চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে যে ক’জন বীরের আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে, তাদের একজন সাভার ডেইরি ফার্ম উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণীর মেধাবী শিক্ষার্থী আলিফ আহম্মেদ সিয়াম। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই রাজপথে সক্রিয় থাকা ১৫ বছর বয়সী ওই কিশোর ৫ আগস্ট সাভারে পুলিশের নিশানা উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ আগস্ট শাহাদতবরণ করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল বা অন্য কোনো স্থাপনা শহীদ আলিফের নামে করার দাবি তার পরিবারের ।

আলিফদের বাসায় দেখা যায়, তার পড়ার টেবিলে বইগুলো এখনো আগের মতোই সাজিয়ে রাখা; কিন্তু যে আলিফ এই টেবিলে বসে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন বুনতেন তিনি আজ ট্রাইব্যুনালের মামলার এক নম্বর ভিকটিম। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা-বাবা দু’জনেই আজ মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত; নিজেদের তারা পরিচয় দিচ্ছেন ‘জীবন্ত লাশ’ হিসেবে।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ : আলিফ শুধু সাহসীই ছিলেন না, ছিলেন তুখোড় মেধাবী ও স্বপ্নদর্শী। বিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে পাইলট হওয়া, অ্যাডভেঞ্চার করা এবং নিজের উপার্জনে মা-বাবার পবিত্র হজ পালনের ব্যবস্থা করা। বিশ্বের বিভিন্ন পর্যটন স্থানের কাগজের কাটিং তিনি ডায়েরিতে জমিয়ে রাখতেন, দেয়ালে লিখে রেখেছিলেন, ‘লেটস গো দেয়ার’।

আলিফের আন্দোলনের সাথে যুক্ত হওয়ার পেছনে একটি ব্যক্তিগত কষ্টের গল্পও ছিল। ক্লাস ওয়ান এবং ক্লাস সিক্সে জাহাঙ্গীরনগর স্কুল ও কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করেও কোটা পদ্ধতির মারপ্যাঁচে সে ভর্তি হতে পারেনি। ওই বৈষম্য তাকে গভীরভাবে তাড়িত করেছিল, যার ফলে আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি মিছিলের একদম সামনে থাকতেন।

আলিফের বাবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেটের কাপড় ব্যবসায়ী মো: বুলবুল কবীর ১৫ জুলাই থেকেই ছেলের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনে শামিল ছিলেন। তিনি বলেন, খুব কম নজির আছে যেখানে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বাপ-ছেলে একসাথে রাজপথে লড়াই করেছে। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের সময় রাবার বুলেট ও টিয়ার শেলের শিকার হলেও রাজপথ ছাড়েননি। স্কুলের শিক্ষকও তার মাকে অনুরোধ করেছিলেন সিয়ামকে যেন আন্দোলনে যেতে না দেয়া হয়। কিন্তু দমে না গিয়ে সিয়াম তার মাকে বলেছিলেন, ‘হয় বীরের মতো বাঁচব, নইলে বীরের মতো মরব।’

৫ আগস্ট : মায়ের কাছে শেষ বিদায়

৫ আগস্ট সকালে আলিফ যখন প্রাইভেট পড়া শেষ করে ঘরে আসেন এবং বন্ধুদের সাথে ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন তখন তার মা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা তানিয়া আক্তার তীব্র বাধা দিয়েছিলেন। তিনি আলিফকে কোনোভাবেই ঘর থেকে বের হতে দিতে চাননি এবং বন্ধুদেরও চলে যেতে বলেন। শুরুতে আলিফ নানা অজুহাতে মাকে রাজি করানোর চেষ্টা করে; কিন্তু মা বারণ করলে, একপর্যায়ে যাওয়ার সময় আলিফ তার মাকে জড়িয়ে ধরে একটি চুমু খান এবং হাসিমুখে সান্ত¡না দিয়ে যান।

বাবার স্মৃতির মণিকোঠায় সিয়ামের সেই শেষ কথাগুলো আজও অম্লান। তিনি বলেন, ‘‘ওর আম্মুরে ধরে একটা চুমু দিয়ে বলল, ‘আম্মু বাইরে যাচ্ছি বড় ভাইরা আমরা যাচ্ছি সবাই আর তুমি দোয়া করো।’ হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘তুমি দোয়া করো, আর যদি আমি মারাও যাই শহীদ হব, তুমি হবে শহীদের মা। গর্ব করে বলবা যে আমি শহীদ আলিফের মা।’ আজকে দেখেন আমরা সেই পরিচয় নিয়ে বাঁচতেছি, যা বইলা গেছে আল্লাহ কবুল করিয়া নিছে।” মায়ের সাথে এটাই ছিল আলিফের শেষ কথা।

এক বুলেটে শান্ত আলিফ

বেলা ১১টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি গেট থেকে ছাত্র-জনতার সাথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয় আলিফ। প্রথমে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলির মুখে মিছিলটি কিছুটা পিছিয়ে আসে। পরে বেলা ২টার দিকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে আলিফসহ আন্দোলনকারীরা পুনরায় বিজয় মিছিল নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।

দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে মিছিলটি সাভার থানা স্ট্যান্ড এলাকায় (ফুটওভার ব্রিজের নিচে) পৌঁছালে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মিছিল লক্ষ্য করে অতর্কিতে গুলি ছোড়ে। একটি বুলেট তার দুই ভ্রƒর মাঝখান দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে খবর পেয়ে মা তাকে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় শাহাদতবরণ করেন আলিফ আহম্মেদ সিয়াম। পরে ৮ আগস্ট ভোরে বাগেরহাটের বাঁশবাড়ীয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

শহীদের পরিবারের দাবি

আলিফের বাবা বুলবুল কবীর দাবি করেন, যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রত্যেকের নাম যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে চিরস্মরণীয় করার উদ্যোগ নেয়া হয়। সুবিধাবাদী বলয় ভেঙে প্রতিটি প্রকৃত শহীদ পরিবারের খোঁজ নেয়া উচিত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলা এবং সাভার থানায় করা মামলার সুষ্ঠু ও দৃশ্যমান তদন্ত নিশ্চিত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে।

আলিফের বাবা শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও প্রান্তিক গেটে ভ্যানে করে কাপড় বিক্রি করেন। পরিবারটির ভবিষ্যৎ এবং জীবিকার নিরাপত্তার জন্য তারা ওই গেটে একটি স্থায়ী দোকানের ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন; কিন্তু এখনো কোনো সমাধান পাননি।

আলিফের মা বলেন, আজকে যারা ক্ষমতায় বা বড় পদে আছেন, তারা ওই শহীদদের রক্তের বিনিময়েই সেখানে বসে আছেন। অথচ এখন তারা শহীদ পরিবারগুলোকে এড়িয়ে চলছে। তিনি চান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একটি হলের বা গেটের নাম আলিফের নামে করা হোক, যাতে ওই স্মৃতিটুকু নিয়ে তারা বাঁচতে পারে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews