব প্রস্তাবে বলা হয়েছে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী ও তাৎক্ষণিক সমাপ্তি; ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অঙ্গীকার; ৩০ দিনের মধ্যে নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার; ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি; ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা, যা ইরানের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে; তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত এবং ইরানের আর্থিক সম্পদে পূর্ণ প্রবেশাধিকার; যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা; পারমাণবিক ইস্যু এবং মার্কিন, জাতিসংঘ ও আইএইএ-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে ৬০ দিনের আলোচনা; এনপিটি-এর অধীনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা; আলোচনার সময় নতুন সেনা মোতায়েন বা নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না যুক্তরাষ্ট্র; ৬০ দিনের আলোচনার সময় ইরানের ২৪ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত তহবিল মুক্তি, যার অর্ধেক আলোচনা শুরুর আগেই ছাড়তে হবে; চুক্তি বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গঠন; চূড়ান্ত চুক্তিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন এবং সবশেষে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনই হবে চূড়ান্ত আলোচনার একমাত্র বিষয়।
তবে এসব শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, ইরানের গণমাধ্যমে প্রকাশিত শর্তগুলো ‘ভুয়া’। লিখিতভাবে যেসব শর্তে সম্মতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে এর কোনোই সম্পর্ক নেই। এরা (ইরান) চুক্তির ক্ষেত্রে চরম অসৎ। এদের সঙ্গে সৎ উদ্দেশ্যে কোনো চুক্তি করার সুযোগ নেই।