২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পরমাণু উত্তেজনা নতুন নাটকীয় মোড়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে তেহরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং এর ভবিষ্যৎ গন্তব্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উদ্বেগ। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান এবং ওয়াশিংটন উভয় পক্ষই তাদের নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় একটি কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এই অচলাবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের কাছে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের পরিমাণ।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, ইরানের হাতে বর্তমানে বিপুল পরিমাণ পারমাণবিক জ্বালানি রয়েছে। সংস্থাটির ২০২৫ সালের মে মাসের প্রতিবেদন বলছে, তেহরানের কাছে অন্তত ৪০০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং প্রায় ৩০০ কেজি ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গচ্ছিত আছে। যদিও ইরান সবসময়ই দাবি করে আসছে, তাদের এই পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ জ্বালানিকে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই অস্ত্র তৈরির উপযোগী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
ইরানের এই ইউরেনিয়াম মজুত বর্তমানে ঠিক কোথায় রয়েছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়েই চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। ২০২২ সালের জুন মাস থেকে তেহরান তাদের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে বসানো আইএইএ-এর নজরদারি ক্যামেরাগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাটির কাছে এর সঠিক অবস্থান সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই। গত বছরের জুন মাসে মার্কিন বাহিনীর ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা এবং টমাহক মিসাইল হামলার পর নাতাঞ্জ ও ফোরদোর মতো ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো কতটা কার্যকর আছে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওই হামলায় সব ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে পেন্টাগনের গোয়েন্দা তথ্য বলছে ইরানের কর্মসূচি বড়জোর দুই বছর পিছিয়ে গেছে।
ইউরেনিয়ামের অবস্থান নিয়ে ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে মঁদ একটি চাঞ্চল্যকর দাবি তুলেছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে তারা জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জুনে মার্কিন হামলার ঠিক আগে ইরান সম্ভবত তাদের সমস্ত উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইসফাহানের একটি সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সরিয়ে নিয়েছে। ছবিতে দেখা গেছে ১৮টি বিশেষ নীল কন্টেইনারবাহী একটি ট্রাক ওই এলাকায় যাতায়াত করছিল, যা তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত কাস্কেটের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, হামলার আগে ইরান কোনো কিছু সরিয়ে নিয়েছিল এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তাদের কাছে নেই।
বর্তমান আলোচনার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের শর্ত। ওয়াশিংটন সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে ইরানকে তাদের সমস্ত উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো পক্ষের কাছে সমর্পণ করতে হবে এবং সব পরমাণু অবকাঠামো চিরতরে ধ্বংস করতে হবে। সম্প্রতি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ২০ বছরের জন্য পরমাণু কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিলেও ট্রাম্প সেই প্রস্তাবকেও অপর্যাপ্ত বলে খারিজ করে দিয়েছেন। মার্কিন প্রশাসনের এই কঠোর মনোভাবের কারণে আলোচনার টেবিলে কোনো বড় অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, ইরান তাদের পরমাণু অর্জনকে জাতীয় গৌরবের প্রতীক হিসেবে দেখছে এবং এই সম্পদ অন্য কারো হাতে তুলে দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে তারা সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখা বা উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামকে লঘু করার প্রস্তাব বিবেচনা করতে পারে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, তাদের ভূখণ্ড থেকে ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি কোনোভাবেই আলোচনার টেবিলে আলোচনার বিষয় হতে পারে না। এই জাতীয়তাবাদী অবস্থান চুক্তির পথে অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এই ঘোলাটে পরিস্থিতির মধ্যে রাশিয়া একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা ইরানের এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের হেফাজতে রাখতে রাজি আছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমিত হয়। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটম-এর প্রধান আলেক্সি লিখাচেভ জানিয়েছেন যে, ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির সময়ও রাশিয়া ইরান থেকে ১১ টন ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে সহায়তা করেছিল এবং তারা আজও সেই কারিগরি ও কূটনৈতিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। রাশিয়ার এই প্রস্তাবকে একটি ‘ভালো সমাধান’ হিসেবে দেখা হলেও ওয়াশিংটন তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘ইউরেনিয়াম জ্বর’ মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ফুরিয়ে আসার সাথে সাথে দুই দেশের রণকৌশল এবং কূটনৈতিক বাগযুদ্ধ নতুন করে সংঘাতের পথ তৈরি করছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের দাবি এবং অন্যদিকে ইরানের সার্বভৌমত্ব ও অর্জিত সক্ষমতা ধরে রাখার জেদ, এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে একটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তির সম্ভাবনা।
সূত্র: আরটি
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ