মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও লেবাননে ইসরাইলি বাহিনী এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াই নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল স্থানীয় সময় ভোরে এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে ইরান থেকে ছোড়া একঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করেছে মার্কিন বাহিনী। চারটি ড্রোন ভূপাতিত করার পর মার্কিন সেনারা ইরানের উপকূলীয় নজরদারি রাডার স্টেশনগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা মেহর নিউজ জানিয়েছে, ওই এলাকায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজের অবস্থান পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি বেশ কয়েকটি ‘সতর্কতামূলক’ গুলি ছুড়েছে ইরান। এদিকে, ইরানের উপকূলীয় সিরিক অঞ্চল ও কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের এই ‘দুঃসাহসিক সামরিক পদক্ষেপ’ সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহর নিউজের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ক্ষোভ প্রকাশ করে। বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যে কেবল মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে অনিচ্ছুক, তা নয়Ñবরং তারা ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছে। ইরানের উপকূলবর্তী গুরুত্বপূর্ণ রাডার ও নজরদারি কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে মার্কিন বাহিনী এই বিমান হামলা চালায়। তেহরানের দাবি, এই উসকানিমূলক এবং আগ্রাসী আচরণের কারণে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি ও পরিণতির সম্পূর্ণ দায়ভার ওয়াশিংটনকেই বহন করতে হবে। একই সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি একটি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি এবং ‘সদভাবের প্রতিবেশীসুলভ আচরণ’ মেনে চলার অনুরোধ জানিয়ে ইরান বলেছে, কোনো আঞ্চলিক দেশ যেন নিজেদের ভূখ- বা সামরিক স্থাপনা ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে মার্কিন আগ্রাসী বাহিনীকে কোনো রকম সুযোগ বা সুবিধা না দেয়।

কুয়েত-বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি। ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, পারস্য উপসাগর অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং অবকাঠামো লক্ষ্য করেই এই অভিযান চালানো হয়। মোট সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কথা বলা হলেও সেন্টকম জানিয়েছে, এসব ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই প্রতিহত করা হয়েছে এবং কোনোটি নির্ধারিত স্থানে আঘাত হানতে পারেনি। গতকাল ভোরে কুয়েত এবং বাহরাইনজুড়ে আকস্মিক যুদ্ধকালীন সাইরেন বেজে ওঠে। কুয়েতি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে উচ্চ সতর্কতাবস্থায় রয়েছে। বাহরাইন সরকার তার নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় এবং জানায় যে, ইরান থেকে ছুড়ে দেওয়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ও বেশ কয়েকটি ড্রোন তারা সফলভাবে ধ্বংস করেছে।

লেবাননে চুক্তি ভেঙে ভয়াবহ লড়াই, সেনা কর্মকর্তা নিহত : লেবানন ও ইসরাইল সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। লেবাননের সেনাবাহিনী নিশ্চিত করেছে, ইসরাইলি বিমান হামলায় তাদের একজন জেনারেলসহ বেশ কয়েকজন লেবানিজ সেনা নিহত হয়েছেন। এর আগের দিনই ইসরাইলি হামলায় ২০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর দেয় দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। এদিকে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেন, ইরান লেবাননকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘দাবার ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘লেবাননকে তার আসল শত্রু (ইসরাইল) থেকে রক্ষা করুন।’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য : ইরান যুদ্ধ নিয়ে নিজের আগের অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে তিনি ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার কথা বললেও, এখন তিনি দ্রুত অগ্রসর হওয়ার দাবি করছেন। এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ইতিমধ্যেই তিন মাস পার করে ফেলেছি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ ১৯ বছর স্থায়ী হয়েছিল, আর আমি মাত্র তৃতীয় মাসে আছি।’ একদিকে যখন পারস্য উপসাগরে ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারকে টেনেসি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে পরমাণু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে পরমাণু আলোচনার একটি রূপরেখা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে হোয়াইট হাউস।

চুক্তির জন্য ২৪ বিলিয়ন ডলার ফেরতের শর্ত তেহরানের : ইরানের সর্বোচ্চ নেতার একজন সামরিক উপদেষ্টা জানিয়েছেন যে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তি ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক অবরুদ্ধ করে রাখা ২৪ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ মুক্তির ওপর নির্ভর করছে। একই সাথে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, পুনরায় সংঘাতে জড়ানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘অন্ধকার করিডোরে’ ঠেলে দেবে। তেহরানে সিএনএন-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজায়েই বলেন, “আলোচনা এখন অচলাবস্থায় রয়েছে এবং ট্রাম্পকেই এই অচলাবস্থা ভাঙতে হবে। বল এখন ট্রাম্পের কোর্টে।” তার মতে, ইরান চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই অবরুদ্ধ সম্পদের মধ্যে ১২ বিলিয়ন ডলার অবিলম্বে মুক্তি চায় এবং বাকি ১২ বিলিয়ন ডলার পরবর্তী ধাপগুলোতে পর্যায়ক্রমে ছাড় করার দাবি জানায়।

মধ্যস্থতা করতে তেহরানে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে থমকে থাকা শান্তি আলোচনাকে এগিয়ে নিতে গতকাল রাতে তেহরানে গিয়েছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি। বিগত কয়েক মাস ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ইসলামাবাদ। বিশেষ করে গত এপ্রিল মাসে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা ছিল পাকিস্তানের। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই তেহরান সফর। তবে এই মুহূর্তে দুই দেশের মধ্যকার আলোচনার প্রকৃত অগ্রগতি ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনও বড় ধরনের মতবিরোধ রয়েছে। সূত্র : এএফপি, আল-জাজিরা, তাসনিম, সিএনএন।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews